মিথের মাহাত্ম্য : অন্য আলোয় মিথের পুনর্পাঠ

মিথ এবং মিথোলজি

শিশু জন্ম নেয়ার পর ধীরে ধীরে চিনে নেয় বাবা-মাকে। সত্যিই কি চিনে নেয়? নাকি চিনিয়ে দেয়া হয়? একটা বিশ্বাস আটকে দেয়া হয় সরল মস্তিষ্কে। একটা মিথ। শিশু বাড়ে, বাড়ে মিথ। রূপে আর পরিমাণে। তারপর…

OPAE নামের মেয়েটা গর্ভবতী হলো। অথচ তাঁর কোনো স্বামী নেই। যায়নি কোনো পুরুষের মোলাকাতেও। যেহেতু সমাজ একথা বুঝতে নারাজ, সেহেতু ইজ্জতের ডরে অন্যরকম সিদ্ধান্ত নিলো মেয়েটা। গোপনে জঙ্গলে ফেলে আসলো সন্তানকে। একটা পাখি কিন্তু ঠিকই দেখে ফেললো ঘটনা। তারপর কোত্থেকে যেনো বাকল আর পাতা এনে ঢেকে দিলো পরিত্যক্ত শিশুকে। সময়ের ব্যবধানে শিশুটি একটা গাছে পরিণত হলো। এটাই পৃথিবীর প্রথম ট্যারু গাছ, ঐ অঞ্চলের মানুষের জীবন যাপনের অন্যতম অবলম্বন। গল্পটা নিউ গিনির হলেও এরকম অজস্র গল্প আছে অন্যান্য সংস্কৃতিতেও। টিকে আছে অনেকটা শ্রদ্ধা পেয়েই। বিশেষ এই গল্পগুলোর বিশেষত্ব কেবল সংশ্লিষ্ট উপাদানে না, বর্ণনার প্যাটার্নেও। মিথের মাহাত্ম্য এখানেই।

গ্রীক শব্দ  Mythologia থেকে লাতিন এবং ফরাসি ভাষা ঘুরে ইংরেজিতে Mythology শব্দটি এসেছে। গ্রীক Muthos এর মানে গল্প, বয়ান কিংবা পৌরাণিক আখ্যান হলেও তাৎপর্যগতভাবে Mythology এর বিস্তৃতি বিশাল। এতোটাই বিশাল ও বৈচিত্র্যময় যে, অর্থের ফ্রেমে বাঁধতে চাওয়াটা নেহাত বোকামি। ইঁদুরের গর্তে নীলতিমি ঢোকাতে চাওয়ার মতোন।

মিথ আর মিথোলজির মধ্যে যেহেতু কিঞ্চিৎ ফারাক আছে, তাই মিথ থেকেই শুরু করা যাক। এককথায় মিথ হচ্ছে সমাজ বা সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত পবিত্র ধারণাগুলোর শাব্দিক উপস্থাপন। কখনো কখনো মিথ এমন একটি গল্প, যা ব্যাখ্যা করে কোনো কিছু কেনো অস্তিত্বশীল। উদাহরণস্বরূপ দক্ষিণ আমেরিকার জমজ সন্তানের মিথ আনা যেতে পারে। অথবা মিথ ব্যাখ্যা করবে কোনো ধর্মীয় আচার কেনো পালিত হয়। বাইবেলের অনুসরণে আব্রাহামিক ধর্মের খৎনার কথা এক্ষেত্রে যুতসই। অথবা মিথ হচ্ছে প্রাকৃতিক শক্তিগুলোর ব্যাক্তিরূপে উপস্থাপন। যেমন: গ্রীক মিথে ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতি, বজ্রের দেবতা জিউস এবং এরকম সবাই।

এতোকিছুর পরেও কিছু কথা থেকে যায়। যীশু খ্রিষ্ট নবি ছিলেন নাকি আল্লাহর পুত্র- সত্যতা নির্ণয়ে বাহাস হতে পারে। পক্ষে বা বিপক্ষে কিংবা দুইয়ের মাঝামাঝি সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। সেই খতিয়ান অন্যদিকের। যে কোনো একটা সিদ্ধান্তই যীশুর একটা কাল্ট দাঁড় করায়। সেই কাল্টকে ঘিরে একটা সমাজ গড়ে উঠারও নজির কম নেই। এই সমাজ রক্তসম্পর্কীয় সমাজের বন্ধন থেকে কম দৃঢ় না। তাঁর অন্যতম কারণ- এখানে ঐশী ধারণার সাথে যোগাযোগ আছে। যাই হোক, এতো ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আমরা শুধু একটা কথা সামনে আনতে চাচ্ছি। তা হলো- শুধু দেবতাদের আখ্যান মিথ না। সত্য, মিথ্যা কিংবা উভয়ের ভেতর থেকে বের হয়ে আসা এমন প্রচারণাকে আমরা মিথ বলতে পারি; যার সাথে স্বর্গীয় সংজ্ঞায়ন যুক্ত। যীশুর প্রভাব কোনো অংশেই জিউসের চেয়ে কম না। পাকিস্তানের ইতিহাসে জিন্নাহ্ প্রমিথিউসের চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ। সমকালীন কিংবা পরবর্তী সমাজ ও সংস্কৃতির উপর ক্রিয়াশীল নিয়ামক দেখে মিথ শনাক্ত করা যায়। একটা শিশু জন্ম নেবার সাথে সাথে তাঁর সামনে উপস্থাপিত হয় সমাজ, দেশ এবং ধর্ম। হাজির করা হয় কোনটা পবিত্র আর কোনটা অপবিত্র- সেই জ্ঞান। যুক্তি আর বুদ্ধি অদ্ভুতভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় অন্যকিছুর দ্বারা। যারা এই কর্তৃত্ব করে, প্রায়শ তারাই মিথ।

মিথ আর ফোকলোর কি এক? অবশ্যই না। নিতান্ত সাধারণ পাঠকও মিথকে অন্যান্য গল্প থেকে আলাদা করতে পারে। কীভাবে? কারণ সকল মিথের ভেতর একটা বিশেষ অনুরণন আছে। আর তা হলো- মিথ এমন ব্যাখ্যা এনে সামনে হাজির করে, যার ভিন্ন ব্যাখ্যা পাঠকের মস্তিষ্কে আগে থেকেই আছে। পাঠকের মস্তিষ্কে বিশ্বাসযোগ্য অবস্থায় ক্রিয়াশীল সেই ব্যাখ্যাকে আমরা ‘ফ্যাকচুয়াল মিথ’ (Fcactual Myth) হিশেবে নামকরণ করবো। জরাথুস্ট্রবাদ অনুসারে, পৃথিবী সৃষ্টির পেছনে আহুর মাজদা এবং আঙরা মাইনু বা আহরিমানের ধারণাকে সজোরে মিথ বলে আখ্যা দেবে সেমেটিক ট্রাডিশনের ধর্মগুলো। এর কারণ, তাঁর মস্তিষ্কে ফ্যাকচুয়াল মিথ হিশেবে পৃথিবী সৃষ্টির অন্য ধারণা ক্রিয়ারত। অনুরূপভাবে সেমেটিক সৃষ্টিবাদ একজন জরাথুস্ট্রবাদীর কাছেও মিথ মাত্র। একে আমরা ‘নমিনাল মিথ’(Nominal Myth) হিশেবে নামকরণ করবো। অর্থাৎ পাঠক যে মিথ সম্পর্কে রায় দিচ্ছে, তা নমিনাল মিথ। আর যে মিথের মধ্যে বসবাস করছে, তা ফ্যাকচুয়াল মিথ। বাঙালি সংস্কৃতিতে বাস করে একজন কট্টর বাঙালির চর্চিত বিশ্বাস ফ্যাকচুয়াল আর পাশাপাশি আরব, তুর্কি, ইরানী কিংবা অন্য যেকোনো সংস্কৃতির বিশ্বাস তখন নমিনাল। নবি মুহম্মদ দ. এর সবচেয়ে বড় সফলতা ছিলো এইখানে। তিনি গোত্রীয় বহু বিভাজিত মিথকে কা’বাকেন্দ্রিক একটি মিথ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করেছেন। প্রত্যেকটা মহাপুরুষ মূলত এই কাজটাই করেন।

আধুনিক বিশ্বের বিজ্ঞান তাঁর নিজস্ব মিথ দিয়ে সেই কাজগুলোই করছে, মধ্যযুগে যা ধর্ম করতো।

যাইহোক, ফ্যাকচুয়াল এবং নমিনাল উভয় মিথকে সামনে দাঁড় করালে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা যায়-

১. ঘটনার চরিত্র অন্যান্য গল্প থেকে আলাদা। প্রায়শ মিথগুলোতে কোনো দেবতা, উপদেবতা কিংবা অপদেবতা জড়িত থাকে। একে বরং আরেকটু আধুনিক করে বলা যেতে পারে। মিথে সংশ্লিষ্ট চরিত্রের দেবতাকরণ করার প্রয়াস থাকবে। পীর-ফকির কিংবা জাতীয়তাবাদী নেতার কাল্ট আমরা অনায়াসে সামনে আনতে পারি উদাহরণ হিশেবে।

২. একটা সংস্কৃতিতে লালিত বিশ্বাস এবং পবিত্র কিছুর ব্যাখ্যা উপস্থাপিত হয় মিথে। এখানে পবিত্র মন্ত্র বা শব্দ, পবিত্র কাজ বা ইবাদত এবং পবিত্র স্থান- এই তিনটির যেকোনো একটি থাকবে। নবজাতক শিশুর পিতা যখন ধর্ম কিংবা রাষ্ট্র যখন সংবিধান হাজির করে, তা পবিত্র আর আজীবন মান্য হিশেবেই আসে।  সত্যযুগে ভারতের কোন অঞ্চলে কোন ইবাদতের চর্চা হতো, তা পরের বিষয়। প্রায়োর হলো- বর্তমানে কি চর্চিত হচ্ছে। মিথ দুটোই।

৩. সাধারণ গল্পগুলো আমাদের একটা নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ে যায়। অনেকটা Once upon a time দিয়ে শুরু হবার মতো। কিন্তু মিথ নিয়ে যাবে সময়ের শুরুতে। যেমন বাইবেলের জেনেসিস বলছে- In the beginning, GOD created the heavens and the earth.

৪. মিথ তর্ক করবে না। শুধু উপস্থাপন করবে। অর্থাৎ যুক্তি প্রমাণের তোয়াক্কা নেই। কেউ গ্রহণ করতে চাইলে একে মেনেই গ্রহণ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ মিসরীয় খেপরি পুরাণের উক্তি তুলে ধরা যায়- I spat out what was shu, and I sputtered out what was tenfut.

৫. সময়ের আগ্রাসী স্রোত, পরিস্থিতির টানাপোড়েন- তবু যুগ যুগ ধরে টিকে থাকা মিথগুলো মূলত সাক্ষ্য দেয় তাদের Extraordinary authority-এর। ব্যাখ্যাগুলো কেউ তৈরি করে নি। স্বর্গীয়ভাবে মানব সমাজে প্রোথিত। এটা মিথের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

 

মিথোলজি হচ্ছে কোনো একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতি বা সভ্যতায় চর্চিত মিথগুলোর সামগ্রিক রূপ। সে হিশেবে ইণ্ডিয়ান মিথোলজি বলতে বুঝায় ভারতীয় সভ্যতায় বিরাজিত সমগ্র মিথ। রামের সীতা উদ্ধারের আখ্যান এবং পাণ্ডবদের কৌরববধের আখ্যান দুটি আলাদা মিথ। কিন্তু দুটোই ইণ্ডিয়ান মিথোলজির অন্তর্ভুক্ত। মিথোলজির অপর সংজ্ঞা- মিথকে পাঠ করবার বিদ্যা। প্রাচীন গ্রীস থেকে আধুনিক যামানা পর্যন্ত নানা রঙে নানাভাবে মিথের তর্জমা-তাফসির হচ্ছে। প্লেটো বা তাঁর আগে থেকে লেভি স্ত্রাউস, ইয়াং, মির্চা এলিয়াদ এবং যোসেফ ক্যাম্পবেল হয়ে আজ পর্যন্ত মিথ পাঠ করার যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, তাঁর পরিধি কম না। অজস্র পণ্ডিতের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বগলে করে গড়ে উঠা এই শাস্ত্রই মিথোলজি। এর মানে এই নয় যে- মিথের পাঠ আমাদের পৌরাণিক সময়ের সাঁকো দিয়ে হাঁটাবে। অবশ্যই মিথোলজির পাঠ কল্পনার জগত সম্পর্কে অভিজ্ঞতা দেয়। মিথোলজির অধ্যয়নের জন্য সিম্বল নিয়েও ঘাটাঘাটি তাই জরুরি। কিন্তু তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো- মিথের পাঠ আমাদের সক্ষম করে তোলে বর্তমানে প্রচলিত মিথকে শনাক্ত করতে। আবারো স্মরণ করাতে চাই, মিথ বলতে আমরা সত্য বা মিথ্যা বলছি না। মিথ সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থা।

মিথের প্রভাব

ডিউডেলাস ছিলেন তাঁর সময়ের বিখ্যাত আবিষ্কারক। ঘটনাক্রমে ক্রিটের রাজার বিরাগভাজন হন। রাজা মিনোস ডিউডেলাস এবং তাঁর পুত্র ইকারাসকে কয়েদ করে রাখলেন ল্যাবিরিন্থে। এ এক ধাঁধাঁলো কারাগার, বের হওয়া অসম্ভব। তবুও হতাশ হন নি জ্ঞানী ডিউডেলাস। প্রতিদিন অল্প অল্প করে মোম নিয়ে পাখা বানালেন নিজের ও পুত্রের জন্য। তারপর একদিন উড়াল দিলেন আকাশে। পুত্র ইকারাসের প্রতি উপদেশ ছিলো বেশি নীচে বা উপরে না উড়ার। নীচে সাগরজলে পাখা ভিজে যাবার সম্ভাবনা আর উপরে সূর্যের উত্তাপে গলে যাবার। ইকারাস কিন্তু ওই ভুলটাই করলো। উড়ার জোশে উপরে যেতে যেতে চলে গেলো সূর্যের কাছাকাছি। পরিণামে পাখা গলে আছড়ে পড়লো সাগরজলে- মৃত্যু।

প্রথম পাঠেই গল্পটাতে মধ্যমপন্থা অবলম্বনের ইঙ্গিত চোখে পড়ে। এরিস্টটল যখন তাঁর নিকোমেকিয়ান ইথিক্স-এ Golden mean এর কথা বলেন, আরব উপদ্বীপের নবি মুহম্মদ দ. যখন সাহাবিদের মধ্যবর্তী পথের ডাক দেন, শাক্যমুনি বুদ্ধ যখন মধ্যমপন্থার ধারণা দেন- তখন ইকারাসের প্রতি ডিউডেলাসের উপদেশ আরো বিস্তৃত অর্থ লাভ করে। অন্যদিকে ইকারাসের মৃত্যু ইকারাসের জন্য ছিলো বুদ্ধিভ্রষ্ট হবার পরিণাম এবং ডায়ডেলাসের জন্য পূর্বকৃত পাপের। চোখের সামনে পুত্রের মৃত্যু দেখা যে-কোনো পিতার জন্য শাস্তিই বটে। যাই হোক, একটা মিথ কীভাবে ধর্ম, দর্শন আর বিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কযুক্ত হতে পারে, তাঁর উৎকৃষ্ট নজির ইকারাসের মিথ। প্রত্যক্ষ কিংবা প্রচ্ছন্নভাবে মিথের গন্ধ মিশে থাকে ধর্ম, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির শরীরে।

সবার আগে আসে ধর্মের নাম। নৃতত্ত্ববিদগণ টোটেম-ট্যাবু ধারণার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন অনেক আগেই। প্রাচীন সেই বিশ্বাসই কাঠামো দিয়েছে ট্রাইবকে। গড়ে উঠেছে নানা আচার ও বিঁধি-নিষেধ। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত নিয়াণ্ডার্থাল মানুষের কবর এবং মিসরীয় মমি তাদের ধর্মবিশ্বাসকেই প্রতিফলিত করে। সত্যি বলতে ধর্মের সামগ্রিক ইতিহাসে মিথের আধিপত্য ছিলো একচেটিয়া। নবি মুসা ফেরাউনের গোলামী থেকে বনী ইসরাইলকে রক্ষা করে কেমন ঐতিহ্য চালু করেছেন, সে পরের কথা। কিন্তু পারস্য, আসেরীয়, রোমান এবং হাল আমলের হিটলারের আঘাতও যে তাঁদের ঐতিহ্য উপরে ফেলতে পারে নি, তার কারণ তাঁদের পেছনে খোদা তা’লার বিশেষ প্রতিরক্ষা নয়। কারণ নিজেদের ঐতিহ্য ও মিথের প্রতি কঠোর আনুগত্য।

আবার একটা গোত্রের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা স্থাপন, বাহিরের গোত্রের সাথে টিকে থাকার স্বার্থে সম্পর্ক নির্ধারণ, মিত্রতা কিংবা যুদ্ধ- যে কোনো পরিস্থিতিতে দারুণভাবে ব্যবহৃত হতে পারে মিথ। সম্রাট কনস্টানটাইন যখন ধর্মান্তরিত হন কিংবা ব্রিটিশরাজ যখন Defensor fidei অর্থাৎ ‘বিশ্বাসের রক্ষক’ নাম ধারণ করেন, অথবা মুসলিম শাসক ‘আমিরুল মু’মেনীন’ নাম  নেন, তখন কেবল ধর্ম সামনে আসে না। আসে রাজনীতি, ক্ষমতা আর মিথের ধারণাও। চতুর্থ আমেনহোটেপের ইখনাটন অর্থাৎ ‘এটন যার উপর সন্তুষ্ট’- নাম নেবার সাথে তাৎপর্যগতভাবে এর খুব বেশি ফারাক নেই। একটা মিথ একটা সমাজ তৈরি করে। দুটি সমাজের ভেতরে যার মিথ শক্তিশালী, সেই-ই বিজয়ী হবে। কেননা, শক্তিশালী মিথ ভেঙে দিতে পারে রক্তের সম্পর্ককেও। বশীভূত করে রাখে অচেনা ব্যাক্তিকেও।

সার্থক মিথ তৈরি করার মাধ্যমে শাসক কেবল স্বীয় রাজ্যে বিদ্রোহের রাস্তাই বন্ধ করেন না। পাশাপাশি জনতাকে পক্ষে রেখে তখতের মেয়াদ দীর্ঘ করেন। একটা মিথিকাল ফিগার দাঁড় করাতে পারাটা রাজনীতির মাঠে প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করার সার্থক অস্ত্র। যুদ্ধের মাঠে নিজের দলকে চাঙা রাখার চাবি। ধর্মের ময়দানে এর প্রয়োজন অন্যান্য সকল ক্ষেত্রের চেয়ে বেশি।

গ্রীক শষ্যের দেবী দিমিতিরের কন্যা পার্সিফোনিকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় পাতালে। ক্রোধান্ধ দিমিতির এবং তাঁর পরবর্তী আখ্যান নির্দেশ করে গ্রীসের ঋতুবৈচিত্র্য। অন্যদিকে প্রমিথিউসের আগুন আনবার ঘটনা সামনে আনে মানুষের সাথে আগুনের সম্পর্ক। ক্রুদ্ধ জিউসের প্লাবন দিয়ে পৃথিবী ধ্বংসের সিদ্ধান্ত আঙুল তোলে বন্যার দিকে। বলে রাখা ভালো, মহাপ্লাবনের স্মৃতি প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য প্রায় প্রতিটা সংস্কৃতিই বলে গেছে। মোদ্দাকথা, মিথ ছিলো প্রাকৃতিক অলঙ্ঘ নিয়মগুলোকে ব্যাখ্যা করার বিশ্বস্ত সূত্র। একে একদিক থেকে বিজ্ঞানের শিশুকাল বলা যেতে পারে। অন্যদিক থেকে বলা যেতে পারে, দর্শন ও সমাজ ধারণার আদিরূপ। সবচেয়ে সত্য হয় মানুষের অস্তিত্বচেতনা এবং উপলব্ধির দিকে আঙুল তোললে।

পূর্বের মহাভারত আর রামায়ণ, পশ্চিমের ইলিয়াড আর ওডিসি। গ্রীসের নাটক এমনকি দর্শনেও মিথের প্রভাব ছিলো তাৎপর্যপূর্ণ। এজন্য জেনো বা এরিস্টটলেরাও পিঠ ঘুরিয়ে থাকেননি অথবা থাকতে পারেন নি। প্লেটোর গুরু সক্রেটিস  মৃত্যুকালে বলেছিলেন: “Crito, we owe a cock to Asclepius. Do pay it. Don’t forget.”

বলা বাহুল্য, এখানে উল্লেখিত এস্ক্লিপিয়াস আরোগ্যের দেবতা। দেবতা এপোলো এবং করোনিস এর পুত্র। অনুরূপ কাহিনী দেখা যায় এখনো। এপোলো কিংবা এস্ক্লিপিয়াস নেই হয়তো। কিন্তু নতুন সময়ে নতুন সংস্কৃতিতে নতুনরূপে সামনে এসেছে সেই পুরোনো মিথ।

ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমাতে একটা নতুন রাজবংশ উত্থানের পেছনে প্রোপাগাণ্ডার ভূমিকা ব্যাখ্যা করেছেন। মেসিয়ানিক প্রোপাগাণ্ডা কীভাবে রোমান সাম্রাজ্যকে গরম করে ফেললো আর মাহদী প্রোপাগাণ্ডা কীভাবে ফাতেমীয় বংশকে রাজক্ষমতা দিলো- তার সাক্ষী ইতিহাস। এরচেয়ে পোক্ত প্রমাণ বর্তমানের বায়তুল আকসা এবং জেরুজালেম সংকট। আন্তঃআব্রাহামিক ধর্মের ফ্যাকচুয়াল এবং নমিনাল মিথের সংঘর্ষ। পেছনে আমরা প্রোপাগাণ্ডাকে মিথ বলে এসেছি। দুই লাইনের সংজ্ঞায় না দাঁড় করিয়ে একটা স্বতন্ত্র জগৎ হিশেবে সামনে ধরলে মিথ পাঠ অনেকাংশে অর্থপূর্ণ হবে। ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে মিথ সভ্যতার অন্যতম নিয়ামক হিশেবে ছিলো, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। সে অর্থে Homo Sapiens–কে অসংকোচে Homo Muthos বলা যায়।

 

মিথের তর্জমা-তফসির

সময়ের বিভিন্ন বাঁকে মিথকে পাঠ করা হয়েছে বিভিন্নভাবে। ব্যাক্তি কিংবা সময়ের ভিন্নতায় কখনো ইতিহাস কখনো যুক্তি কখনো বা অন্য কোনো পাটাতনে দাঁড় করানো হয়েছে মিথকে। কখনো ভেঙে ভেঙে, কখনো সামগ্রিক থেকে অর্থ বের করা হয়েছে। যেহেতু এই জগৎটা আলো-আঁধারির। বুকে হাত দিয়ে ‘আমিই সঠিক’ বলার দুঃসাহস দেখাতে পারে না কেউ। তাতে বরং ভালোই হয়েছে। অনায়াসে ঢুকে পড়া যায় এক অদ্ভুত ভাষার রাজত্বে। লক্ষ বছর বয়সী কোনো দাদু যেনো দাড়ি নাচিয়ে বলে চলছেন তার সময়ের পৃথিবীকে।

ক্লাসিক্যাল পৃথিবী বলতে আমরা প্রাচীন গ্রীস আর রোমকেই বুঝি, অথবা বলা ভালো- আমাদের বুঝানো হয়। আড়াই হাজার বছর আগের সেই চিন্তাশীল সমাজে মিথের তিন ধরণের পাঠ দেখা যায়। প্রথম পক্ষের দাবী ছিলো মিথ রূপক। অর্থাৎ সকল প্রকার মিথ দার্শনিক সত্যকে রূপক হিশেবে উপস্থাপন করার প্রয়োজনেই গড়ে উঠেছে। এই তত্ত্বের পক্ষে ছিলো প্লেটো, এম্পিডক্লিস এবং হেরাক্লিটাসের মতো বাঘা বাঘা পণ্ডিতেরাও। তাঁদের মতে, হেক্টরবধ, ট্রয়ের যুদ্ধ, বীর ওডিসিয়াসের ঘরে ফিরে আসা নিয়ে বিড়ম্বনা- সব গল্পই মূলত রূপক। ভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, রামের সীতা উদ্ধার এবং রাঁধা-কৃষ্ণের আখ্যান নিয়ে অনুরূপ দাবী করা যায়। সেই চোখ দিয়ে দেখলে মহাভারতের পাণ্ডব-কৌরব দ্বন্দ্ব রূপকভাবে শুভাশুভের চিরন্তন দ্বন্দ্বকে অংকন করা হয়েছে। পঞ্চপাণ্ডবের প্রত্যেকে এক একটি বিশেষ গুণের প্রতিনিধিত্ব করে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে ফ্যামিনিটি (দ্রুপদীরূপে) এবং ডিভাইনিটি (কৃষ্ণরূপে)। বিপরীতপক্ষে দুর্যোধন-দুঃশাসনসহ শত কৌরব প্রতিনিধিত্ব করে শত পাপের। এভাবে অর্থ বের করা যায় পূর্ব পশ্চিমের অন্যান্য মিথ থেকেও।

যুক্তির চালুনি হাতে এরপর হাজির হন জেনো। যদি গাধাকে তার স্রষ্টার ছবি আঁকতে দেয়া হয়, তবে আঁকা ছবিটাও একটা গাধারই হবে। তাঁর সিদ্ধান্ত ছিলো বিপ্লবী। এই চোখে দেখলে- অলৌকিকতার মোড়কে যে গল্পগুলো আমাদের সামনে হাজির, তা মানুষেরই সৃষ্ট। আর এজন্যই দেবতারা মানবিক। খোদাতা’লার গুণাবলি যতোটা না তাঁকে মহিমান্বিত করে, তারচেয়ে বেশি সংজ্ঞায়িত করে মানুষের অনুধাবন ও চিন্তনশক্তিকে। এইজন্যই যতো দিন অতিবাহিত অচ্ছে, ঈশ্বরবাদীদের ঈশ্বরের ধারণা ততো এবস্ট্রাক্ট হচ্ছে। সময়ের সাথে মানুষের বেড়ে উঠার ইতিহাস অন্য অর্থে ঈশ্বরের বেড়ে উঠার ইতিহাস। জিউস কিংবা মহাদেবের মর্ত্যে নেমে আসা, দেবীতে দেবীতে মনোমালিন্য, দেবতা-দেবতায় যুদ্ধ; অন্য জগতের কিছুর না, মানুষের ভেতরের যৌনতা, ক্রোধ এবং প্রতিহিংসার প্রকাশ। মানুষ তাঁর ভেতরের ভয়, লোভ এবং অভিপ্রায়কে বিশ্বাসের বলয় দিয়ে সামনে এনেছে। মিথ পাঠের এই তত্ত্ব মানুষের আচার, সমাজচিন্তা, মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সংজ্ঞায়নে তাৎপর্যপূর্ণ।

ক্লাসিক্যাল যুগে মিথ পাঠের তৃতীয় ধারণার নাম ইউহেমারিজম। একে অন্য কথায় মিথের ঐতিহাসিক পাঠ বলা যেতে পারে। ইউহেমারাস নামক গ্রীক পণ্ডিত প্রথম দাবী করেন- যাদেরকে দেবতা জ্ঞানে টঙে তুলে রাখা হয়েছে তারা মূলত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। দেবতা জিউস ছিলেন প্রকৃতপক্ষে ক্রিটের একজন শক্তিশালী শাসক আর তাঁর সম্পর্কে গড়ে উঠা মিথ প্রকৃতপক্ষে ইতিহাসের অতিরঞ্জন। এভাবে পার্সিয়াস, হারকিউলিস কিংবা প্রমিথিউসকেও ব্যাখ্যার আলোয় আনা যায়। ভারতীয় মিথ নিয়ে যে ঐতিহাসিক পাঠের দাবী নেই, তা না। রামের লঙ্কা অভিযান, রাবণবধ, কৌরব-পাণ্ডব টানাপোড়েন এবং কুরুক্ষেত্রের রক্তপাত- ঘটনাগুলোকে ইতিহাস হিশেবে উপস্থাপনের প্রয়াস উল্লেখযোগ্য। গঙ্গার অস্তিত্বশীলতা, জগন্নাথের মন্দির, কাশী- প্রভৃতি ধারণাতে ইতিহাস আর মিথ একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ক্লাসিক্যল যুগের পরে আসে ক্যাথলিক যুগ। ক্রিশ্চিয়ান ধর্মের প্রচারকেরা বেশ ভালোভাবে রপ্ত করেছিলো ইউহেমারিজমের ধারণা। তাঁদের প্রথম আর প্রধান শত্রু প্যাগানদের বিরোধিতা করতে প্যাগান দেবতাদের অযোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ এরচেয়ে ভালো আর কী? ক্লিমেণ্ট অব আলেক্সান্দ্রিয়ার মতো অনেকেই টিপ্পনি কাটতে থাকে- Those to whom you bow were once men like yourselves.

এই প্রচারণার অভূতপূর্ব শক্তিও সেই কারণগুলোর একটি, যার প্রভাবে প্যাগানিজমের বুকের উপর স্থাপিত হয় খ্রিষ্টীয় ঝাণ্ডা।

অষ্টাদশ শতক থেকে মিথ সম্পর্কে ধারণা অনেকটা বদলাতে থাকে। সামঞ্জস্য পাওয়া যেতে থাকে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন মিথের সাথে গ্রীস এবং রোমান মিথের। পণ্ডিতমহলে আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। মিথকে গণ্য করা হয় মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক শিশুকালের স্বাক্ষর হিশেবে। রোমান্টিক যুগে ভাষাবিজ্ঞানের আলো ফেলা শুরু হয়। শুরু হয় আর্ট, কৃষ্টি এবং আচারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সংস্কৃতির মিথের তুলনামূলক অধ্যয়ন । বই লেখা হতে থাকে Mythology এবং Symbolism এর উপর।

উনবিংশ শতকে বিবর্তনবাদের স্রোত এইদিকেও আঘাত হানতে ভুল করেনি। ডারউইনের জীববিবর্তন, মার্কসের সমাজ বিবর্তন এবং ফ্রয়েডের মনোবিবর্তন- হাত বিস্তার করে মিথের ব্যাখ্যা দেবার জন্যও। এরমধ্যে যুক্ত হয় প্রচুর তত্ত্ব-উপাত্ত। বৈদিক পণ্ডিত ম্যাক্স মুলার, নৃবিজ্ঞানী জেমস জর্জ ফ্রেইজার এবং এডওয়ার্ড বার্নেট টেইলর অভাবনীয় সংযোগ ঘটান । বিভিন্ন অঞ্চলের মিথকে সংগ্রহ এবং তা থেকে অর্থ বের করবার বিদ্যা হিশেবে ব্যাপক ক্ষেত্র তৈরি হয়।

বিশ শতক ছিলো মিথ পাঠের স্বর্ণসময়। কার্ল ইয়াং মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধানের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। মিথের পেছনে তিনি কিছু নির্দিষ্ট সুপ্ত অবচেতন মনস্তাত্ত্বিক শক্তির খোঁজ করেছেন। যার নাম দিয়েছেন আর্কিওটাইপ। পৃথক সংস্কৃতির মিথের মধ্যে সাদৃশ্য মূলত এই আর্কিওটাইপের উপর নির্ভর করে। লেভি স্ট্রাউস মানব মনের সহজাত প্যাটার্নের ধারণা বলেই উপস্থাপন করেন মিথকে। ইডিপাসের মিথসহ অন্যান্য মিথ দিয়ে এই গঠনবাদী পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন জোড় বিপরীত ধারণার সাথে। যেমন- আলো বনাম অন্ধকার, রুক্ষতা বনাম দয়ার্দ্রতা, সুন্দর বনাম কুৎসিত ইত্যাদি।

জোসেফ ক্যাম্পবেল মিথকে মানুষের আধ্যাত্মিক সম্ভাবনার মেটাফোর উপস্থাপন হিশেবে দেখতে চান। মির্চা ইলিয়াদ দেখেন মানুষের পবিত্রতার জ্ঞান। যাইহোক, পাঠ করবার ধরণে ভিন্নতা কিংবা অর্থপ্রাপ্তিতে পৃথক সিদ্ধান্তে উপনীত হলেও মিথের আবেদন এবং মূল্যায়ন বোদ্ধামহলে বাড়ছে বই কমছে না। একবিংশ শতকের এই সময়ে মিথ নিয়ে বিভিন্ন টেলিভিশন প্রোগ্রাম এমনকি বিগ বাজেটের মুভির নাম দেখলেই তা স্পষ্ট হয়। সাথে সাথে পার্টিকুলার এবং কম্পারেটিভ মিথোলজি নিয়ে প্রকাশিত এবং প্রকাশিতব্য বইগুলো তো আছেই। যদিও মিথ বলতে এখন পর্যন্ত ‘নমিনাল মিথ’কেই পাঠ করা হচ্ছে। ব্যক্তি নিজে যে মিথের সাগরে ডুবে আছে, সে বিষয়টা থেকে গেছে অজ্ঞাতেই। অথবা বলা যেতে পারে- হয়তো অস্তিত্বের সংকট নয়তো ক্ষমতার হিশাবনিকাশ থেকেই বারবার চেপে যাওয়া হয়েছে একটা অংশ- ফ্যাকচুয়াল মিথ। যার বুকের উপর দিব্যি হেসে-খেলে রাত পোহাচ্ছে কৌশলী আধিপত্যবাদী। হয়তো সচেতনে অথবা অবচেতনে।

মতামত
লোডিং...