পুনঃপ্রকাশ || ধস্ত-বিধ্বস্ত বিশ্ববিদ্যালয় : আহমদ ছফা || প্রবন্ধ

(প্রসঙ্গ-বার্তা: আনুপূর্বিক তসলিমা এবং অন্যান্য স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ প্রবন্ধ-গ্রন্থটি আহমদ ছফার বহুল আলোচিত কিতাবের মধ্যে অন্যতম। স্টুডেন্ট ওয়েজ থেকে প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯৪ সনে। এতে মোট বারোটি প্রবন্ধ আছে। তন্মধ্য থেকে “ধস্ত-বিধ্বস্ত বিশ্ববিদ্যালয়” প্রবন্ধটি সময়োচিত মনে করে পুনঃপ্রকাশ করা প্রয়োজন মনে হলো। বইয়ের ভূমিকায় ছফা জানাচ্ছেন, এ প্রবন্ধটি সাপ্তাহিক উত্তরণ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, ১৯৮৯ সনে। আমরা দেখছি- গভীরভাবে লক্ষ্য করার প্রয়োজন নেই- যে, সেই সময়ের ছফা-বর্ণিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা আজ ত্রিশ বছর পরও বলার মতো উন্নতি হয়নি। ফলে, প্রবন্ধটি বর্তমানেও বীরবিক্রমে জীবিত। আশা করি, পাঠককুল উপভোগ করবেন।)

 

আমার মায়ের মৃত্যু হয়েছিলো ঊনিশশো চুয়াত্তর সালে। সে সময় মনে হয়েছিলো পৃথিবী আপন কক্ষপথ থেকে খসে গেছে। নিখিল চরাচর মনে হয়েছিলো শূন্য নিরর্থক। তারপর সময় সে সহ্যের অতীত বেদনার দাহ আস্তে আস্তে হরণ করে নিয়েছে।

 

বিশ্ববিদ্যালয় আমার আরেক মা। জ্ঞানদায়িনী মা-আলমা মেটার। আমার মধ্যে যা কিছু উজ্জ্বল সুন্দর এই মায়ের উষ্ণ স্নেহের ছোঁয়ায় বিকশিত হয়েছে, ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। এখনও আমি বিশ্বাস করি এই বিশ্ববিদ্যালয় এমন এক চিন্ময় সত্তার আধার, বর্বরের কলুষ স্পর্শ কোনদিন তাকে কলংকিত করতে পারে না; এমন এক বিস্ময়কর দিগ্বীজয়ী শক্তির উৎস কোনোও ক্ষমতাদর্পী অপ্রতিহত দশদিক প্রসারিত প্রাণের গতি-তরঙ্গে বিধিনিষেধের আগল পরাতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় এখন মুমূর্ষ রুগ্ন। তার অল ধবল শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে শোণিত স্রোত। তার প্রাণের প্রবাহপথ রুদ্ধ করে, ইট-কাঠ-পাথরের প্রকান্ড ভূতুড়ে চেহারা প্রকটিত করে রাক্ষসী ডাইনীর চেহারায় তাকে পরিচিত করে তোলার জন্য চেষ্টার অন্ত নেই। এই রকম নিষ্ফলা-বন্ধ্যা সময়েও আমি বিশ্বাস করি, ভুখন্ডের জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্যুতের অক্ষরে অমোঘ নির্দেশ জারী করতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়, উত্তেজিত হও, জাগ্রত হও, জ্ঞানের আলোকে জাগো, মানবতার আবেগে জাগো, প্রতিরোধের দুর্দম স্পৃহা বুকে নিয়ে নতুন পৃথিবী নির্মাণ করার প্রতিজ্ঞায় জাগো।

 

আমি সবসময় বিশ্ববিদ্যালয়কে কলুষ কলঙ্কনাশক একটি পবিত্র সত্তা হিশেবে আমার সমগ্র সত্তায় গ্রহণ করেছি। আমাকে খুন করে ফেললেও বিশ্ববদ্যালয়কে অন্য কোনো পরিচয়ে গ্রহণ করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। ব্যক্তিগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে অনেক দুঃখ দিয়েছে। তবু এই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে আমার গর্বের অন্ত নেই। মুর্গী যেমন শরীরের ওমে ডিম থেকে বাচ্চা ফোটায়, তেমনি আমার জীবনের যা সারবস্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃজনশীল উত্তাপ ফুটিয়ে তুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে মন্ত্রমুগ্ধ বালকের মতো এখনো বিস্ময়-বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে থাকি। এখনো বিশ্ববিদ্যালয় আমার কাছে অত্যন্ত রহস্যের ভান্ডার। কোনদিন তা ফুরাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে অনেক কথা বলেছেন, অনেকে অনেক কিছু লিখছেন। তাঁরা ফেলনা মানুষ নন। অনেকেই কীর্তিমান। কীর্তির গৌরবে স্ফীত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে অকহতব্য কথা তারা বলতে পারেন। সেগুলোর আংশিক সত্যতার ব্যাপারেও আমার কোনো সংশয় নেই। তবু এই সকল গুণী ব্যক্তির নির্মম নিষ্ঠুর সত্য ভাষণকে অর্বাচীনের আস্ফালন জ্ঞান করার ক্ষমতা আমি অর্জন করেছি। বহুদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ধরনের কাজকর্মের অনুষ্ঠান হয়ে আসছিলো এবং সাম্প্রতিক সময়ে যা বীভৎসতা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে, দেখে আমার মনে হয়েছে সুদূর নীলিমায় উড্ডীন মঙ্গল এবং পবিত্রতার প্রতীক শুভ্রপক্ষ বিহঙ্গ এ্যালবাট্রসকে দুষ্ট ব্যাধের দল চক্রান্তজালে আটক করে ঝলসানো মাংস ভক্ষণের তামসিক আকাঙ্ক্ষায় ভোতা ছুরি দিয়ে জবাই করছে। একটা বিষাদময় অনুভূতি আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।

সারা শরীরে একটা অদ্ভুত ছটফটানি ছড়িয়ে পড়ে। অভ্যন্তরে অজস্র ধারায় শোণিতপাত ঘটতে থাকে। আমার উন্মাদ হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। এই সকল বন্য বরাহের সন্তানদের মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করার স্পর্ধা জাগে। পরক্ষণে ধিক্কার দিয়ে নিজেকে শান্ত করতে চেষ্টা করি। জ্ঞান তো সবচাইতে সেরা শক্তি। জ্ঞান নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে জানে। জ্ঞানের আত্মরক্ষার জন্য লাঠিয়াল বা পাহারাদারের প্রয়োজন হয় না। সুতরাং আমার ক্ষোভ নিরর্থক। তবু রক্ত-মাংসের মানুষ তো, ভাবনা তাড়ানো সম্ভব হয় না। অন্য একটা দৃষ্টিকোণ ক্রমাগত স্বচ্ছ হয়ে উঠতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়কে কেউ যখন জখম করে আমার ক্রমাগত মনে হতে থাকে নদনদী পরিবেষ্টিত, চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ, নক্ষত্রখচিত এই সুন্দর দেশটির শরীরেই জখম করা হচ্ছে।

চুয়ান্ন হাজার বর্গমাইলের এই দেশটির যা কিছু আশা-ভরসার তার সবটাইতো ধারণ করে এই বিশ্ববিদ্যালয়। অকারণে একদিন যদি বন্ধ থাকে, একদিন যদি লাইব্রেরীর দুয়ারে তালা ঝোলে, আমার আফসোস হতে থাকে দেশটি একটি বছর পিছিয়ে গেলো। রূপকথার রাক্ষসীর প্রাণভ্রমর যেমন কুয়োর ভেতরের রূপোর কৌটোয় বন্দী, তেমনি দেশের প্রাণ-ভ্রমর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কেউ যখন লুচি-কাবাবের ময়দার মতো চটকা-চটকি করে আমার মনে হতে থাকে দেশের প্রাণ এবং আত্মাকে এরা পিষে ফেলতে উদ্যত হয়েছে। প্যারাডাইজ লস্টের মহাকবি মিল্টন তাঁর এ্যারোপিজিটিকা গ্রন্থে গ্রন্থের মহিমা কীর্তন করতে গিয়ে বলেছিলেন, একটি গ্রন্থকে হত্যা করা একটি মানুষ হত্যার মতো মারাত্মক, ভয়াবহ নিষ্ঠুর কর্ম। আমি মিল্টনের পায়ের নখের যুগ্যি নই, তবু আমার মনে ধারণা জাগে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মপ্রবাহ এবং প্রাণচাঞ্চল্য স্তব্ধ করে দেয়া একটি জাতির কর্মপ্রবাহ এবং প্রাণপ্রবাহ স্তব্ধ কর দেয়ার শামিল। তথাপি বিগত দশকের অধিকাল সময় ধরে আমাদের দেশের চলতি শাসক এবং হবু শাসকের দল পরমানন্দে সত্য ন্যায় এবং পবিত্র ইসলাম প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার পোষণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নরম স্পর্শকাতর প্রত্যঙ্গসমূহে গাঁইতি শাবলের আঘাত করে চলেছেন। তাঁদের কাছে এটা দৈনন্দিন রাজনৈতিক ক্রীড়ার অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্রতা অলংঘনীয়তার প্রয়োজনের কথা বলে বিশেষ লাভ হবে না। তাঁরা সমৃদ্ধ দেশ চান না, ক্ষমতা চান। সুগঠিত জাতি এবং সমুন্নত সংস্কৃতি চান না, শুধু শাসক হওয়ার, ধার্মিক হওয়ার অধিকার অর্জন করতে চান। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর উপুর্যপরি বলাৎকার চালানো এই মহাপুরুষ এবং মহীয়ষী নারীদের মুখ্য রাজনৈতিক কর্মকান্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা কি চান সেটা নিশ্চিতভাবে জানেন। এই দেশে সব ধরনের পণ্য বিদেশ থেকে আসে। শিক্ষাও একটি বিপণনযোগ্য পণ্য। তাও আসুক বিদেশ থেকে। ক্ষতি কোথায়? শিক্ষিত মানুষ প্রয়োজন, তাও বা এমন কি ভাবনার বিষয়। এই হাতের তালুর মতো ছোট এক টুকরো দেশ। একে চৌদ্দপুরুষের তালুকের তো দখলে রাখার জন্য কতোজনই বা শিক্ষিত মানুষের প্রয়োজন। বাইরে থেকে সে পরিমাণ মানুষ আমদানি করতে কোনো অসুবিধা নেই। তাঁদের ছেলে মেয়েরা ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, ভারত এ-সকল দেশে চলে গেছে। সেখানে উত্তাপিত বেস্টনীর মধ্যে তাদের পুত্র কন্যারা অখন্ড মনোযোগ সহকারে লেখাপড়া করছে। ঘন্টা বাজলেই ফিরে এসে একে-একে সুযোগ সুবিধের আসনগুলোতে ঝটপট বসে পড়বে। সুতরাং দেশের ভেতরে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন কি? ইমারত অট্টালিকা এবং মাস্টারকুল যখন আছে, সুতরাং লক্কর-ঝক্কর করে বিশ্ববিদ্যালয় চলুক। এর একটা মোক্ষম প্রয়োজন তো আর অস্বীকার করা যায় না। নেতাদের ক্ষমতায় বসাতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়কে বলতে হয়, চুপ করে থাকবে, যা বলি শুনবে। খবরদার প্রতিবাদ করবে না। তাহলে গুলি করবো। আবার আরেক দল নেতার প্রয়োজনে ক্ষমতাসীন নেতাদের আসন থেকে নামিয়ে আনার সময়ে আবার বিশ্ববিদ্যালয়কে ডাকতে হয়, এসো এদের টেনে নামাও। এটা সুন্দর খেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ খেলায় যে অংশ নেবে না তার এদেশে থাকার অধিকার নেই। সে দেশের শত্রু। দেশ-দেশ বলে খামোখা চীৎকার করো না। আমরাই দেশ, আমরাই জাতি। আমরা আছি বলেই ধর্ম আছেন, তোমরা পরস্পরের সঙ্গে খুনোখুনি করে ওই বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠো। কত সহজে তোমরা মস্তান হয়ে উঠতে পারো, সেটাই হবে তোমাদের যোগ্যতার স্বীকৃতি। মস্তান হিসেবে দক্ষতা অর্জন করাই হবে তোমাদের ছাত্রত্বের আসল পরিচয়। চিন্তার জগৎ, জ্ঞানের জগৎ, ভাবের জগৎ ওসব অরণ্যের চাইতেও ভয়াবহ এলাকা। না না ওসব এলাকায় তোমাদের যেতে চেষ্টা করা একেবারেই উচিত নয়। তোমরা কোমলমতি যুবক, দেখো রাজপথগুলো কতো সোজা, কতো দ্রুত গতিতে যাওয়া আসা করা যায়। চাকু, রামদা, হকিস্টিক এগুলো ব্যবহার শিক্ষা করা কতো সহজ। তোমদের পাগুলো দেখে কি রকম চঞ্চল গতিময়, হাতগুলো ক্ষিপ্র। আর দেখো এ এক চমৎকার খেলা, রিভলবারের ট্রিগারে একবার চাপ দাও দেখবে একটা সীসের গুলি বেরিয়ে আসছে। একটা গুলিই একটা আস্ত মানুষকে খুন করার জন্য যথেষ্ট। রাইফেল মেশিনগানের ব্যবহার যদি শিখতে পারো, আর তোমাদের পায় কে! এক্কেবারে গন্ডা গন্ডা মানুষ খতম করতে পারবে। মানুষ মারার নেশা ভারী চমৎকার নেশা। সুন্দরবনের বাঘকে মানুষ এতো ভয় এবং এতো শ্রদ্ধা করে কেন জানো? তার একটাই কারণ বাঘ খুন করতে জানে। আমরা তোমাদের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার বানাবার সমস্ত প্রতিশ্রুতি দিতে পারি। কি সুন্দর লোভনীয় জীবন তোমাদের জন্য সামনে অপেক্ষা করছে। হাতে কড়কড়ে টাকা সব সময়ে থাকবে। টাকা এমন বস্তু- ও দিয়ে যা চাইবে কিনতে পারবে। চমৎকার গাড়ি, সুন্দরী নারী, দামী সুরা। এতে শেষ নয়। এক ডাকে দেশের মানুষ তোমাদের চিনবে। তোমাদের নাম ফেটে যাবে। তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ মন্ত্রী হতে পারবে। এটা নিশ্চিত ধরে নিতে পারো একাত্তর সালে একজন পাঞ্জাবী মেজর জেনারেলের হাতে যে পরিমাণ ক্ষমতা ছিলো তার চাইতে অনেক বেশী ক্ষমতার মালিক হবে তোমরা। ক্ষমতা এক আশ্চর্য জিনিশ, ক্ষমতার বলে বুদ্ধিমানকে দাস করা সম্ভব। থুথুরে বুড়ো হলেও ষোড়শী তন্বীর পাণিগ্রহণ করা যায় অতি অনায়াসে। সেই ক্ষমতার মালিক মোখতার হতে যাচ্ছো। তোমাদের জীবন দর্শন হবে ক্ষমতার পুজো করা ক্ষমতাবান হতে চেষ্টা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠন, পাঠনের নিরামিষ জীবনচর্চা, শুষ্ক বিদ্যার বিচালি চর্বণপদ্ধতির সর্বাংশে বিরোধিতা করার নির্দেশ দেবো। তোমরা উন্মত্ত অট্টহাস্যে উন্মত্ত নৃত্য করতে থাকো।

প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ; করেছেন- মামুন কায়সার।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত নানা দায়িত্বশীল ব্যক্তি, কখনো কখনো শিক্ষকদের মধ্যে কেউ কেউ, আত্মপক্ষ সমর্থন করে প্রায়শ বলে থাকেন, বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বাইরে নয়, সারা দেশে যা ঘটছে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের বাইরে স্থিত পরীর দেশের কোনো দুর্গ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এ বক্তব্যের মধ্যে সত্যের অপলাপ নেই। কিন্তু এটাকে সর্বশেষ সত্য মেনে নিলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে, সন্ত্রাস মুক্ত করতে হবে, শিক্ষাজীবন নির্বিঘ্ন এবং নিশ্চিত করতে হবে, এসব কথার কোনো মূল্য থাকে না। দেশে তো হানাহানি মারামারি নৈরাজ্য, দুর্নীতি, রাহাজানী, ছিনতাই, এসবের রাজত্ব চলছে। এগুলো অদূর ভবিষ্যতে কেনো যাদুমন্ত্র বলে থেমে যাবে তার তো কোনো লক্ষণ দৃষ্টিগোচর নয়। দেশে যা ঘটছে বিশ্ববিদ্যালয়েও তা ঘটবে। এটাকে স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরে নিতে হবে। তাই যদি হয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আলাদা করে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন হতো না। তথাপি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের সচেতন এবং চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ যখন বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ষা করো ধ্বনি তুলেছেন পত্র-পত্রিকায়, সভা-সমিতিতে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্রতা অক্ষুন্ন রাখার সপক্ষে জনমতকে প্রভাবিত করতে তৎপর হয়েছেন, ধরে নিতে হবে দেশের ভেতরে অনুষ্ঠিত যাবতীয় নষ্টামি, অনাচার এবং অজাচারের ডাষ্টবিন নয় বিশ্ববিদ্যালয়। এর বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা স্বতন্ত্র পরিচয় আছে। সেটা কি? বিশ্ববিদ্যালয় সরকার এবং বিরোধীদলের রাজনৈতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ধাক্কা সামলাবার বাফারস্টেট নয়, তবে চলমান রাজনীতির প্রভাব যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে না সেটা আশা করা যায় না। কিন্তু চলমান রাজনীতির ঘাত-প্রতিঘাত সবটা একা যখন বিশ্ববিদ্যালয়কে বইতে হয়, পরিণতি কি হতে পারে আজকের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ তার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই।

মাসে তিরিশ দিন দাঙ্গা-হাঙ্গামা অনুষ্ঠিত হয়, অনবরত বোমাবাজি চলছে, দেশের ক্রিমিন্যালরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসসমূহে ডেরা পেতেছে। পত্রিকার সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের একাংশকেও এই ক্রিমিনালদের সঙ্গে হাত মিলাতে হচ্ছে। মোটকথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমানে যে পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িয়েছে তা দেখে জাতীয় জীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা কি সে প্রশ্নে একটা দুঃখজনক সিদ্ধান্তে না এসে উপায় থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয় দেশ-জাতির পক্ষে যা কিছু শুভ, কল্যাণপ্রদ, মঙ্গলদায়ক তার নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে, জাতির আশা আকাঙ্ক্ষা ধারণ করেছে এবং মানসজীবনে গতিশীল রেখেছে, হালফিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সে ভূমিকা পালন করার ক্ষমতা নেই। সাম্প্রতিককালে সমগ্র দেশে যে অনাচার, দুঃশাসন, নৈরাজ্য এবং সন্ত্রাস চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আর পূর্বের মমত্ব অনুভব করে না। অভিভাবকবৃন্দ যাঁদের ক্ষমতা আছে, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে যে সকল পরিবারের ছেলেমেয়েরা ভর্তি হয়ে থাকে যাদের বাইরে যাওয়ার কোন ক্ষমতা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক বিপর্যয়ের সঙ্গে সঙ্গে গোটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাটা চূড়ান্তভাবে ভেঙ্গে পড়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় লাখ খানেক স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর শ্রেণীর ছাত্র ছাত্রী ভারতীয় কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালসমূহে পড়াশুনা করে থাকে। দশ বছর পূর্বে এই অবস্থাটা কল্পনা করাও যেতো না। আমাদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজসমূহের তুলনায় নিকৃষ্ট ছিলো না। ভারতের বাইরে ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানী ইত্যাদি দেশে কতো সঙ্গতিপন্ন পরিবারের ছেলেমেয়েরা পড়াশুনা করছে, তার পুরো হিসেবটা এখনো অনুদঘাটিত থেকে গেছে। দেশের মধ্যবিত্ত সমাজ, যারা জাতির সংস্কৃতি এবং বুদ্ধিবৃত্তিকে নেতৃত্ব দান করে থাকে, গত দেড় দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত কর্মকান্ড দেখে এতোদূর হতাশ হয়ে পড়েছে যে নিজেদের পুত্রকন্যাদের দেশের বাইরে পাঠিয়ে মানসিকভাবে নিশ্চিত হতে চাইছে। ছেলেমেয়েদের বাইরে পাঠানোর প্রবণতা হালে এতো বৃদ্ধি পেয়েছে, একান্ত নিম্নবিত্ত পরিবারের মা-বাবারাও বিত্ত-বেসাদ বিক্রি করে ছেলেমেয়েদের বাইরের কোনো দেশে অন্তত ভারতবর্ষের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাবার জন্য ক্রমবর্ধমান হাতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আর কেউ আস্থা রাখতে পারছে না।

 

স্বাভাবিক নিয়মে একটা সময়ে এই সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। কিন্তু তারপরে যে সরকার বসবে, সেই সরকারের পক্ষে শিক্ষাজীবনকে পুনর্গঠন করা কি সম্ভব হবে? ক্ষতি যা হওয়ার এরই মধ্যে ঘটে গেছে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যে গহ্বরে নেমে গেছে, আগামী পঞ্চাশ বছরেও সেই অতল-গভীর খাদ থেকে টেনে তোলা সম্ভব হবে কি?

এই অবস্থাটা কেন সৃষ্টি হলো, কারা গোটা পরিবেশটা বিষিয়ে তোলার জন্য দায়ী, এই ব্যাপারটা যতোই ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করতে চেষ্টা করেছি, ঘুরে ফিরে একটাই জবাব পেয়েছি, নিছক ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করা এবং ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে হাতিয়ার হিশেবে ব্যবহার করতে গিয়ে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, আজ বিশ্ববিদ্যালয়টা গ্রাস করে ফেলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক প্রশাসক যাঁরাই থাকেন এই পশুশক্তির কাছ থেকে ছাড়পত্র সংগ্রহ করে অবস্থান করতে হয়। উৎকর্ষ বিবর্জিত জাতীয় রাজনীতির প্রথম বলি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এবং সারাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। ছত্রিশক্তিকে ব্যবহার করে সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়, বিরোধী দলসমূহও একই ছাত্রশক্তিকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় চড়ে বসতে চায়। এক সময়ে ইউরোপের শক্তিমান দেশগুলো নিজেদের মধ্যে শক্তিপরীক্ষার জন্য তুর্কী খলিফার শাসনাধীন বলকান অঞ্চলকে বেছে নিতো। এতে করে একটা লাভ এই হতো যে, যে পক্ষই জয়লাভ করুক, নিজেদের দেশের লোকজন, কলকারখানা শিল্প-বাণিজ্য যুদ্ধের মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি থেকে বেঁচে যেতো। আমাদের রাজনৈতিক দলসমূহও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের শক্তি পরীক্ষার ক্ষেত্র হিশেবে বেছে নিয়েছে। ক্ষমতার এই বহুপাক্ষিক দড়ি টানাটানির মধ্যে পড়ে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় আজ নিঃস্ব, উত্থানশক্তিহীন। এখন বিশ্ববিদ্যালয় বলতে বুঝতে হবে কতোগুলো ইটকাঠের প্রাণহীন ভবন, কতিপয় শিক্ষক যারা এপক্ষ বা ওপক্ষের হয়ে উস্কানি দিচ্ছেন হাজার-হাজার নিরীহ অসহায় ছাত্রছাত্রীকে। রীতিমত ক্লাশ হয় না, ক্লাশ হলে পরীক্ষা হয় না, পরীক্ষার ফলপ্রকাশ মাসের পর মাস স্থগিত থাকে, সেশনজট হামেশা লেগে আছে। মিছিল চলছে, বক্তৃতা চলছে, বোমা ফুটছে, খুন হচ্ছে। বিশ-পঞ্চাশজন অস্ত্রধারী মস্তান সমস্ত প্রতিষ্ঠানটির টুঁটি টিপে ধরেছে। কখনো কখনো পুলিশ ওই সমস্ত মস্তানদের গ্রেফতার করে। তারা সরকারী সমর্থক হয়ে ফিরে আসে, বিদেশের দূতাবাসগুলোতে সরকারী চাকুরী নিয়ে চলে যায় অথবা মন্ত্রীত্ব বা অন্য কোনো সরকারী গুরুদায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতিতে সরকারকে সমর্থন করে বসে। এই হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমগ্রিক পরিস্থিতি। নোংরা পঙ্কিল স্বার্থবাদী রাজনীতির শিশুশ্রমিক হিশেবে ব্যবহৃত হয়ে হয়ে ছাত্রদের আকাঙ্ক্ষা এবং মনোভাব অনেকাংশে দূষিত এবং বিকৃত হয়ে পড়েছে।

 

পুকুরের শৈল, বোয়াল এই জাতীয় রাক্ষুসে মাছ থাকলে যেমন রুই কাতলা, মৃগেল ইত্যাদি মাছের চাষ অসম্ভব হয়ে পড়ে, রাক্ষুসে মাছেরাই সমস্ত মাছের পোনা সাবাড় করে ফেলে। যে সমস্ত ছাত্র যতো বদ, খুনোখুনিতে যতো ওস্তাদ, যতো বেশি মাদকদ্রব্যসেবী, তারাই আজ নেতৃত্বের আসন দখল করে আছে। তারা জ্ঞান কিংবা নীতি দিয়ে নয়, প্রতিভা বা চরিত্র দিয়ে নয়, শুধুমাত্র ভীতি প্রদর্শন করে, শুধুমাত্র সন্ত্রাস সৃষ্টি করার দক্ষতার জন্য নেতৃত্বের আসন অধিকার করে। এই রাক্ষুসে ছাত্রনেতাদের সামাল দেয়ার জন্য অন্যান্য দলও মস্তানদের রীতিমতো তিনবেলা দুধ-ঘি-মদ মেয়ে সরবরাহ করে প্রতিপালন করে থাকে। নিরীহ ছাত্র ছাত্রীদের অবস্থার বলি হওয়া ছাড়া আর কোনো গন্তব্য নেই। শিক্ষকদের মধ্যে যারা এই মস্তানদের সর্ব ব্যাপারে সহায়তা করে থাকেন তাঁরাই দুন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে থাকেন। ন্যায়বান, সৎ এবং বিদ্যানুরাগী শিক্ষকেরা নেহায়েত গোবেচারা হিসেবে চিহ্নিত হন। তাঁদের কথা কেউ শোনে না। সকলে তাদের করুণা করে।

 

সনাতন যে সকল মূল্যবোধ জ্ঞানবিকাশ, চরিত্রসৃষ্টি, সৎ নেতৃত্বের বিকাশের জন্য প্রয়োজন বলে স্বীকৃত হয়ে এসেছে সেগুলোর স্ফুরণ বর্তমান পরিস্থিতিতে একরকম অসম্ভব। ছাত্রসমাজের আদর্শের ক্ষুধা আছে কিন্তু শিক্ষক কিংবা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কারো মধ্যে সে আদর্শের মূর্তিমান উপস্থিতি নেই। ফলে ছাত্রদের মধ্যে কোনো স্বপ্ন নেই, লক্ষ্য নেই। এই সকল মানবজমিন চাষ দিয়ে উপযুক্ত বীজ বপন করলে সোনা ফলানো হতো। দৃষ্টান্তের অভাবে, আদর্শের অভাবে মানুষ নামের কলংক হিশেবে সাবালকত্ব প্রাপ্ত হচ্ছে।

মানুষ নদীর ওপর সেতু বাঁধার কথা কল্পনা করে, কারণ কঠিন হলেও কর্মটা অসম্ভব নয়, কিন্তু সমুদ্রের ওপর সেতু রচনার কথা কেউ বলে না। কারণ সেটা অসম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার একটা সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সমুদ্রের ওপর সেতু রচনার মতো অসম্ভব কর্ম মনে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে সংস্কৃতির উত্তাপিত বেষ্টনি হিসেবে, জ্ঞান বিজ্ঞানের সূতিকাগার হিসেবে ফিরে যেতে জাতিকে কতোদিন অপেক্ষা করতে হবে, আগাম ভবিষ্যদ্বাণী করা একরকম অসম্ভব।

 

(আনুপূর্বিক তসলিমা এবং অন্যান্য স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ : স্টুডেন্ট ওয়েজ, ১৯৯৪, প্রথম সংস্করণ থেকে প্রবন্ধটি হুবহু কপি করা হয়েছে।)

মতামত
লোডিং...