গ্রন্থালোচনা || কবি মজিদ মাহমুদের ‘নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র’ : মোহাম্মদ আবু সাঈদ ||

 

 

প্রথমেই বলে রাখি, লেখাটা ‘রিভিউ’ হিসেবে লিখছি ; ব‌ইয়ের সারাংশ নয়। পাঠকের চোখে ব‌ইয়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করে দেয়া, অসাধারণত্ব থাকলে তার যথোচিত প্রশংসা আর ক্রুটি চোখে পড়লে তা চিহ্নিত করা এবং শুদ্ধতা জানান দেয়া— এটাই আমার কাছে ‘রিভিউ’; এই অর্থেই বর্তমান রিভিউটি নির্মিত।

 

নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র 

লেখক: মজিদ মাহমুদ 

প্রকাশক: দেশ প্রকাশ, জুলাই, ২০১৫ 

 

নজরুলকে নিয়ে সমালোচনার অন্যতম জনপ্রিয় একটি ধারা হলো: “সমাজের নিম্নশ্রেণির জন্য তিনি সাহিত্য করেছেন”। এই ‘হুজুগে’ ধারণাটা নজরুলের কাব্য-প্রতিভা প্রকাশের সাথে সাথেই শুরু হয়েছে এবং এখনও পর্যন্ত বেশ জোরেশোরেই সচল। জনপ্রিয়, হুজুগে বলেই বিষয়টা অসত্য ব্যাপারটা এরকম‌ও না। বলতে চাচ্ছি, সমাজের নিম্নশ্রেণির জন্য তিনি সাহিত্য করেছেন— এটা বেদবাক্য; কিন্তু এর মূলে কী ছিল, কোন্ মঞ্জিলে মকসুদের দিকে তাঁর সফর ছিল এটার পষ্ট বিবরণী আমাদের কাছে গরহাজির। আর‌ও খোলাসা করে বলতে হলে ব্যাপারটা দাঁড়ায় এরকম: তিনি প্রথম ইংরেজের বিরোধিতা করলেন, তারপর ধর্ম নিয়ে প্রচলিত সাম্প্রদায়িকতার‌ও বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন, আবার সামাজিক ও অর্থনৈতিক শ্রেণী সংগ্রাম নিয়েও বেশ জোরগলায় কথা বলছেন— এই যে প্যাকেজ তার শিকড় কোথায় আসলে? এই প্রশ্নের মীমাংসা তালাশ করেছেন কবি মজিদ মাহমুদ; তালাশের ফল প্রকাশ করেছেন “নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র” ব‌ইতে।

 

ব‌ইয়ের নামেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, নজরুলের বহুমুখী সংগ্রামকে “তৃতীয় বিশ্ব” প্যাকেজে ফেলেছেন তিনি। এবং কোন্ অর্থে কোন্ দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি “তৃতীয় বিশ্ব” পরিভাষাটি ব্যবহার করেছেন তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা কিতাবের বিসমিল্লাতেই তিনি দিয়েছেন— সাধুবাদযোগ্য ব্যাপার আলবৎ, কেননা, লেখকের মানস-প্রবণতা না ধরে এগুলে মূল বক্তব্য গ্রহণ করতে পাঠকের খাবি খেতে হয়, যা এই কিতাবের পাঠকের ক্ষেত্রে ঘটবে না।

 

চারা রোপণের পূর্বে জমির উর্বরতার কাজে লাগার মতন প্রথম অধ্যায়েই তিনি “তৃতীয় বিশ্ব ও ঔপনিবেশিক অর্থনীতি”-তে কিতাবের শিরোনামে ব্যবহৃত ‘তৃতীয় বিশ্ব’র সাথে নজরুলের বিদ্রোহের সবচেয়ে বড়ো ও মজবুত শাখা ‘ঔপনিবেশতা’র একাত্মতা দেখিয়েছেন। লেখকের দৃষ্টিকোণ উদারনৈতিক— প্রচলিত সমালোচনায় ব্যবহৃত ‘ইংরেজ ঔপনিবেশিকতা’র মধ্যে তিনি সীমাবদ্ধ থাকতে নারাজ, তিনি পৃথিবীর তাবৎ ধনকুবের অধীনে সমস্ত ঔপনিবেশিকতাকে জড়ো করতে চান নজরুলের বিদ্রোহের বিপরীতে। ঔপনিবেশিকতাকে পূজি করে শাসকশ্রেণী কিভাবে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে থাকে, কিভাবে ঔপনিবেশিক ভূখণ্ডে বসবাসরত জনগণকে শোষণ করে প্রভুশ্রেণী নিজেদের ঝুলি ভারী করে এবং ফলে দলিতরা আরও তলানিতে যেতে থাকে। বিশেষত মোঘল আমলের পরিণতিলগ্ন থেকে ইংরেজ শাসনামলে কিভাবে বাংলার কৃষকশ্রেণী, সমাজের নিম্নবিত্তরা উচ্চবিত্তের, শাসকশ্রেণীর প্রয়োজন-পূরণের হাতিয়ারে পরিণত হলো, কিভাবে জনসাধারণ দাসে রূপান্তরিত হলো তা স্বচ্ছাকারে চিহ্নিত করেছেন। আধুনিকতার মুখোশে গোটাকয়েক ধনকুব অধিপতি কিভাবে দুনিয়ায় সিংহভাগ ভূখণ্ডে ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম রেখে অর্থনৈতিকভাবে ‘ফেরাউন’ হয়ে উঠে তার বোঝাপড়া হয়েছে প্রথম অধ্যায়ে; এই বোঝাপড়া পাঠক যত ভালো করতে পারবেন পরবর্তী চারটি অধ্যায়ের বক্তব্য তত গভীরভাবে আয়ত্ত্ব করতে পারবেন।

 

এইবার উর্বর জমিতে রোপণ করা যাক্! নজরুলের উত্থান হচ্ছে ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধাচরণের মাধ্যমে— অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব প্রতিবাদী কাব্যাংশ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন লেখক। এছাড়াও বিষের বাঁশী, ভাঙার গান, ফণিমনসা প্রমুখ কাব্যগ্রন্থে কিভাবে, কোন্ কোন্ জায়গায় নজরুল উপনিবেশ-বিরোধী চিন্তা-চেতনা কাব্যাকারে হাজির করছেন তার ‘টেক্সচুয়াল ডকুমেন্টারী’ নির্মাণ করা হয়েছে।

 

এইবার, নজরুলের মাধ্যমে লেখক পাঠককে সাথে নিয়ে ঢুকলেন বৈশ্বিক ঔপনিবেশিকতার আরও গভীরে— যাকে আমরা বলি ‘অর্থনীতি’। ঔপনিবেশিকতার রক্তচোষা অর্থনীতি নিয়ে কিন্তু প্রথম অধ্যায়েই আলাপ সারা! এবার শুধু এই রক্তচোষা অর্থনীতির বিরুদ্ধে নজরুলের অবস্থান চিহ্নিত করার পালা‌। এইখানে কমিউনিজম, মার্ক্স ইত্যাদি, মোটাদাগে ‘বামপন্থী’ যাদের বলা হয়— তাদের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যাটাই গ্রহণ করেছিলেন নজরুল। বলাবাহুল্য, এটাই স্বাভাবিক; সত্য তো এটাই। পাঁচজন মালিক পঁচানব্ব‌ইজন শ্রমিকের ফল ভোগ করে; উচ্চবিত্তের ভোগবিলাসের দায়ভার চাপে নিম্নবিত্তের উপর— এভাবেই সামাজিক অবস্থানে তৈরি হয় শোষক ও শোষিতের সম্পর্ক। ‘লাঙল’ ও ‘গণবাণী’ পত্রিকার মাধ্যমেই প্রধানত নজরুলের এই অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন লেখক। এখানে লেখক দেখিয়েছেন, মোটাদাগে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধাচরণের পর আমাদের নিজেদের মধ্যকার অর্থনৈতিক ঔপনিবেশিকতা তৈরি করে রাখা হর্তাকর্তাগণ নজরুলের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন; তাদের গোমর ফাঁক হচ্ছিলো আস্তে আস্তে। কারা নজরুলের এই অর্থনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা করেছেন এবং কারা পক্ষে ছিলেন তার হাল-হাকিকত কম হলেও বাতলানোর অবকাশ পেয়েছেন। তথাকথিত মিডল ক্লাসের নজরুল-বিরোধিতার‌ও প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

 

উপমহাদেশে, বিশেষত বাংলায় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার যে কালবৃক্ষ আমরা দেখি তার রোপণের সাথে ইংরেজ ঔপনিবেশিকতার গোড়াপত্তনের যথেষ্ট মিল পেয়েছেন, লেখক। উপনিবেশিক প্রজেক্টের অংশ হিসেবে প্রজা-সাধারণের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপনের যে ‘দায়িত্ব’ ইংরেজ সরকার অত্যন্ত সু(!)পরিকল্পিতভাবে পালন করেছে তার বিবরণ তো প্রায় সব লেখক-ই কমবেশ পরিবেশন করেন; কিন্তু কবি মজিদ মাহমুদ এইখানে প্রায় সবার চেয়ে ভিন্ন! কেমন? বলছি।

 

উপনিবেশিক প্রজেক্টের অংশ হিসেবে ইংরেজ যখন প্রজা-সাধারণের মাঝে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করছে তখন কিছু স্থানীয় উচ্চবিত্তের লোক তাদেরকে উদার হস্তে সহযোগিতা করেছিল। এই পয়েন্টে এসে অনেকের মতন তিনি হাঁপিয়ে উঠেননি; সহযোগীদের নাম-ধামসহ নালিশপত্র গুছিয়ে গেছেন। এই জায়গায় সত্যবাদিতার খাতিরে কিতাবখানা আক্ষরিক অর্থেই হয়ে উঠেছে ‘ব্যতিক্রম’।

 

এবং, না বললেই নয়— সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নজরুলের ঐতিহাসিক তুলনারহিত অবস্থানকে ‘উপনিবেশ-বিরোধী’ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেছেন। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নজরুলের অবস্থানকে একচেটিয়াভাবে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার যে ‘হুজুগে’ ধারা তাতে লেখকের এই নোকতা নজরুল-অনুরাগী গবেষক, চিন্তকদের বেশ কাজে দেবে।

 

এই কিতাব আসলে নজরুলের সমস্ত বিরোধী-ধারা— উপনিবেশবিরোধী, বর্ণবাদবিরোধী, জুলুমবিরোধী, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী— সবগুলোকে একটা প্যাকেজের আওতায় নিয়ে আসে। লেখকের ব্যাখ্যাও বেশ ইন্টারেস্টিং। লেখক দেখাচ্ছেন, বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ উপমহাদেশের উপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে নজরুলের অবস্থান ; আবার সমাজে যখন উচ্চবিত্ত নিম্নবিত্তকে অর্থনৈতিকভাবে উপনিবেশ বানিয়ে রেখেছে তখন এই অর্থনৈতিক উপনিবেশের বিরুদ্ধে নজরুলের অবস্থান ; আবার সাম্প্রদায়িকতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে যখন উপনিবেশী শাসক উপনিবেশিকতা খুব আয়েশের সাথে ভোগ করছে তখন নজরুল এই সাম্প্রদায়িকতার‌ও বিরুদ্ধে! জুলুম, উৎপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থানে নজরুলের এই যে ধারা (Chain) তার বিবরণ ও বিশ্লেষণে কিতাবখানা হয়ে উঠেছে অসাধারণ।

 

ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নজরুলের অবস্থানকে গভীরভাবে তলিয়ে না দেখে, একচেটিয়া ‘হুজুগে’ তরিকায় বিচারের মাধ্যমে যে অবিচার আজ‌ও চলছে তার প্রতিবাদ হিসেবে পড়া দরকার এই কিতাব। আবার, নজরুলের কবিতার নান্দনিকতা, শিল্পরূপ ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন তোলে যারা একপ্রকার বাতিল করে দিতে চান তাদেরকেও পাল্টা প্রশ্ন ছোঁড়া হয়েছে দুয়েক জায়গায়, প্রসঙ্গত। সবমিলিয়ে নজরুল গবেষণাগ্রন্থ হিসেবে ব‌ইটি অবশ্যই ব্যতিক্রম; আবার জনপ্রিয় ধারার দৃষ্টিকোণ থেকে বৈপ্লবিক‌ও বটে।

 

মতামত
লোডিং...