সুকুমার সেনের ‘ইসলামি বাংলা সাহিত্য’ এবং সাহিত্যবিশারদের অভিযোগ ; আলোচনা প্রত্যালোচনা || সাহিত্য সওগাত

 

‘ইসলামী বাংলা সাহিত্যে’ আলাওলের কথা

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ

 

ডক্টর শ্রীযুক্ত সুকুমার সেনের নাম বাংলা সাহিত্যে বিশেষতঃ ঐতিহাসিক সাহিত্যে সুপরিচিত। বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে ইতিহাস লিখিয়া তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জ্জন করিয়াছেন। তাঁহার পাণ্ডিত্য ও বিদ্যাবত্তা নিঃসন্দেহে অতি উচ্চদরের। তিনি অকুতোভয়,-সত্য মিথ্যা যাহাই লিখুন, তজ্জন্য কাহারও কোন পরোয়া করেন না। তাঁহার বিদ্যার এমনই জোর যে, সমালোচকের ভ্রুকুটিকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ট প্ৰদৰ্শন করিয়া তাঁহার কলম সমান বেগেই চলিতে থাকে। যাঁহাদের ধর্ম্মে সত্যকে বসুমতীর সহিত ওজনে বেশী ভারী করা হইয়াছে, সেই সত্যের প্রতি তাঁহার কণামাত্র শ্রদ্ধা নাই। পাঠকগণ আমার এরূপ প্রত্যেক কথার প্রমাণ পাইবেন তাঁহার বঙ্গভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এবং তাঁহার সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ইসলামী বাঙ্গলা সাহিত্য’ নামক গ্রন্থে। দৃষ্টান্ত দিয়া বলিতে গেলে প্রবন্ধ-কলেবর অত্যন্ত বড় হইবে। তাই আজ কেবল শেষোক্ত গ্রন্থ সম্বন্ধেই কয়েকটি কথা বলিব।

 

পাকিস্তানের কোন পত্রিকা দেখা সুকুমার বাবুর পক্ষে সম্ভব না হইতে পারে মনে করিয়া এই প্রবন্ধধৃত বিষয়টি কলিকাতার ‘শনিবারের চিঠি’তে প্রকাশিত করিয়া তাঁহার নিকট তাঁহার ঐরূপ লেখার প্রমাণ জানিতে চাহিয়াছিলাম। পাঠকগণ দেখিবেন তাঁহার প্রমাণ দেওয়ার কোন উপায়ই নাই। তাই কোন কথা না বলিয়া তিনি কাপুরুষের মত মুখ লুকাইয়া আছেন।

 

তিনি গ্রন্থ লিখিয়াছেন ‘মুসলিম বাংলা সাহিত্য’ সম্বন্ধে কিন্তু গ্রন্থের নাম দিয়াছেন ইসলামী বাংলা সাহিত্য। প্রথমতঃ ইসলাম একটি ধর্মের নাম। যারা ইসলাম ধর্ম্ম মানিয়া চলে তাদের বলা হয় ‘মুসলমান’। ইসলামী বাংলা সাহিত্য বলিলে তার অর্থ দাঁড়ায় ইসলাম ধর্ম বিষয়ক সাহিত্য। অবশ্য মুসলমানেরাও অনেক সময় ইসলাম শব্দের অপপ্রয়োগ করে। মুসলমান সম্পর্কিত সবকিছু মুসলিম এবং ঐ ধৰ্ম্ম সম্পৃক্ত সবকিছু ইসলামিক।

 

দ্বিতীয়তঃ মুসলমান রচিত সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্য এবং তাহা বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাসে অবশ্য আলোচ্য বিষয় এবং অপরিহার্য্য অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তজ্জন্য পৃথক নামে গ্রন্থ রচনায় স্বভাবতঃই মনে হয়, – চণ্ডালোশ্বপচানান্তু বহির্গ্রামাৎ প্রতিশ্রয় ইত্যাদি নীতিই যেন প্রয়োগ করা হইয়াছে। ইহাতে ডাক্তার সুকুমার সেনের মনোভাবের প্রতি মুসলমানের মনে অশ্রদ্ধার ভাব জন্মিবার যথেষ্ট কারণ থাকিলেও তৎপ্রতি ভ্রুক্ষেপ করিবার লোক তিনি নহেন। এমনই নির্ভীক তিনি।

 

আলোচনা-যোগ্য বহু মুসলমান কবি থাকা সত্ত্বেও তিনি মাত্র কয়েকজনের কথা আলোচনা করিয়াছেন। এসব আলোচনায় তিনি মুসলমানদিগকে যুগপৎ পিঠ থাবড়ানি ও কানমলা দিয়া ক্ষান্ত হইয়াছেন। ন্যায়সঙ্গত যুক্তিতর্ক অগ্রাহ্য করিয়া তিনি অনেক কবির আবির্ভাবকাল সম্বন্ধেও তাঁহার অযৌক্তিক মত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করিয়াছেন। তাঁহার গ্রন্থের এতদধিক সমালোচনা আজ আমার উদ্দেশ্য নহে।

 

পাঠকগণকে একথা বলিয়া দেওয়া বোধহয় অনাবশ্যক যে, সত্যের সন্ধান ও উদ্ধারই ঐতিহাসিকের সর্বশ্রেষ্ঠ ও একমাত্র ভুষণ। সুকুমারবাবু সেরূপ একজন সত্যসন্ধানী ঐতিহাসিক হইয়া কিভাবে সত্যের মস্তকে পদাঘাত করিয়া সত্য-লেশ-শূন্য কথা প্রচার করিতে সঙ্কোচ বোধ করেন নাই, এ স্থলে আমি তাহারই দুইটি দৃষ্টান্ত পাঠকগণের সম্মুখে উপস্থিত করিতেছি।

 

প্রথম দৃষ্টান্ত-

তদীয় গ্রন্থের ৩০ (কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড কর্তৃক প্রকাশিত সংস্করণের ৩৪ পৃষ্ঠায়) পৃষ্ঠায় লিখিত হইয়াছে, “পুত্রকে (আলাওলকে) হার্মাদরা বন্দী করে রোসাঙ্গে নিয়ে এসে রাজার ফৌজে বিক্রি করলে।” উদ্ধৃত কথাগুলিতে যে সত্যের লেশমাত্র নাই তাহা স্বয়ং আলাওলের উক্তিই সপ্রমাণ করিবে। যথা :

“কাৰ্য্যাগতি যাইতে পন্থে বিধির ঘঠন।

হার্ম্মাদদের নৌকা সঙ্গে হইল দরশন।।

বহু যুদ্ধ আছিল সহিদ হৈল তাত।

রণক্ষতে ভোগ যোগে আইলুম এথাত।।

কহিতে বহুল কথা দুঃখ আপনার।

রোসাঙ্গে আসিয়া হৈলুম রাজ আসোয়ার।।”

(পদ্মাবতী)

‘কাৰ্য্য হেতু পন্থ-ক্রমে আছে কৰ্ম্ম-লেখা।

দুষ্ট হার্ম্মাদ সঙ্গে হই গেল দেখা।।

বহু যুদ্ধ করিয়া সহিদ হৈল বাপ,

রণক্ষতে রোসাঙ্গে আইলুম মহাপাপ।।

পাইলুম সহিদ-পদ আছে আয়ু শেষ।

রাজ আসোয়ার হৈলুম আসি এই দেশ।।

(সেকান্দরনামা)

কাৰ্য্য হেতু পন্থে যাইতে নৌকার গমণে।

দৈবগতি হৈল দেখা হাম্মাদের সনে।।

বহু যুদ্ধ করিয়া সহিদ হৈল পিতা।

রণক্ষতে ভাগ্যবলে আমি আইলুং এথা।।

কতেক আপনা দুঃখ কহিনু প্রকাশি।

রাজ আসওয়ার হৈলুং রোসাঙ্গেত আসি।।

(লোর-চন্দ্রানী)

 

আলাওল তো বলিয়াছেন, হার্ম্মাদের সঙ্গে যুদ্ধে পিতাকে হারাইয়া নিজে রণক্ষত হইয়া তিনি রোসাঙ্গে গমন করেন এবং রাজার আসোয়ার হন। সুকুমারবাবু তল্লিখিত রূপ অদ্ভূত সন্দেশ কোথায় পাইলেন?

 

দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত-

তাঁহার গ্রন্থের ৩১ (কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড কর্তৃক প্রকাশিত সংস্করণের ৩৫ পৃষ্ঠায়) পৃষ্ঠায় তিনি লিখিয়াছেন ‘রাজ্যার্ধ ভাগিনী ভগিনীর পালিতপুত্র রাজকুমার মাগন ঠাকুরের অনুরোধে’ * * *।

সুকুমারবাবু একজন অগাধ-বিদ্যা বিদ্বান ও পণ্ডিত বলিয়া দেশে মশহুর। তিনি আলাওলের গ্রন্থগুলির কখনও পড়িবার অবসর পান নাই। তথাপি আলাওলের কথা লিখিয়া বিদ্যা ও পাণ্ডিত্য জাহির করিবার তাঁহার এত শব্দ কেন, কি জানি। উপরের কথাগুলিতে তাঁহার যে অজ্ঞতা সূচিত হইয়াছে, তাহা অত্যন্ত শোচনীয় ও লজ্জাজনক। যে বিষয়ে যাহার পূর্ণ জ্ঞান নাই, সে বিষয়ে বিদ্যা জাহিরের চেষ্টা করিয়া লোকের উপহাস্যম্পদ হওয়া অপেক্ষা নীরব থাকাই বুদ্ধিমানের কাৰ্য্য।

প্রাগুক্তৃত বাক্যে একটি কথাও সত্য নাই। এখানে প্রকৃত কথা কি; নিম্নে তা বলিতেছি। আলাওল লিখিয়াছেন,-

“ছিলিম শাহার বংশ         যদ্যপি হইল ধ্বংস

নৃপগিরি হইল রাজ্য পাল।

*      *      *      *

এক পুত্র এক কন্যা          সংসারেতে ধন্য ধন্যা

জনমিল নৃপতি সম্ভব।

চলিতে ত্রিদিব স্থান          পুত্রে কৈলা রাজ্য দান

যারে দেখি লজ্জিত বাসব।।

*      *      *      *

ছাদ উমংদার নাম           রূপে গুণে অনুপাম

মহাবুদ্ধি ভাগ্য অতিরেক।”

(পদ্মাবতী)

 

অর্থাৎ আরাকান রাজ সলিম শাহ (Meng Radzaggy) ১৫৯৩-১৬১২ খৃ. অঃ পৰ্য্যন্ত রাজত্ব করিবার পর তৎ-পুত্র Meng-Kha-Moung ১৬১২-১৬২২ খ্রীঃ অব্দ পর্য্যন্ত রাজত্ব করেন। তারপর তৎপুত্র থিরিথু-ধম্মা (Thirithu-Dhamma) ১৬২২-১৬৩৮ খ্রী. অঃ পর্য্যন্ত রাজত্ব করেন। তৎপর তৎপুত্র Meng Tsani (মেঙ্গ সানি) মাত্র ২৮ দিন রাজত্ব করিবার পর এই বংশ বিলুপ্ত হয়। অতঃপর রাজা থা-সা-টার (Thatsa-ta ১৫২৫-৩১ খ্রীঃ অঃ) (প্রপৌত্র নর-বদি-গ্যি) (আলাওলের ‘নৃপগিরি’) রাজা হন। তাঁহার রাজ্যকাল (১৬৩৮-৪৫ খৃঃ অঃ) তারপর তাঁহার পুত্র থা-দো-চিন্তার (আলাওলের ‘ছাদ উমংদার’) রাজপদে অভিষিক্ত হন। (আরাকানের ইতিহাস দ্রষ্টব্য)

 

দেখা যাইতেছে, রাজা নর-বাদি-গ্যির এক পুত্র ও এক কন্যা ছিল। মৃত্যুকালে তিনি পুত্রকে রাজ্য দিয়া যান এবং কন্যাকে রোসাঙ্গের অধিবাসী মাগন ছিদ্দিক বংশজাত এক মহাশয় মোছলমানের হাতে (অভিভাবকত্বে) রাখিয়া যান। পরে সেই কন্যা তাহার ভাই উক্ত পুত্রের সঙ্গে পরিণীতা হইয়া মুখ্য পাটেশ্বরী হন (মঘ রাজাদের মধ্যে সহোদরা ভগ্নীকে বিবাহ করার প্রথা প্রচলিত ছিল)। সুতরাং মাগন সেই কন্যার পালিত পুত্র না হইয়া বরং তাহার অভিভাবক ছিলেন। সেই কন্যা পাটরাণী হইয়া মাগনকে প্রধান অমাত্যপদে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। এ স্থলে আলাওলের লেখা দেখিলেই পাঠকেরা সকল কথা স্পষ্টরূপে বুঝিতে পারিবেন।

“যখনে আছিল বৃদ্ধ নিৰ্প অধিকারী।

যশস্বিনী আজ-গৃহে আছিল কুমারী।।

পরম সুন্দরী কন্যা অতি সুচরিত।

বহু স্নেহে নৃপতি পোষিল নিজ সুতা।।

বহু ধন-রত্ন দিলা বহুল ভাণ্ডার।

বহুল কিঙ্কর দিলা বহু অলংকার।।

কন্যার শৈশব দেখি ভাবে নরনাথ।

এতেক সম্পদ সমর্পিমু কার হাত।।

এক মহাপুরুষ আছিল সেই দেশে।

মহাসত্ত্ব মোছলমান ছিদ্দিকের বংশে।।

নানাগুণ পারগ মহত কুলশীল।

তাহাকে আনিয়া রাজা কন্যা সমর্পিল।।

বৃদ্ধ নরপতি যদি গেল স্বর্গপুরী।

সেই কন্যাবর হইল মুখ্য পাটেশ্বরী।।

শৈশবের পাত্র দেখি বহুস্নেহ ভাবি।

মুখ্য আমাত্য করি রাখিলা মহাদেবী।।

(পদ্মাবতী)

অর্থাৎ বৃদ্ধ নিৰ্প অধিকারী (রাজা নরবদিগ্যি) নিজ শিশু কন্যাকে অতি আদর যত্ন লালনপালন করেন। তাহাকে বহু ধনরত্ন, বহু কিঙ্কর, বহু অলঙ্কার দিয়াছিলেন। এ সব ধনরত্ন আর শিশুকন্যাকে মৃত্যুকালে কাহার হাতে সমর্পণ করিয়া যাইবেন, তজ্জন্য রাজা বড় চিন্তান্বিত ছিলেন। সেই দেশে মাগন নামে ছিদ্দিক বংশ-জাত এক মহা গুণশালী মুসলমান ছিলেন। রাজা তাঁহাকে আনিয়া তাঁহার হস্তে কন্যাকে সমর্পণ করিলেন। রাজার মৃত্যুর পর সেই কন্যা মুখ্য পাটেশ্বরী হইলেন। মুখ্য পাটরাণী হইয়া তিনি মাগনকে প্রধান অমাত্য পদে বরণ করিলেন।

ডক্টর-ঔপাধিক সুকুমার বাবু কেমন সত্য সন্ধানী ঐতিহাসিক ও গবেষণাকারী, পাঠকগণকে দেখাইলাম। আলাওলের ‘পদ্মাবতী’-খানি একটু খুলিয়া দেখিলে তিনি মাগনকে ‘রাজকুমার’ বলিয়া লিখিয়া গবেষণার ও বিজ্ঞতার চূড়ান্ত প্রদর্শন করিতেন না। তিনি বোধহয় আলাওলের ভাষার মর্মও বুঝেন না, তাই মাগনকে ভগিনীর পালিত পুত্র বলিয়াছেন।

বড়ই দুঃখের কথা যে, এত বড় জ্ঞানী ও পণ্ডিত লোক হইয়া তিনি অর্থলোভে এরূপ অমৃতবাদ-কলঙ্কিত গ্রন্থ লিখিয়া লোকের মনে কুসংস্কার সৃষ্টি করিতেছেন—যাহা ইসলামের চক্ষে অত্যন্ত দোষাবহ ও সৰ্ব্বথা বর্জনীয়।

দিলরুবা

মাঘ ১৩৫৯

 

 

দ্বিতীয় সংস্করণের বক্তব্য

সুকুমার সেন

১৯৫১ খ্রীষ্টাব্দে ‘ইসলামি বাংলা সাহিত্য’ প্রকাশিত হবার পরে কোন একটি পত্রিকায় নামটির দোষ ধরা হয়েছিল। তখন জবাব দেবার কোন সুযোগ পাইনি। সুদীর্ঘ বাইশ বছর কাল পরে এখন সে সুযোগ মিলল। যাঁদের রচনা আমার বইটিতে আলোচিত হয়েছে তাঁদেরই কেউ কেউ “এছলামি বাঙ্গালা” নামটি ব্যবহার করেছিলেন। আমি “এছলামি” শব্দটিকে স্বাভাবিক ভাবেই “ইসলামি” করে নিয়েছি। তাতে এমন কী দোষ হয়েছিল তা এখনও বুঝতে পারছি না।

কলিকাতা

১৮ সে ১৯৭৩

 

প্রাসঙ্গিক আলোচনা

সুকুমার সেনের ইসলামি বাংলা সাহিত্য বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সনে, সেই সনের নভেম্বর মাসের ২০ তারিখ ডক্টর পঞ্চানন মণ্ডলকে প্রেরিত এক পত্রে সাহিত্যবিশারদ লিখেছেন, “তিনি আলাওলকে নিয়া যেরূপ ছিনিমিনি খেলিয়াছেন, তজ্জন্য আমি তাঁহার কঠোর সমালোচনা করিয়াছি। এখনও সে সমালোচনা শেষ হয় নাই। কর্ত্তব্যের খাতিরে আমি তাঁহার বদনাম করিতেছি কিন্তু তাঁহার প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা, খদ্যেৎ হইয়া চাঁদের নিন্দা! কি করিব, সত্যের অনুরোধ এড়ান যায় না।”

আবার, ১৯৫২ সনের ১০ সেপ্টেম্বর ডক্টর পঞ্চানন মণ্ডলকে প্রেরিত আরেক পত্রে লিখেছেন, “সুকুমার বাবু হইতে আমার জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর আদায় করিতে পারিলেন না? আমি “শরিবারের চিঠি”তে ঐ প্রশ্ন প্রকাশ করিয়াছি, দেখিয়াছেন কি? তাহার বইটি পাই নাই। আমার মত নগণ্য লোককে বহি দিলে তাঁহার মান থাকে কই?”

 

সুকুমার সেনের প্রতি সাহিত্যবিশারদের ‘অগাধ শ্রদ্ধা’ থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর ‘কঠোর সমালোচনা’ করতে পিছপা হন নাই; কারণ ‘সত্যের অনুরোধ এড়ান যায় না’। আবার প্রায় পৌনে এক বছর পরের পত্রে লিখিত ‘আমার মত নগণ্য লোককে বহি দিলে তাঁহার মান থাকে কই?’ কথা থেকে ডক্টর সেনের প্রতি সাহিত্যবিশারদের অভিমান খুবই পষ্ট। আরও পষ্ট হচ্ছে, সেনের কাছ থেকে প্রশ্নগুলোর উত্তর আদায় করতে সাহিত্যবিশারদের আন্তরিক ইচ্ছা ও চেষ্টা। তা প্রকাশ হয়েছে দুইভাবে: এক. ডক্টর পঞ্চানন মণ্ডল যেহেতু কলকাতায় থাকেন এবং সেখানকার পণ্ডিত সমাজের গণ্যমান্য লোক সেহেতু তাঁকে চিঠির মাধ্যমে অনুরোধ করেছিলেন সুকুমার সেনের কাছ থেকে তাঁর উত্থাপিত প্রশ্নের জবাব আদায় করতে ; দুই. “পাকিস্তানের কোন পত্রিকা দেখা সুকুমার বাবুর পক্ষে সম্ভব না হইতে পারে মনে করিয়া এই প্রবন্ধধৃত বিষয়টি কলিকাতার ‘শনিবারের চিঠি’তে প্রকাশ” করেছিলেন, যা থেকে প্রশ্নের জবাব পেতে তাঁর একান্ত সদিচ্ছা সুস্পষ্ট। আরও ঘটা করে বললে, তিনি কেবল বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করেন নাই, নিজেকে পণ্ডিত হিসেবে জাহির করার জন্য করেন নাই কিংবা ঈর্ষা বা হিংসা থেকেও করেন নাই; করেছেন উক্ত বিষয়ের তুলনামূলক বিশুদ্ধ রূপটাই যেন সকলে জানতে পারে, কেউ যেন বিভ্রান্তির শিকার না হয়, ডক্টর সেন যেন বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করে সংশোধন করতে পারেন সেজন্য। ‘কঠোর সমালোচনা’র পেছনে সাহিত্যবিশারদের এমন আন্তরিক সদিচ্ছা বর্তমান সাহিত্য-সমালোচকদের জন্য অবশ্য-অনুকরণীয় আদর্শ।

 

আবার একটু খেয়াল করলে দেখবো, সাহিত্যবিশারদের ভাষা-শব্দপ্রয়োগ- খুবই ধারালো, আক্রমণাত্মক, খোঁচালো। বিশিষ্ট গবেষক ও সম্পাদক আবুল আহসান চৌধুরীর মতে, “তাঁর বক্তব্যে উত্তেজিত ভাব, কিঞ্চিৎ অসংযম ও আক্রমণাত্মক কটু মন্তব্য স্থান পেয়েছে।” কিন্তু সাহিত্যবিশারদের এমন ভাষা ও শব্দপ্রয়োগ খুবই ব্যতিক্রম- তাঁর সমগ্র রচনার সামনে। ফলে, আমরা ধারণা করছি তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার এবং প্রিয়তম কবি আলাওলের ব্যাপারে এমন অনৈতিহাসিক ও অযৌক্তিক মন্তব্য তিনি মেনে নিতে পারেননি, আঘাত পেয়েছেন; যার লিখিত রূপ কিছুটা দেখা যায় সমালোচনার ছাঁচালো ভাষায় ও উত্তেজিত ভঙ্গিমায়।

 

আরেকটি মজার বিষয় হচ্ছে, সুকুমার লিখেছেন ‘ইসলামি’ কিন্তু সাহিত্যবিশারদ লিখেছেন ‘ইসলামী’; পূর্ববঙ্গের পণ্ডিতদের ‘ইসলামী’ পরিভাষা যে পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে ‘ইসলামি’ হয়ে যায় তা বোধহয় সাহিত্যবিশারদ খেয়াল করেননি, করলে হয়তো আরেকটি বস্তুনিষ্ঠ অভিযোগ আমরা পেতাম।

 

ডক্টর পঞ্চানন মণ্ডলের কোনো চিঠি আমাদের নিকট নেই বিধায় আমরা নিশ্চিত বলতে পারছি না, সুকুমার সেনের নিকট তিনি সাহিত্যবিশারদের প্রশ্নগুলো তুলেছেন কি-না! এই গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় সুকুমার সেন আমাদেরকে নিশ্চিত করছেন যে, “১৯৫১ খ্রীষ্টাব্দে ‘ইসলামি বাংলা সাহিত্য’ প্রকাশিত হবার পরে কোন একটি পত্রিকায় নামটির দোষ ধরা হয়েছিল”- অর্থাৎ, তিনি তখনই সাহিত্যবিশারদের সমালোচনা দেখেছিলেন। তাঁর এই স্বীকারোক্তিতে আমাদের মনে যে প্রশ্ন দু’টি উদয় হচ্ছে:

 

১. তিনি পত্রিকার নাম উল্লেখ করলেন না, হয়তো মনে নেই, কিন্তু সমালোচক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের নাম মনে না থাকার কারণ নেই, তবুও উল্লেখ করলেন না কেন? হীনমন্যতা থেকে না অন্য কিছু?

২. যখন তিনি সমালোচনা দেখেছেন তখন নিশ্চয়ই পত্রিকাটি কুচিকুচি করে কাটা ছিল না, যে কারণে তিনি সমালোচনার একাংশ দেখেছেন, বাকি অংশ দেখেননি! কিন্তু তিনি কেবল একটি অভিযোগের জবাব দিলেন, বাকি দুইটি জাঁদরেল অভিযোগ-যেগুলো নিয়ে সাহিত্যবিশারদের মূল আপত্তি- তিনি সচেতনভাবেই এড়িয়ে গেলেন। এই এড়িয়ে যাওয়া কেন? একজন সত্যানুসন্ধানী ঐতিহাসিক হিসেবে করনীয় হচ্ছে, অভিযোগের যুৎসই, যৌক্তিক জবাব দেওয়া, নয়তো উত্থাপিত অভিযোগ মেনে নিয়ে পূর্বের মত, বাক্য, তত্ত্ব, তথ্য সংশোধন করা; কিন্তু দুঃখজনক ও আশ্চর্যজনকভাবে সুকুমার সেন কোনোটিই করলেন না! আবার গ্রন্থের নামের ব্যাপারে তাঁর যে দুর্বল এবং গা-বাঁচানো উত্তর তা দেখে বস্তুনিষ্ঠ পাঠক ও ইতিহাস-অনুসন্ধিৎসুদের সন্তুষ্ট হবার কথা নয়।

 

সবমিলিয়ে- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-বিষয়ক পণ্ডিতদের অন্যতম একজন হিসেবে বিবেচ্য সুকুমার সেন সাহিত্যবিশারদের বস্তুনিষ্ঠ ও প্রামাণিক সমালোচনার বিপরীতে যে গা-বাঁচানো প্রতিক্রিয়া এবং অ-দায়িত্বশীল আচরণ করলেন তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।

মুহাম্মদ আবু সাঈদ

 

খতিয়ান: 

১. দীপ্ত আলোর বন্যা : আজহারউদ্দীন খান, বাংলা একাডেমি, ১৯৯৯

২. আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ রচনাবলী তৃতীয় খণ্ড : আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি, ২০১৩

৩. ইসলামি বাংলা সাহিত্য : সুকুমার সেন, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ২০১৬ (দ্বিতীয় সংস্করণ, পঞ্চম মুদ্রণ)

মতামত
লোডিং...