ম্মৃতিবিলাস (ত্রয়োদশ পর্ব) || জিনাতুননেছা জিনাত || ধারাবাহিক স্মৃতিগদ্য

 

বিশ্বাসঘাতক সহপাঠী সারাজীবনেও ভালো বন্ধু হতে পারে না, প্রেমিক তো নয়ই।

প্রায় তিরিশ বছর আগের কথা। কলেজে পা রেখেছি সবে। যদিও আমি কম্বাইন্ড স্কুলে পড়েছি তবুও কলেজে নানান স্কুল থেকে আসা ছেলেমেয়েদের দেখলে একটু জড়তাই লাগতো। বিজ্ঞান বিভাগে পড়তাম। নিয়মিত ক্লাস শেষে ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য অনেকটা সময় কলেজেই পার হয়ে যেত। হাতে-কলমে কাজ করতে গিয়ে অনেকেই বেশ কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছিল। তবে ভালোবাসার কথা তখনও মাথায় আসেনি। বড়জোর ভালোলাগা।

 

গোলাম রসুল স্যার ইংরেজি সাহিত্য পড়াতেন, Alice in Wonderland, The gift of the Magi… গল্পগুলো খুব সুন্দর করে বোঝাতেন! অতিআবেগী কেউ কেউ আবার এসব গল্প শুনে বিজ্ঞান ভবনের নিচতলায় আমাদের ক্লাসরুমের দেয়ালে লিখে রাখতো, “Alice, I love you.”

 

একদিন শামস্ নামের একজন সহপাঠী এসে বললো, ‘জানো, এটা কাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছে?’
‘কি আশ্চর্য! কিভাবে জানবো?’, আমি এ ধরণের কথা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করি।
বেচারা তবুও ইনিয়ে বিনিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে, কেউ একজন আমাকে উদ্দেশ্য করেই নাকি লিখেছে কথাটা।

 

সম্ভবত ১৯৮৯ সালের কথা। আমি নবম শ্রেণিতে পড়ি তখন। জীবনে প্রথম ভালোবাসা নিবেদন করেছিল এক সহপাঠী, নাম অনন্ত। একই শ্রেণির হলেও একই বিদ্যালয়ের নয়। আমার এক কাজিনের সাথে বাসায় এসেছিল বেড়াতে। অল্প সময়ের পরিচয়, সংক্ষিপ্ত কথাবার্তার মধ্য দিয়েই বন্ধুত্বের সূচনা হয়েছিল।

তখন আমাদের বাসায় ল্যান্ডফোনও ছিল না। একই শহরে বাসা হলেও সরাসরি যোগাযোগের কোন পথ ছিল না। অনন্ত প্রায়ই আমাকে নতুন নতুন ভিউকার্ডের পেছনে অনেক কথা লিখে পাঠাতে শুরু করলো (বেশিরভাগ কার্ড ছিল তখনকার জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমা ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’র)। মাঝেমাঝে ওয়েস্টার্ণ সিরিজের বই উপহার দিত, নিজে না এসে একে ওকে দিয়ে পাঠাতো। একটু একটু ভালোলাগাও তৈরী হয়েছিল মনে। তবে নিয়মিত দেখা হওয়ার বা কথা বলার তেমন কোন সুযোগ ছিল না। সাহসও ছিল না। উপরন্তু উপহারগুলো কোথায় রাখবো সেই দুঃশ্চিন্তায় থাকতে হতো সারাক্ষণ। পিঠাপিঠি ভাই-বোন একই রুমে পড়াশোনা করতাম। একই সাথে খাওয়া, ঘুম, স্কুলে যাওয়া… সবকিছু। সবদিক মিলিয়ে পরিবারের বেশ চাপ ছিল।

 

আমার আর এক সহপাঠী একদিন জানালো, অনন্ত তাকে আমার সম্পর্কে বলেছে, ‘ভালো ছাত্রী, তাই কিছুদিন মিশেছি ওর সাথে। এরচেয়ে বেশি কিছু নয়।’ কথাটা জানার পর খুব খারাপ লেগেছিল! এত এত শব্দ সে লিখেছিল আমার জন্য, সবই ভনিতা! বন্ধুত্ব বা ভালোলাগা পাকাপোক্ত হবার আগেই অনন্ত আমাকে না বলে একদিন শহর ছেড়ে চলে গেল! লাভের মধ্যে লাভ হলো, মানুষের প্রতি চরম অবিশ্বাস জন্মাতে শুরু হলো মনে। অভিমানের এক অনন্ত আকাশ আমাকে গ্রাস করে রেখেছিল বেশ কিছুদিন।

 

অনন্তকে আমি একেবারেই মন থেকে মুছে ফেলেছিলাম। কারণ দিনশেষে না সে আমার বন্ধু হতে পেরেছিল, না স্বজন। না হলো ভালোবাসার মানুষ! মিথ্যে প্রতিশ্রুতি রেখে পালিয়ে যাওয়া সেই কিশোরকে অবশ্য মনে রাখার মতো কোন কারণও ছিল না। যে আমাকে ভুলে গেছে, আমি তাকে মনে রাখি কোন অধিকারে?

সময়ের বিপরীত স্রোতে ভেসে ভেসে আমরা কেবলই দূরে সরে গেছি। কখন যে দিন মাস করে পার হয়ে গেছে ৩২টি বছর, খেয়ালই হয়নি। বছর তিনেক আগে ভার্চুয়াল জগতে অনন্ত’র খুব কাছের এক বন্ধুর খোঁজ পেয়েছিলাম যদিও, তবে অভিমান উতরে কখনও জানতে চাওয়া হয়নি, কেমন আছে সে? সে ইচ্ছেও হয়নি একটিবারও।

 

কলেজে কাজের প্রয়োজনে স্যার-মেডাম অনেক গ্রুপে যুক্ত করে দিতেন। সেভাবে অনেকের সাথেই মিশেছি, স্রেফ সহপাঠী হিসাবে। শামস্ বিভিন্নভাবে আমাকে বোঝাতে চাইতো, কেউ একজন অ্যালিস নামে আমাকেই বিভিন্ন কথা বোঝাতে চায়, দেয়ালে লিখে রাখে নানান কথা। অনেক বছর বাদে জেনেছিলাম, শামস্ নিজেই আমাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো লিখে রাখতো।
বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনার যেমন চাপ ছিল, তেমনি ব্যবহারিক ক্লাসের। ফলে আশেপাশে চোখ মেলে দেখার তেমন সুযোগও ছিল না।

এইচএসসি’র ফলাফল প্রকাশ হবে। তীব্র উৎকন্ঠা! দিনশেষে হাতে পেলাম যে ফল, সেটা কাঙ্খ্ষিত নয়। দ্বিতীয় বিভাগ। সারাদিন বিছানায় শুয়ে কান্নাকাটি করি, ঘর থেকে বের হই না। এসএসসি’র ফলাফলে যেখানে স্কলারশিপ পেলাম, সেখানে দু’বছর যেতে না যেতে এমন অবস্থা! লজ্জায়, দুঃখে আব্বাকে মুখ দেখাতে ইচ্ছে করে না।

বাবা-মা বুঝি সব পারেন। একটিবারও উনারা আফসোস করলেন না। অদ্ভুতভাবে নিজেদের কষ্টটাকে লুকিয়ে রাখলেন। আমার সাথেও রাগারাগি বা কটু কথা, কিছুই করলেন না। বরং আব্বা এক প্যাকেট মিষ্টি কিনে এনে বললেন, সবাই এসো, মিষ্টি খাই। ছোট মা আর এক ধাপ পার হয়েছে, সেজন্য মিষ্টিমুখ করে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাই।

সময়ের সাথেসাথে গভীর ক্ষতটাও মিলিয়ে যায়। আমিও অভ্যস্ত হতে থাকি আগামীর সাথে। একদিন বিকেলে শামস্ আমাদের গেটের সামনে এসে ছোট ভাইকে দিয়ে ডেকে পাঠালো। আমাকে দেখে মাথা নিচু করে বললো-

 

‘আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি।’
‘মানে? কিসের জন্য ক্ষমা?’
‘আসলে আমি একটা অন্যায় করে ফেলেছি। বিরাট অন্যায়। তুমি ক্ষমা না করলে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছি না।’
‘এত ভনিতা না করে বিষয়টা বলে ফেললেই তো হয়। এমনিতে মন-মেজাজ ভালো নেই, যা বলার তাড়াতাড়ি বলে চলে যাও।’
‘রসায়ন পরীক্ষার দিন তুমি লবনের পরীক্ষণটির ব্যাপারে নিশ্চিত হবার জন্য আমার কাছে জানতে চেয়েছিলে। মনে আছে?’

কাছাকাছি গ্রুপগুলোর মধ্যে শামস্ এই পরীক্ষণটি ভালো করে এবং দ্রুত করতে পারতো। পরীক্ষার দিন অনেকেই ওর কাছে জিজ্ঞেস করছিলো। মনে পড়লো, আমিও জানতে চেয়েছিলাম। বললাম- ‘হ্যাঁ, মনে আছে।’
‘আমি তোমাকে ভুল লবনের নাম বলেছিলাম।’

কিছুক্ষনের জন্য আমি এমনই হতভম্ব হয়ে গেলাম যে, শামস কে কি বলবো না বলবো বুঝতে পারছি না। নিজের অসন্তোষটুকু অনেক কষ্টে চেপে রেখে বললাম, ‘কিন্তু কেন? এত বড় ক্ষতি করার মতো কোন অন্যায় আমি কি তোমার সাথে করেছি কোনদিন?’
‘না।’
‘তাহলে?’
‘আমার কয়েকটা পরীক্ষা খুব খারাপ হয়েছিল। ভেবেছিলাম, নির্ঘাত ফেল করবো। কিন্তু তুমি পাশ করে গেলে তো অন্য কোথাও চলে যাবে। তাই…’
‘তাই আমাকেও ফেল করাতে চেয়েছিলে? কি আশ্চর্য! এত খারাপ চিন্তা কিভাবে তোমার মাথায় এলো? আমি ভাবতেও পারছি না। তুমি যাও, এখন আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।’

 

মার্কশীট হাতে পাবার পর দেখলাম, রসায়ন ব্যবহারিক পরীক্ষায় যেখানে অনেকে ২৪ বা ২৫ পেয়েছে, সেখানে আমি পেয়েছি মাত্র ৮ নম্বর। স্যার দয়া করে পাশ নম্বর দিয়েছেন। অথচ ওখানে পুরো নম্বর পেলে আমিও প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হতে পারতাম!

সবই কপাল! সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম, মানুষকে ক্ষমা করে দেবার এক অসাধারণ ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা আমাকে দিয়েছেন। শামস্-কে থানা-পুলিশ বা জেল জরিমানা করলেও আমি যে আর কাঙ্খ্ষিত রেজাল্ট ফিরে পাব না! তাছাড়া এই কথা আমি কাকে বলবো? কীভাবে বিশ্বাস করাবো? করিয়েই বা কি লাভ? বিশ্বাস করে একজন বন্ধুর কাছে সাহায্য চেয়েছিলাম। বিনিময়ে সে আমার বিশ্বাস নষ্ট করেছে! সে নিজেই তার দোষ স্বীকার করেছে। পৃথিবীর কোন আদালতে সেটা আর প্রমাণিত হবার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়নি সেদিন। অনেক ভেবে ধীরেধীরে নিজেকে নিজের দুঃসময়ের সাথে মানিয়ে নিলাম। পৃথিবীর আর কেউ সেদিন জানতেও পারেনি, সেই বিশ্বাসঘাতকতার কথা।

 

কাউকে ক্ষমা করে দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, তার বিশ্বাসঘাতকতা ভুলে গেছি! তবু সেই মানুষগুলো ভুলে গেছি মনে করে আবারও বিশ্বাসঘাতকতা করার চেষ্টা করে, দশ-বিশ-ত্রিশ বছর পরে হলেও। ভিন্ন পরিবেশে, ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে নয়ত ভিন্ন চরিত্রে।

 

পরবর্তী সময়ে আমি বাসার কাছে একটা কোচিং সেন্টারে পড়াতাম। প্রথমে জানতাম না, শামস্ও সেখানে কোচিং করায়। যাই হোক, অল্প কিছুদিন সেখানে ছিলাম, এর মধ্যে কয়েকজন সহপাঠী আমাকে সাবধান করেছিল, শামস’র কোন কথায় বা কাজে যেন না জড়াই। ভেতরে ভেতরে সে নতুন ফন্দি করছে। কিছুদিন পর খুলনায় পড়াশোনার জন্য চলে যাওয়ার ফলে জীবনের এক অদ্ভুত সময়ের হাত থেকে রেহাই পেয়ে যাই।

 

পৃথিবীটা প্রায় গোলাকার। তাইতো সেখানে বিচরণশীল সময়গুলো ঘুরে ফিরে বারবার আসে জীবনে। কখনও বাস্তবে ধরা দেয়, কখনও স্মৃতির সাদাকালো ক্যানভাসে ভেসে ওঠে।

 

অনন্তকে আমি আর কোনদিন খুঁজিনি। এমনকি তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে এসে স্কুল-কলেজের অনেক সহপাঠীকে খুঁজে পেলেও ওকে পাইনি। খোঁজ পেতেও চাইনি। অথচ কি অদ্ভুতভাবে সময় তার অনন্তযাত্রার খবরটা ঠিক পৌঁছে দিয়েছিল আমার কাছে। হ্যাঁ, আমি কেঁদেছি। ভীষণ কষ্ট লেগেছে। ৩২ বছর ধরে জমানো অভিমানের শক্ত দেয়ালটা অদ্ভুতভাবে বরফের মতো গলতে শুরু করেছে। এই জীবনে সে অভিমান পুষে রাখার আর প্রয়োজনও নেই। এতগুলো বছর পর আমি বুঝতে পেরেছি, সব ক্ষত শুকায় না। সব দাগ মিলিয়ে যায় না। কিছু কষ্ট মলিনও হয় না কোনদিন। আমার অবচেতন মনের কোথাও হয়ত সে ছিলই। তাইতো তার মৃত্যুর খবর জানার পর অভিমানগুলো নিজেই প্রার্থনায় রূপ নিয়েছিল।

শামসের খবর অবশ্য বাড়ি গেলে মাঝেমাঝে পেতাম। যদিও মনে রাখার মতো কিছুই ছিল না। কেউ কেউ বলে, এখনও সে বানিয়ে বানিয়ে গল্প করে বেড়ায়। নিজের জীবনে, সংসারে নিজেই জটিলতা সৃষ্টি করে। নিজের দুর্ভোগ নিজেই ডেকে আনে।

 

জানিনা, এখনকার সময়ে মেয়েরা কেমন অবস্থার মধ্য দিয়ে বড় হচ্ছে। তবে ৯০ এর দশকে প্রতিবেশি বা কাজিনদের মধ্যে সুযোগ পেলেই ইনিয়ে বিনিয়ে ভালোবাসার কথা বলার একটা অদ্ভুত প্রবণতা ছিল। বিয়েও হতো আত্মীয়দের মধ্যে, যেটা আমার কাছে সবসময় অপছন্দের তালিকায় ছিল। ঘটনাবহুল ঐ সময়ে ভালোবাসা নামক অদ্ভুত আকাঙ্খ্ষিত বিষয়টি এসেছিল আমার জীবনে। তবে অন্যভাবে, অন্য নামে, অন্য কোন খামে…!

 

(চলবে)

মতামত
লোডিং...