মিমার সিনান : বিস্ময়কর এক প্রতিভার নাম

মিমার মূলত আরবি শব্দ। অর্থ- স্থপতি। তুর্কি ভাষায়ও এটি স্থপতি অর্থে ব্যবহৃত হয়। সিনান ছিলেন ওসমানি খিলাফতের প্রধান স্থপতি।  আজ থেকে প্রায় চারশ বত্রিশ বছর আগের কথা।  ওসমানি খিলাফত তখন একশ উননব্বই বছর অতিক্রম করছে।  মসনদে ছিলেন সুলতান দ্বিতীয় বাইজিদ বিন মুহাম্মদ আল ফাতিহ। এ সময়ে ওসমানি খিলাফতের এগিরনাস, কারামান ওয়ালেত, বর্তমান তুরস্কের কায়সেরি প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন ‘মিমার সিনান’।  পিতা আব্দুল মান্নান ছিলেন আর্মেনিয়ান বংশোদ্ভূত। পরে ইসলাম গ্রহণ করেন।

 

তিনি বর্তমানের প্রকৌশলীদের মতো ডজন ডজন বই পড়েননি। সিনান পিতার কাছ থেকে কারিগরি শিক্ষা লাভ করেন। তার শিক্ষা ছিলো হাতে-কলমে। তিনি নিজেই এ সম্পর্কে বলেছেন “স্মৃতিস্তম্ভ গুলোতে আমি সমৃদ্ধ অতীতকে খুঁজেছি। প্রতিটি ধ্বংস থেকে আমি নতুন কিছু শিখেছি। প্রতিটি নির্মাণ থেকে আমি কিছু না কিছু গ্রহণ করেছি।”

সিনান ‘ইয়েনিচেরি’ নামক ওসমানি এক বিশেষ বাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে পেশাগত জীবনে পদার্পণ করেন। ইয়েনিচেরি হল এমন একটি সামরিক দল যারা খলিফা কোনো অভিযানে গেলে তাঁকে বেষ্টনী দিয়ে রাখত। এসময়ে তিনি বিভিন্ন সামরিক অভিযানে যোগ দেন ও নানা স্থাপত্যকর্মে হাত দেন। তাঁর আসল প্রতিভার পরিচয় মিলে নির্মাণকাজে। সুনিপুণ নির্মাণশৈলীর গুনে তিনি সেনাপতি থেকে স্থাপতিতে পরিণত হন ও খলিফার নজর কাড়েন।

 

সিনান মোট চারজন খলিফার রাজত্বকাল পেয়েছেন-  সুলতান প্রথম সেলিম, সুলতান সুলাইমান কানুনি, সুলতান দ্বিতীয় সেলিম ও তৃতীয় মুরাদ। এই সুলতানগণের শাসনামলে সিনান তৈরি করেন বিস্ময়কর সব ভবনসমূহ। যুগান্তর আনেন বিশ্বের নির্মাণরীতিতে। সুলতান সুলাইমানের শাসনামলে সিনান ‘কারা বুউদান’ অভিযানের সময় প্রুট নদীর উপরে মাত্র তের দিনে ব্রীজ নির্মাণ করে সুলতানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পরবর্তীতে ১৫৩৮ সালে পঞ্চাশ বছর বয়সে তিনি খিলাফতের প্রধান স্থপতির পদ অলংকৃত করেন। তাঁর শৈল্পিক চেতনা, গভীর চিন্তা, সুদীর্ঘ পরিকল্পনা তাঁকে উসমানি খেলাফতের অন্যতম অংশে পরিণত করেছে ।

তখনকার সময়ে ভবন নির্মাণে আয়া সোফিয়াকে আদর্শ মানা হতো। সিনান এমন একটি ভবন নির্মাণের প্রতিজ্ঞা করেন যা আয়া সোফিয়ার বিশালতাকেও ছাড়িয়ে যাবে। এদ্রিনের সেলিমিয়ে মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমে তিনি সেটি পূর্ণ করেন। তিনি এটিকে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি মনে করতেন। এর প্রতিটি মিনারের উচ্চতা ছিলো ৮০ মিটারেরও বেশি যা আয়া সোফিয়াকে টপকে দিয়েছিল ।

তবে তিনি অধিক পরিচিত ইস্তাম্বুলের সুলেমানি মসজিদের কারণে।  কানুনি সুলতান সুলাইমান মিমার সিনানকে এই মসজিদ নির্মাণের দায়িত্ব দেন। এটির নির্মাণ প্রসঙ্গে কিছু চমৎকার গল্প প্রচলিত আছে যা সিনানকে জানতে সাহায্য করে। কেউ কেউ বলেন এটি নির্মাণের আগে সিনান পাঁচ বছরের জন্য আত্নগোপনে ছিলেন। আবার কেউ বলেন দায়িত্ব দেওয়ার পর উজির একদিন তাঁর কাজ দেখতে গিয়েছিলেন। তিনি দেখলেন সিনান নৌকায় বসে ঝাঁকাচ্ছেন। নৌকা একবার এদিকে যায় আরেকবার ওদিকে। উজির মিমারের এই গাফিলতির কথা সুলতানকে অবহিত করেন। সুলতান এসে একই অবস্থা দেখে রাগান্বিত হয়ে বিলম্বের কারণ জানতে চান।  সিনান বলেন, “সুলতান! এমন একটি কাজ করতে চাই যা অদৃষ্টপূর্ব। সেজন্য তো সময়ের প্রয়োজন।” গত দুই শতক আগে ইস্তাম্বুলে  এমন একটি ভূমিকম্পে প্রায় সব পুরনো ভবন ভেঙে পড়লেও সুলেমানি মসজিদ অক্ষত থাকে। ভূমিকম্পের সময় এটি নাকি নৌকার মত এদিক ওদিক যাচ্ছিল কিন্তু কোনো ক্ষতি হয়নি।

 

সিনানের আর একটি স্থাপত্যকর্ম হলো ‘মেহরিমা সুলতান জামি’। এটি সুলেমানের কন্যা মেহেরিমার নির্দেশে তৈরি করা হয়েছিল এর নির্মাণের ১৪ বছর পর সিনান ইস্তাম্বুলের উঁচুতে আরেকটি ভবন নির্মাণ করেন। প্রতি বছর মেহরিমার জন্মদিনের সময় একটি মসজিদের মিনারে এসে সূর্য অস্ত যায় ও অন্যটির মিনার হতে চন্দ্র উদিত হয়। মেহেরিমা অর্থ সূর্য সাথে চন্দ্র।  সাহিত্যিকগণ এখানে মেহরিমার প্রতি সিনানের মমতার রহস্য লুকিয়ে আছে বলে মনে করেন।  এটি কিন্তু সিনানের সূক্ষ্মচিন্তার পরিচায়ক।

 

তার দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করতেই হয়।  সুলাইমানের পুত্র মেহমেদ একুশ বছর বয়সে গুটিবসন্ত রোগে মৃত্যুবরণ করলে তার স্মৃতি রক্ষার্থে সিনানকে একটি কমপ্লেক্স নির্মাণের নির্দেশ দেন। তিনি তা নির্মানও করেন। পাঁচ শত বছর পরে সেই ভবনের সংস্কারের কাজ শুরু করলে আধুনিক স্থপতিগণ হিমশিম খেতে লাগল। তখনই তারা দেয়ালের একস্থানে শিশির ভেতর একটি চিঠির সন্ধান পান যা তাদেরকে সংস্কারের পথ দেখিয়েছিল।

একটা মানুষ কতটা দৃঢ়চেতা হলে এ ধরনের কাজ করতে পারেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল হাজার বছর পরে হলেও কেউ এটি সংস্কার করতে চাইবে। এতে ওসমানিদের  ইস্পাতকঠিন ইমানের পরিচয় বহন করে। এছাড়াও তিনি মেহমেদ পাশা যাকোলভি ব্রিজ, কিলিচ আলী পাশা কমপ্লেক্স, হাসেকি সুলতান কমপ্লেক্সসহ আরও অনেক বিস্ময়কর সব ভবন নির্মাণ করেন যা বর্তমান যুগের প্রকৌশলীদের পথিকৃৎ হিসেবে ভূমিকা রাখছে ।

 

সিনানের প্রভাব ওসমানি সাম্রাজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে পশ্চিমে ইউরোপ ও পূর্বে এশিয়া পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলো। পাশ্চাত্যের স্থপতি মাইকেল এঞ্জেলো, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির সাথে তাঁর হৃদ্যতা ছিল।  তাজমহল নির্মাণেও সিনানের নির্মাণশৈলীর প্রভাব রয়েছে। সিনানের কাজ দেখে প্রাচ্যবিদ বার্নাড লুইস বিস্মিত হয়েছিলেন। গত শতকে জাপানি প্রকৌশলীগণ তাঁর নির্মাণ কাজে গবেষণা করে ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা আবিষ্কার করেছে। সে যুগে আগুনের আলোতে বসে বৈদ্যুতিক সাউন্ড সিস্টেমের মাধ্যমে দূরে আওয়াজ পৌঁছানোর কথা কেউ চিন্তা করেছিলো কি?

 

জি। সিনান সাহেব করেছিলেন। সুলেমানি মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমে তিনি লাউডস্পিকার বিহীন বিশাল মসজিদে প্রত্যেক মুসল্লির কানে ইমামের ধ্বনি পৌঁছানোর পন্থা  আবিষ্কার করেছিলেন ।  ছাদ, গম্বুজ ও পিলারগুলো এমনভাবে স্থাপন করেছিলেন যেন ইমামের ধ্বনি সমানে মসজিদের শেষ কাতারের মুসল্লিও শুনতে পায়। তাঁর কাজ ছিল সাশ্রয়ী। সুলেমানি জামিতে আলোর জন্য ব্যবহৃত বাতিগুলোর ধোঁয়া বা গলিত মোমকে কাজে লাগিয়ে কালি বানানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। সুলেমানি মসজিদের দৃষ্টিনন্দন ক্যালিগ্রাফি গুলো সেই কালিতেই আঁকা ।

 

মহামনিষীগণ পুরাতন কাজই করে থাকেন। তবে নতুন ঢংয়ে। স্থাপত্যকর্ম সিনানের আগেও ছিল। সিনান কেবল তাতে নতুনত্ব এনেছেন। আবার মহানদের চিন্তা স্বীয় যুগ থেকে কয়েকশ বছর অগ্রসর হয়। যা দুই-তিনশ বছর পরে বাস্তবায়িত হতে দেখা যায়। সিনানের চিন্তাচেতনাও কয়েক শত বর্ষ এগিয়ে ছিল। এ গুনই তাঁকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসিন করেছে এবং এটিই সিনান চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ দিক।

আধুনিক তুরস্ক এখনো তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তাঁর নিজ হাতের সজ্জা পর্যটকদের বিস্মিত করে, পা বাড়াতে সাহায্য করে ভাবনার নতুন জগতে। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করলে তাঁকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যবিদ বললে অত্যুক্তি হবে না। ১৭ জুলাই, ১৫৮৮ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের মাধ্যমে শতাব্দীব্যাপী জীবনের ইতি টানেন। সুলেমানি মসজিদে সুলতান সুলাইমানের অদূরে তাঁকে কবরস্থ করা হয়।

 

সহায়ক গ্রন্থ:

আমার দেখা তুরস্ক : হাফিজুর রহমান

মতামত
লোডিং...