কায়েদ-ই-আ’যমের জীবনে ইকবালের প্রভাব : ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্

 

(নোট: এই লেখাটা ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’র ইকবাল (১৯৪৫) কিতাব থাইকা নেওয়া হইছে। আমরা সরাসরি কিতাব থাইকা না নিয়া বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত শহীদুল্লাহ্-রচনাবলী (১৯৯৪) প্রথম খণ্ডের ১০৪-৯ পৃষ্ঠা থাইকা নকল করলাম।)

 

ইকবালের জীবনের শেষ ভাগে পৃথিবীর ও ভারতবর্ষের রাজনীতি ক্ষেত্রে অনেক কিছু গুরুতর ঘটনা ঘটে। পৃথিবীর প্রথম মহাসমর, ভার্সাই সন্ধি, ভারতবর্ষে রাউলাট এক্ট, জালিওআনওআলাবাগের হত্যাকাণ্ড, খিলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, তুর্কিতে জীবনের সাধারণতন্ত্র স্থাপন ও খিলাফতের বিলোপ সাধন। এইগুলি পৃথিবীর ইতিহাসে চিরদিন স্মরণীয় থাকিবে। ইকবাল কোনও আন্দোলনে আন্দোলিত হন নাই। তিনি ভীষণ ঝড় ঝঞ্চাবাতের মধ্যে হিমালয় গিরির ন্যায় অটল অচল থাকিয়া নিজের ধ্যানেই মগ্ন রহিলেন। রাজনৈতিক চেতনা তাঁহার তীব্র ছিল। রাজনীতিতে তিনি এক প্রকার বিপ্লবীই ছিলেন। কিন্তু তিনি সমসাময়িক রাজনীতিতে কোনও প্রধান অংশ গ্রহণ করেন নাই। এবিষয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথের সহিত তুলনীয়। রাজনৈতিক নেতা হইবার আকাঙ্ক্ষা ইকবালের কোনও কালেই ছিল না। তবু তাহার বন্ধুবান্ধবদিগের নির্বন্ধাতিশয্যে তিনি ১৯২৬ সালে পাঞ্জাবের লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য পদপ্রার্থী হন। তাহাতে অনায়াসে কৃতকার্য হইয়া তিনি স্বীয় প্রদেশের রাজনীতিতে যোগদান করিয়া কয়েক বৎসর সুনামের সহিত মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গীতে দেশের সমস্যা ও সমাধান সম্পর্কে ব্যাপকভাবে সুচিন্তিত অভিমত ব্যক্ত করেন। এই সদস্যরূপে কাউন্সিলের অধিবেশনে তিনি কৃষক ও মজুরদের সমস্যা, রাজস্ব ও আয়কর ইত্যাদি বিষয়ে কয়েকটি মূল্যবান মতামত প্রকাশ করেন। কিন্তু তিনি এই দিল্লীকা লাড়ুর মজা একবার চাখিয়া পুনরায় চাখিতে রাজি হইলেন না। তিনি বন্ধুবান্ধব ও শুভানুধ্যায়িগণকে পরিস্কার বলিয়া দিয়াছিলেন- “লোকে নিজের কোনও না কোনও স্বার্থ সিদ্ধির জন্য কাউন্সিলে যায়, আমার তো নিজের কোনও স্বার্থ নাই।”

 

অবশ্য ইহা সত্ত্বেও তিনি নিষ্ক্রিয় ছিলেন না। ১৯২৭ সালে তিনি Simon Commission-এর সমক্ষে সাক্ষ্যদান করেন। ইহা উল্লেখযোগ্য যে এই সময় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ এই কমিশন ‘বয়কট’ করিয়াছিল। তিনি ১৯২৮ সালের শেষ ভাগে নিমন্ত্রিত হইয়া দাক্ষিণাত্য ভ্রমণে বহির্গত হন। এই সময়ে তিনি মাদ্রাজ, বাঙ্গালোর, মহিসুর, হায়দরাবাদ, সেরিঙ্গাপটম এবং পরে আলীগড়ে কতকগুলি বক্তৃতা প্রদান করেন। এই সব সভায় হিন্দু মুসলিম সকল সম্প্রদায়ের শ্রোতা ভিড় করিত এবং আঞ্চলিক পত্রপত্রিকাগুলিতে তাঁহার বক্তৃতার পূর্ণ বিবরণ প্রকাশিত হইত। মাদ্রাজ মুসলিম এসোসিয়েশনের উদ্যোগে তিনি যে সাতটি বক্তৃতা দেন, সেইগুলি পরে Reconstruction of Religious Thought in Islam নামে Oxford University Press হইতে প্রকাশিত হয়। এই বক্তৃতাগুলির বিষয়বস্তু ছিল :

১. Knowledge and Religious Experience ;

২. The Philosophical Tests of the Revelations of Religious

Experience ;

৩. The Conception of God and the Meaning of Prayer ;

  1. The Human Ego, His Freedom and Immortality ;

৫. The Spirit of Muslim Culture ;

৬. The Principle of Movement in the structure of Islam ;

৭. Is Religion possible?

 

তিনি ১৯৩০ সালের ২৯শে ডিসেম্বর অল ইণ্ডিয়া মুসলিম লীগের এলাহাবাদ অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন। এই অভিভাষণে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তিনি বলিয়াছেন – “To base a constitution on the conception of a homogeneous India, or to apply to India the principles dictated by British democratic sentiments, unwittingly to prepare her for a civil War.”

– “এক অখণ্ড ভারত এই ধারণার বশবর্তী হইয়া কোনও শাসনতন্ত্র রচনা করিলে বা বৃটিশ গণতন্ত্রবাদের বশবর্তী হইয়া ভারতবর্ষের জন্য তাহার নীতি প্রয়োগ করিলে, তাহাকে অজানত গৃহযুদ্ধে ঠেলিয়া দেওয়ার সামিল হইবে।”

তিনি তাঁহার ভাষণে আরও বলেন –

“I would like to see the Punjab, North-West Frontier province. Sind and Baluchistan amalgamated into a single state. Self-government within the British Empire or without the British Empire, the formation of a consolidated North-West Indian Muslim State, appears to me to be the final destiny of the Muslim, at least of North-West India.”

– “আমি দেখিতে চাই পাঞ্জাব, উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান সম্মিলিত হইয়া যেন এক রাষ্ট্র গঠিত হয়। ভারত সাম্রাজ্যের ভিতরে বা বাহিরে স্বায়ত্ত শাসিত একটি সম্মিলিত উত্তর পশ্চিম ভারতীয় মুসলিম রাষ্ট্র সংগঠন আমার কাছে মুসলমানদের শেষ ভাগ্য বলিয়া মনে হয়, অন্ততঃ পক্ষে উত্তর পশ্চিম ভারতবাসীদের জন্য।”

 

ইহা লক্ষ্য করিবার বিষয় যে তিনি ঐ অভিভাষণে পাকিস্তান পরিকল্পনার আভাস দান করেন। তাহার পূর্বে অবশ্য ১৯২৫ সালে পাঞ্জাবের ‘বীরকেশরী নেতা’ ও ভারতীয় কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি ও নিখিল ভারত হিন্দু মহাসভার প্রথম সভাপতি লালা লাজপত রায় এইরূপ মুসলিম স্বায়ত্ত শাসিত রাষ্ট্রের প্রস্তাব করিয়াছিলেন। কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চৌধুরী রহমত আলী ও আরও কয়েকজন ভারতীয় ছাত্রের এইরূপ মত ছিল। কিন্তু জাতীয়তাবাদী কোনও সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দই ইহার গুরুত্ব তখনও উপলব্ধি করেন নাই। এমন কি ১৯৩৩ সালে Joint Committee on Constitutional Reform-এর এক বিবরণীতে প্রকাশ যে মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দই ইহাকে ছাত্রদের স্বপ্ন (student’s dream), উদ্ভট ও অবাস্তব (chimerical and Impracticable) বলিয়া মন্তব্য করিয়াছিলেন। জনাব চৌধুরী খালিকূয্যমান পাকিস্তান আন্দোলনের উপর তাঁহার মূল্যবান্ Pathway to Pakistan পুস্তকে বলিয়াছেন যে ইকবালের এই ভাষণ তাঁহার সমসময়ে কোন প্রতিক্রিয়ারই সৃষ্টি করে নাই; এমন কি সম্মেলনের বিবরণীতেও লিপিবদ্ধ বা কোন প্রস্তাব আকারে গ্রহীত হয় নাই।

 

এই প্রসঙ্গে ইহা উল্লেখযোগ্য যে, কায়েদে-ই-আযমের প্রখ্যাত জীবনী লেখক মিঃ হেক্টর বলিথো পাকিস্তান সরকার ও নেতৃবৃন্দের সহিত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে লিখিত Jinnah, Creator of Pakistan পুস্তকে বলিয়াছেন –

“Jinnah met Sir Muhammad Iqbal many times in Lodon and they were good friends. But despite his disillusionment Jinnah did not yield to Iqbal’s arguments. Almost a decade was to pass before he admitted that he had ‘finally been led to Iqbal’s conclusions, as a result of careful examinations and study of the constitutional problems facing India.”

– “জিন্নাহ্ স্যর মুহম্মদ ইকবালের সহিত বহুবার লণ্ডনে দেখা করিয়াছিলেন এবং তাঁহাদের মধ্যে ভাল বন্ধুত্ব ছিল। তাঁহার ভুল ভাঙ্গিলেও জিন্নাহ্ ইকবালের যুক্তির নিকট নতি স্বীকার করেন নাই। প্রায় এক যুগ গত হওয়ার পর তিনি স্বীকার করিলেন যে ‘ভারত যে শাসনতান্ত্রিক সমস্যাসমূহের সম্মুখীন হইতেছে তাহা ভালভাবে বিচার বিশ্লেষণপূর্বক, ইকবালের সিদ্ধান্তেই তাহাকে পৌঁছিতে হইল’।”

 

হেক্টর বলিথো আরও বলেন যে, জিন্নাহ্ সাহেব যখন পুনরায় ভারতীয় মুসলিমের স্বাধীনতা, আন্দোলনের পুরধারূপে লণ্ডন হইতে ফিরিয়া আসেন, তখন তাঁহার বোম্বাইর বাসভবনের দেরাজে ইকবালের লেখা এক তাড়া চিঠি জমিয়াছিল। তিনি এইগুলির একটি (মে ২৮, ১৯৩৭) উদ্ধৃতি দিয়া বলিতেছেন –

“Iqbal had recorded his belief that, to make it, possible for Muslim India to solve her problems, it would he necessary to redistribute the country and to provide one or more Muslim states with absolute majorities. And he had asked, “Don’t you think that the time for such a demand has already arrived?”

– ইকবাল তাঁহার বিশ্বাস লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন, “মুসলিম ভারতের সমস্যা সমাধানকল্পে দেশের বিলি বণ্টনের দ্বারা সংখ্যা গরিষ্ঠ অঞ্চলে এক বা একাধিক মুসলিম রাষ্ট্রের প্রয়োজন রহিয়াছে।” তিনি আরও লিখিয়াছিলেন- “তুমি কি মনে কর না এমন একটা দাবীর সময় ইতঃপূর্বে আসিয়া গিয়াছে?”

 

এই সব চিঠির তিনি কি জবাব দিয়াছিলেন, তাহার উল্লেখ নাই। তবে উপরের চিঠি পাওয়াতে জিন্নাহ সাহেবের মনের প্রতিক্রিয়া তাঁহার অক্টোবর ১৫, ১৯৩৭, লক্ষ্ণৌর বক্তৃতায় পাওয়া যায়। তিনি বলেন – “the majority community have clearly shown their hand that Hindustan is for the Hindus.”

“সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় তাহাদের কার্যকলাপে ইহাই পরিষ্কাররূপে বুঝাইয়াছে যে হিন্দুস্তান শুধু হিন্দুদেরই।”

 

তাঁহার এই বক্তৃতায় তিনি আরও বলেন যে, কংগ্রেস দলের নীতি, ‘শ্রেণী বিদ্বেষ’ ও ‘সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ’ ত্বরান্বিত করিতেছে। তখন মহাত্মা গান্ধী বিচলিত হইয়া জিন্নাহ্ সাহেবকে জানান যে, – “As I read it, the whole of your speech is a declaration of war, This … … is written in all good faith and out of an anguished heart.”

“আমি যখন পড়িলাম, তখন আপনার সম্পূর্ণ বক্তৃতাটাই যেন যুদ্ধের ঘোষণা বলিয়া মনে হইল।… সদিচ্ছা সহকারে কিন্তু ব্যথিত হৃদয়ে ইহা লিখিতে হইল।”

 

ইহার পর শুরু হয় গান্ধী-জিন্নাহ্ এবং জওহরলাল-জিন্নাহ্ পত্রাবলী। মৃত্যুর পূর্বে জিন্নাহ্ সাহেবকে ইকবাল তাঁর শেষ চিঠিতে মুসলিম লীগের ভূমিকা সম্পর্কে লিখেন – “I believe that a political organisation which gives on promise of improving the lot of the average Muslim cannot attract the masses.”

“আমি মনে করি, যে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সাধারণ মুসলমানদের ভাগ্যের উন্নতির কোনও সম্ভাবনা দেখাইতে পারে না, তাহা জনসাধারণকে আকৃষ্ট করিতে পারে না।”

 

এই পত্রের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বলিথো মন্তব্য করিয়াছেন –

“At last, Jinnah learned the difference between aloof, academic leadership, and popularity with a multitude. In the month that Iqbal died, Jinnah was able to say, … The League has been growing stronger and stronger every day. Before the Lucknow Session, the membership ran into several thousands, but to-day there are hundreds of thousands of Mussalmans who are under the banner of the League.

– “অবশেষে দূরত্ব রাখিয়া পুঁথিগত নেতৃত্ব এবং অগণিত লোকের জনপ্রিয়তার পার্থক্য সম্বন্ধে জিন্নাহ্ অবহিত হইলেন। যে মাসে ইকবাল দেহত্যাগ করিলেন, সেই সময়তেই জিন্নাহ বলিলেন, ‘লীগ দিন দিন শক্তিশালী হইতেছে, লক্ষৌ সম্মেলনের পূর্বে সদস্য সংখ্যা কয়েক হাজার মাত্র ছিল, কিন্তু এখন লক্ষ লক্ষ মুসলমান লীগের পতাকা তলে।”

 

ইকবালের মৃত্যুতে তাই ব্যথাভারাক্রান্ত মনে জিন্নাহ্ সাহেব বলিয়াছিলেন –

“To me he was a friend, guide and philoshopher and during the darkest moments through which the Muslim League had to go, he stood like a rock and never flinched one single moment.”

“আমার জন্য তিনি ছিলেন বন্ধু, পথপ্রদর্শক এবং দার্শনিক, এবং যখন মুসলিম লীগের ঘোর দুর্দিন, অটল পাহাড়ের ন্যায় এক মুহূর্তও বিচলিত না হইয়া তিনি ছিলেন তখন অনড়।”

 

১. Hector Bolitho-Jinnah, Creator of Pakistan PP. 99, 114, 115, 118

 

মতামত
লোডিং...