বিশেষ আয়োজন || ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-কে নিয়ে দশটি বিশেষ স্মৃতি ||

 

এক. অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁ:

একদিন বোর্ডের কমিটিতে ডক্টর সাহেব, কবি গোলাম মোস্তফা সাহেব এবং আরো দুইজনের সঙ্গে কাজ করছি। একটি বিতর্কমূলক বিষয় নিয়ে হাওয়া গরম। এমন সময় কবি গোলাম মোস্তফার উপর ডক্টর সাহেব বিষম রেগে উঠে তাঁকে একটা কঠিন কটু কথা বলে ফেল্লেন। আমি ভয় পেয়ে গেলাম যে গোলাম মোস্তফা সাহেব উত্তরে না জানি কি বলেন। কবি সাহেব মুখ খোলার আগেই আমি ডক্টর সাহেবের দিকে চেয়ে বল্লাম, বয়সে আপনি আমার বড় ভাই, ভাইয়ের মতই আপনাকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু সে শ্রদ্ধা অটুট রেখেও আপনার এ মন্তব্য সম্বন্ধে আমি আপত্তি না করে পারিছি না। সঙ্গে সঙ্গে ডক্টর সাহেব দাঁড়িয়ে গেলেন। গভীর অনুতাপের সুরে বলেন, ‘আমার ভুল হয়ে গেছে, কবি সাহেব, আমি লজ্জিত, দুঃখিত, মাফ চাচ্ছি।’ চোখের পলকে নিজের ভুল বুঝে তার জন্য অকুণ্ঠ কণ্ঠে মাফ চাওয়া – নিঃর্সন্দেহে এ চীজ সর্বত্র সুলভ নয়।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ শতবর্ষপূর্তি স্মারকগ্রন্থ : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১৯৯০, ১৭৯ পৃষ্ঠা

 

দুই. দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ:

সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই আরম্ভ হল হারমোনিয়াম যোগে গান ও নূপুরের নিক্কণ। সঙ্গে সঙ্গে বাহবা বাহবা বলে মাতালদের বিরক্তিকর প্রশংসা। আমাকে সকল পরীক্ষার্থী পাঠালেন নিচে নেমে এদের এ উপদ্রব বারণ করার জন্য। আমি গিয়ে দেখি এলাহি কাণ্ড। একটা কিশোরকে মেয়েদের সাজে সাজিয়ে  ‍নূপুর পায়ে দিয়ে নাচানো হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজানো হচ্ছে এবং তার সঙ্গে তবলার সঙ্গত করছেন একজন বর্ষীয়ান ব্যক্তি। দেশী মদও চলছে হরদম। এ ব্যাপারটা ঘটছে একজন মেথরের মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে। তাতে বাধা দিলে, তারা সকলে হাতজোড় করে বললে, “হুজুর মাইবাপ-ইয়ে আপকা লাড়কি হ্যায়—হামকো খুশী করনে দিজিয়ে।’ তাতে রাগের কিছুটা উপশম হলেও বললাম, তাহলে আস্তে-ধীরে ভদ্র ভাবেই কাজটা করো। এতো চেঁচামেচি করে আমাদের পড়তে দিচ্ছো না কেন?’ তাতে তারা সম্মত হলে উপরের তলায় উঠে গেলাম। ব্যস, গান বাজনা চেঁচামেচি সব কিছুই বন্ধ। আমার কাছে বিষয়টা একেবারে আরব্য উপন্যাসের ব্যাপার বলে মনে হল। তাই ফের নেমে গেলাম রহস্য ভেদ করার উদ্দেশ্যে। গিয়ে দেখি, ড. শহীদুল্লাহ্ একখানা টকটকে লাল শাড়ি নিয়ে চেয়ারে বসে রয়েছেন এবং মেথরেরা একজোট হয়ে তাকে কদমবুসি করছে। তিনি দাওয়াত পেয়ে মেথরের মেয়ের জন্য একখানা শাড়ি উপহার দেওয়ার জন্য নিয়ে এসেছেন। এজন্য তাঁর দোয়া লাভের পূর্ব পর্যন্ত সকলেই শান্ত সমাহিত চিত্তে অপেক্ষা করছে। এত বড় অদ্ভুত ও আশ্চর্যজনক বিষয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে ভাবতেই পারিনি। আমায় দেখে বললেন, ‘ওরাও মানুষ।’ তারপরে তিনি চলে গেলে আবার চললো সে গানের দৌরাত্ম্য। তা কেবল সে রাতেই নয়—দু’তিন রাত্রি পর্যন্ত সরগরম ছিল।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ শতবর্ষপূর্তি স্মারকগ্রন্থ : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১৯৯০, ১৯৫ পৃষ্ঠা

 

তিন. আতাউর রহমান:

শহীদুল্লাহ্-চরিত্রের উদারতায় মুগ্ধ হয়েছিলাম ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারী দাঙ্গায়। পশ্চিমবঙ্গ থেকে কিছু সংখ্যক মার খাওয়া মুসলমান বাংলাদেশে প্রবেশ করলে এই ব্যাপারের সূত্রপাত হয়। একদিন শহীদুল্লাহ্ সাহেব ক্লাসে এসে অত্যন্ত বিচলিত অবস্থায় বললেন, ‘মানে কি, এরকম ভাবে মানুষ হত্যা করা ইসলামের নীতি নয়। পাকিস্তান যদি ইসলামী রাষ্ট্র হয় তবে সংখ্যালঘু মানুষের জানমাল রক্ষা করা তার পবিত্র দায়িত্ব। জানো আজ খুব খারাপ খবর পেয়েছি। হরনাথ পাল (বিভাগীয় শিক্ষক) আহত হয়ে হাসপাতালে আছে। আমাকে এখনই সেখানে যেতে হবে। তোমাদেরও যাওয়া উচিত। হরনাথ আমার ছাত্র- আমাকে এখনই হাসপাতালে যেতে হবে।’

আমরা বললাম, ‘স্যার, চারদিকের হাওয়া খুব গরম। এ সময় দাঙ্গার বিরুদ্ধে কিছু বলা মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা।’

‘না, তা হতে পারে না। তোমরা যা-ই বলো না কেন এটা আমি মানতে পারবো না। ইসলামের নামে এ রকম চলতে পারে না। এটা গুণ্ডামী, এটা বর্বরতা। আমাকে এখনই হাসপাতালে যেতে হবে।’

সেদিন তিনি আমাদের ক্লাসে পড়া-লেখার কথা তুললেন না। পরদিন তিনি বললেন-(তখন তাঁকে অনেকটা শান্ত মনে হলো) ‘কাল হরনাথকে দেখে এসেছি। ওর ঘাড়ে আঘাত লেগেছে। তবে গুরুতর না সেটা। আশা করি বেঁচে যাবে।’

সত্যি হরনাথ বাবু বেঁচে গেছেন।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ শতবর্ষপূর্তি স্মারকগ্রন্থ : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১৯৯০, ২১৮ পৃষ্ঠা

 

চার. এবাদত হোসেন:

যারা প্রতিষ্ঠিত না হয়ে বিয়ে করে তাঁদের তিনি আদৌ দেখতে পারতেন না। তাছাড়া কারো বেশী ছেলে-মেয়ে হয়েছে শুনলেও খুব রেগে যেতেন। এই প্রসংগে একদিনের কথা মনে পড়ে। এক ফকির এসে ভিক্ষা চাইছিলো- ‘বাবা, বড় গরীব, ছয়টা ছেলে-মেয়ে’- এই না যেই বলেছে, উনি সংগে সংগে ধমক দিয়ে উঠলেন— ‘কে বিয়ে করতে বলেছিলো? খেতে দিতে পারো না তবে ছেলে জন্মাও কেন? আমার হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থাকলে তোমাদের মত লোককে খাসী করে দিতাম।’

 

আরম্ভ হলো ড. শহীদুল্লাহ্’র সংগে বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন জীবন যাত্রা। তিনি শিক্ষক, আমরা ছাত্র। তিনি শুধু শিক্ষকই নন শিক্ষকেরও শিক্ষক—অর্থাৎ মহাশিক্ষক। ক্লাসে তিনি আমাদের সংগে চটুল পরিহাস করতেন আর বলতেন, ‘তোমরা আমার নাতীর সমতুল্য, তোমাদের সংগে একটু মস্কারা না করলে চলবে কেন?’ আমরাও এটা অতি পুলকিত হয়ে মেনে নিয়েছিলাম, তাতে লাভও যথেষ্ট। যা ইচ্ছা জিজ্ঞাসা করা যায়, যা ইচ্ছা বলা যায়। যেমন, ক্লাসে তিনি প্যারীর সুন্দরী মেয়েদের গল্প প্রায়ই করতেন আর সেই সংগে প্যারীর দেশ থেকে যে পূর্ণ যৌবনে নির্মল চরিত্র নিয়ে ফিরে এসেছিলেন এটা কম কৃতিত্বের কথা নয়। কেউ হয়তো মন্তব্য করলো- ‘চরিত্র যে নির্মল ছিল সেটার তো কোন সার্টিফিকেট নেই।’ কেউ বললো- ‘প্যারীর মেয়েরা আপনার মত বেটে খাটো মানুষকে পছন্দ করবে কেন?’ স্যার আরো উচ্ছ্বসিত হয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে পেটের উপর হাত বুলিয়ে, চোখ টিপে হেসে বলতেন, ‘বেটে মানুষের প্রতি মেয়েদের আকর্ষণ বেশী।’

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ শতবর্ষপূর্তি স্মারকগ্রন্থ : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১৯৯০, ২২৪ পৃষ্ঠা

 

পাঁচ. এবাদত হোসেন:

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন দেখেছি তাঁর একটা ভৃত্য ছিল। নাম বোধহয় ওছিমদ্দিন। সে না বুঝতে কোন কথা বললে, না করতে কোন কাজ সুষ্ঠুভাবে। স্যার যে কতবার তাকে ধমকিয়েছেন এবং চাকরি থেকে বরখাস্ত করবার ভয় দেখিয়েছেন তার হিসেব রাখতে হলে statistical department খোলা দরকার ছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে সে নিজে এবং আমরাও নির্বিকার ছিলাম। সে ওছিমদ্দিন আজও বহাল তবিয়তে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করে যাচ্ছে। আমরা মাঝে মাঝে জেনেও না জানার ভাণ করে জিজ্ঞাসা করেছি। ‘স্যার ওছিমদ্দিনকে বোধহয় বরখাস্ত করেছেন?’ স্যার হেসে উত্তর দিতেন, ‘ওকে বরখাস্ত করতামই কিন্তু ওর ছেলেপেলে খাবে কি?’

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ শতবর্ষপূর্তি স্মারকগ্রন্থ : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১৯৯০, ২৩৩ পৃষ্ঠা

 

ছয়. অধ্যাপক এম. এ. রকিব:

মরহুমের বাস ভবনের লাইব্রেরীটি ছিল জ্ঞানভাণ্ডার বিশেষ। বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন ভাষার উপর অনেক মূল্যবান অথচ দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থাদি বিদ্যমান ছিল এতে। যে কোন ব্যক্তির প্রবেশ করার সাথে সাথে লোভ হতে পারে দু’একটি বই নেবার বা বাসায় নিয়ে পড়ার। কিন্তু না ; তা হবার কোন উপায় ছিল না। মরহুম (শত আদর-স্নেহ করলেও) কখনও বই যথাস্থান থেকে বাসায় নিয়ে যেতে দিতেন না—তবে তিনি এ যাবত দিতেন সেখানে বসে পড়তে। এবং যতই সময় লাগুক না কেন নোট করতে দিতেন ও সাহায্য করতেন। কোন বই বাসায় বা হলে এনে পড়বো বললে তিনি সবাইকে একটা সংস্কৃত শ্লোক শুনিয়ে খুশী মনে বিদায় করতেন। তাঁর সেই সুপ্রসিদ্ধ অমর শ্লোকটি মরহুমের অনেক ছাত্র-ছাত্রী ও আপন জনেরই জানা আছে। তা হলো :

লেখনি পুস্তিকা জায়া

পরহস্তং গতা গতা :

যদি সা পূণরায়তি

ভ্রষ্টা, নষ্টা চ মর্দিতা।

অর্থাৎ কলম, বই ও স্ত্রী অন্যের হাতে চলে গেলে একেবারে গিয়েছে বলে ধরে নিতে হয়, যদি তা ফিরেও আসে, তা পাওয়া যায় ভ্রষ্টা, নষ্ট ও মর্দিত অবস্থায়।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ শতবর্ষপূর্তি স্মারকগ্রন্থ : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১৯৯০, ২৩৯ পৃষ্ঠা

 

সাত. আবদুস সাত্তার:

উপস্থিত বুদ্ধির চাতুর্যে তিনি সবাইকে মাত করে দিতে পারতেন। একবার বাংলা একাডেমী চত্বরে মিটিং হচ্ছে। বলা আবশ্যক, এখনকার মতো বিরাট প্যাণ্ডেল বানিয়ে এবং চেয়ার-টেবিলের বাহাদুরীর ডামাডোলে পয়সা খরচের স্বাধীনতা তখন ছিল না। মিটিং চলছে খোলা মাঠে। মাটি ছাড়া বসার ব্যবস্থা নেই। লোকে লোকারণ্য। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সভাপতি। সবাই দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুনছে। সভা কর্তৃপক্ষ হাজার চেষ্টা অনুরোধ করেও জনতা বসাতে পারছে না। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তখন দাঁড়ালেন এবং বললেন, ‘উপস্থিত সুধীবৃন্দ, আপনারা মা-কে নিশ্চয়ই শ্রদ্ধা করেন?’

জনতার মাঝখান থেকে একবাক্যে উত্তর এলো, ‘জ্বি, জ্বি, অবশ্যি, অবশ্যি।’

তিনি আবার চেচিয়ে বললেন, ‘ছোট বেলা মার কোলে বসে আনন্দ ও আরাম পেয়েছেন?’

আবার জনতার একসঙ্গে উত্তর, ‘জ্বি, জ্বি, অবশ্যি, অবশ্যি।’

এবার ডক্টর সাহেব হেসে বললেন, আপনারা সত্যি যদি মা-কে শ্রদ্ধা করেন এবং মা’র কোলে বসতে আনন্দ পেয়ে থাকেন তবে এই মুহূর্তে আপনাদের অনুরোধ করবো আপনারা বিনা দ্বিধায় মা-টির কোলে অর্থাৎ মাটিতে বসে পড়ুন।’

জনতা একদম গলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সবাই মাটির কোলে বসে পড়লেন। জামিয়ে কয়েক ঘণ্টা মিটিং চললো। একটা টু শব্দ পর্যন্ত হলো না।

 

তখন আমি সিলেটে। ইদগাহ ময়দানে বিরাট ধর্মসভার আয়োজন করা হয়েছে। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্রধান অতিথি। জনতা ভেঙে পড়েছে এই জান-তাপসকে দেখার জন্য- তাদের কণ্ঠে মুহুর্মুহু ধ্বনি : ‘ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্  জিন্দাবাদ। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ জিন্দাবাদ।’

মিটিং শুরু হলো। বিরাট ময়দান। সব লোক দাঁড়িয়ে। ডক্টর সাহেব হেসে বললেন, ‘আপনাদের আবেগ আমি বুঝতে পেরেছি। আমি তো ছোট। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে আমাকে দেখতে পারবেন না। আপনারা দয়া করে বসে পড়ুন, দেখবেন আমি আপনাদের সমান হয়ে আছি।’

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ শতবর্ষপূর্তি স্মারকগ্রন্থ : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১৯৯০, ২৫৩ পৃষ্ঠা

 

আট. মাহযূযা হক:

অসুস্থ হয়ে তিনি নীরবে মেনে নিলেন তাঁর অসুস্থতাকে। চোখের পানি ফেললেন না বা বেশী অসহায় বোধ করলেন না। ঐ দিন রাতের বেলায় দেখলেন তাঁর সেবকরা নীচে শুয়ে আছে- আর তিনি পালং-এ। তিনি জিদ ধরলেন- জড়িয়ে জড়িয়ে বললেন, “আমি তোমাদের সংগে শোব, ওপরে শোব না। তোমরা নীচে শুয়ে আছ, আর আমি ওপরে শোব? তা হতে পারে না। এটা অন্যায়।” তিনি দু’রাত নীচে শুলেন।

ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ : পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবন, মাহযূযা হক, ধানমন্ডি, ঢাকা, ১৯৯১, ৫২-৩ পৃষ্ঠা

 

নয়. কাজী মোতাহার হোসেন:

একদিন রমেশবাবুর ছোট ছেলেটা সকাল থেকেই কাঁদা শুরু করেছে—কোলে-কাঁখে করে নিয়ে ঘুরে বেড়ালেও কান্না থামে না। তখন রাগ করে রমেশবাবুর স্ত্রী দরজার চৌকাঠের উপরকার একটা প্রশস্ত তাকের উপর ছেলেকে বসিয়ে রেখে চলে গেলেন। ছেলেটা কিন্তু কাঁদছেই। সময়টা ছিল বর্ষাকাল, ঝমঝম বৃষ্টি, রাস্তার উপর হাঁটু পানি জমে গেছে। ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চুপ করে গেল, আর চেঁচিয়ে বলে উঠল— “মা! মা! দেখ কেমন করে একটা ছাতা রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে?” মা তাকিয়ে দেখলেন, সত্যিই ত মানুষ দেখা যাচ্ছে না, শুধু ছাতাই ত দেখা যাচ্ছে! যাহোক ছাতাই আস্তে আস্তে হাঁটতে হাঁটতে রমেশবাবুর বারান্দায় উঠে আসলো; তখন দেখা গেল এর নীচে, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্! অতঃপর কথোপকথনম শোনা গেল :

প্রঃ “ড, শহীদুল্লাহ্! তুমি এ অবস্থায় এখানে?”

উঃ “তোমার ভাগনে প্রবোধ-এর সঙ্গে কথা ছিল সকাল ৮টায় এসে একটা বিষয় আলোচনা করব।”

প্রঃ “তা, এই বৃষ্টির মধ্যে কেন? দুপুরে আসলেই পারতে?”

উঃ “তা কেমন করে হয়? আমি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তা পালন না করে কি গোনাহগার হব? তা আমি কিছুতেই পারিনে।”

স্মৃতিকথা : কাজী মোতাহার হোসেন, নবযুগ, ২০১৩, ৬২ পৃষ্ঠা

 

দশ. আবদুস সাত্তার:

সবিনয়ে বলছি, আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ যে আকৃতিতে একটু খাটো ছিলেন এটা সবারই জানা। এ নিয়ে নিজেও বন্ধু মহলে রসিকতা করতেন বলে আমরা জানি। একবার তিনি বিদেশে গিয়ে পাণ্ডিত্যের শাণিত যুক্তিতে সবাইকে অবাক করে দিলেন। তারা অবাক হলেও আস্তে আস্তে করে কানাকানি করেছিলেন এই বলে, ‘হি ইজ এ ট্যালেন্ট বাট টু-ও স্মল।’

ডক্টর সাহেবও সঙ্গে সঙ্গে বলে দিয়েছিলেন, ‘ডায়মণ্ড ইজ অলঅয়েজ স্মল।’

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ শতবর্ষপূর্তি স্মারকগ্রন্থ : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১৯৯০, ২৫৪ পৃষ্ঠা

 

মতামত
লোডিং...