সত্য ও তথ্য : আমীনূর রশীদ চৌধূরী

প্রকাশনী: সাহিত্য প্রকাশ ; প্রকাশকাল: ২০১০ ; মুদ্রিত মূল্য ২০০ টাকা।

 

‘হাতি পর হাওদা, ঘোড়া পর জিন

জলদি আও, জলদি আও ওয়ারেন হেস্টিন।’

 

আত্মবয়ানের শুরুতেই যখন ব্যক্তি “আমি তো শিশুকাল থেকেই কেতাদুরস্ত ইংরাজদের সাহচর্যে ও লালনে মানুষ। আমার চোখে মানুষ ওরা-ই। এই দেশের লুঙ্গি, ধূতি পরা কালো মানুষদের আমি নিতান্ত কৃপার চোখে দেখতাম।” বলেন, তখন আর বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ব্যক্তি যথাসম্ভব অকপট সত্য নির্দ্বিধায় বলার চেষ্টা করবেন। ‘ইংরাজদের সাহচর্যে ও লালনে মানুষ’ হ‌ওয়া এই আমীনূর রশীদ চৌধূরীকে পিঠ চাপড়ে নেতাজী সুভাষ বসু বলেছিলেন: “এরি মধ্যে লায়েক হয়ে গেছ! হাজতবাস, আর পুলিশের মার, দুটিই হয়ে গেছে। তুমি দেশের কাজে লাগবে”! ইন্টারেস্টিং না? বটেই! আজাদিমুখর সেই বাঙালি আমীনূর রশীদের তারুণ্যদীপ্ত এই জার্নিটা আমাদের জানা দরকার।

 

১৯১৫ সালে সিলেটের এক অভিজাত পরিবারে জন্ম নিয়েছেন তিনি; পরিবারের আভিজাত্যের খাতিরেই হয়তো সাহচর্য পেয়েছেন বিনয় বোস, সুভাষচন্দ্র বসু, রায় বাহাদুর সুখময় চৌধুরীর মতো মানুষদের। ভারতবর্ষে ইংরেজদের রিজিক খতম করতে বিপ্লবী নামে তরুণ, যুবকদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে আমরা ভাসা-ভাসা জানি; আমীনূর রশীদ সেই বিপ্লবী নামে সন্ত্রাসীদের অন্যতম একজন ছিলেন বলে তৎকালীন সময়ে তাদের কার্যক্রমের ব্যাপারে বিস্তারিত— প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে— জানতে পারা যায়। জেলে ছিলেন মেলা সময়, বিচিত্র অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন মন খুলে। এক জেইলার সাহেবকে দেখে ‘ওয়াক থু’ বলে দূরে সটকে পড়লেন, কারণ জিজ্ঞাসা করলে তাঁর স্পষ্ট জবাব: “স্যার, ওর মত আড়াইশ’ তিনশ’ টাকার কর্মচারী আমাদের‌ও আছেন কিন্তু কেউই ওর মত থার্ড ক্লাস নহেন।”

অভিজাত পরিবারের সন্তান তো? পড়তে গিয়েছিলেন আলীগড়ে। তখনকার আলীগড়ে ছাত্রদের পোষাক ছিল, চোস্ত পায়জামা, শের‌ওয়ানী এবং ফেজ টুপি— এ পোষাক না পরে বেরুলে জরিমানা হতো। কিন্তু আমীনূর রশীদ চৌধূরী, আহম্মদ আব্বাস, জহিরবাবার কোরেশী এই তিনজন ছাত্র ফেজ টুপির বদলে গান্ধী টুপি ব্যবহার করলেন! প্রিন্সিপাল ডাকলেন তাদেরকে। তিনি যুক্তির মুখে পড়ে পাঠিয়ে দিলেন তৎকালীন জাঁদরেল ভাইস চ্যান্সেলর স্যার জিয়া উদ্দিনের চেম্বারে— শেষ পর্যন্ত কী হলো? সিদ্ধান্ত হলো, তারা … টুপি পরবেন।

 

যারা আত্মজীবনীতে ঐতিহাসিক উপাদান খুঁজে পেতে মরিয়া তাদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা হচ্ছে, ভারতভাগের সময় সিলেটের অবস্থান নিয়ে— পাকিস্তান না ভারত কোথায় হবে ঠিকানা! এই নিয়ে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হলো। সেই ঐতিহাসিক নির্বাচনের হালহকিকত পুরোদস্তুর বর্ণনা করেছেন তিনি। এই নির্বাচনেই কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে কার জন্য যেন তদবির করতে গিয়েছিলেন মাওলানা আবুল কালাম আজাদের নিকট, তখন তাঁর কর্মকাণ্ড দেখে মাওলানা মন্তব্য করেছিলেন:

“জোঁক বহু দেখ চুঁকে মগর আপতো জোঁক সে ভি জেয়াদা খতরনাক হ্যাঁয়”

অর্থাৎ

জোঁক আমি অনেক দেখেছি কিন্তু আপনি তো জোঁক থেকেও ভয়ংকর ব্যক্তি।”

৫ ও ৬ জুলাই সিলেটে গণভোট সম্পন্ন হলো, গণভোটের মাধ্যমে সিলেটের ভাগ্য হেলে পড়লো পাকিস্তানে! আমীনূর রশীদ তো কংগ্রেসের টপ লিডার— তিনি এখন যাবেন কোথায়? সিলেটেই রয়ে গেলেন। কারণ? তাঁর জবানবন্দি: “কলকাতা গিয়ে থাকতে আমার কোন অসুবিধে ছিল না। সেখানে আমার আত্মীয়-স্বজন বন্ধু অনেকে ছিলেন। তবুও কখন সিলেট ছেড়ে চলে যাওয়ার কোন যুক্তিযুক্ত কল্পনা আমার মাথায় আসেনি। এর মুখ্য কারণ কোন কোন দুর্বল মুহূর্তে মনে হয়েছে আমার সহিত হযরত শাহজালালের আত্মিক সম্পর্ক আছে; এ মাটি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে আমার বিবেক সায় দেয়নি।”

আত্মজীবনীমূলক এ কেতাবখানা যে কোনো শ্রেণির পড়ুয়ার জন্য সাজেস্ট করতে দু’বার ভাবা নিষ্প্রয়োজন। কারণ, সাধারণ পাঠক পাবেন সুললিত গদ্যের উম; জীবন-সংগ্রামী পাঠক পাবেন বিপুল চড়াই উৎরাই পেরিয়ে সাফল্যের শীর্ষে আরোহণের চিত্র; ভাবুক, চিন্তক পাঠক পাবেন বেশ কিছু ঐতিহাসিক বিষয়ে নতুন আঙ্গিকে চিন্তার উপাদান।

 

মতামত
লোডিং...