কয়েকজন বিখ্যাত সুফি সাধক এবং ফকির উল্লাস

‘ফকির’ বিশেষ্যটি শুনলে মানুষের চিন্তার জগতের স্থর অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন চিত্র মনে ফুটে উঠে। বাংলার অপামার জনতা তাদের নিত্য নৈমিত্তিক জীবনে বহু কিছিমের ফকিরের দর্শন পাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছে, এই ফকির নিয়ে লোকমুখে রয়েছে রঙবেরঙের নানা কথা। ফকির বলতে আবার দেশের বড় একটা অংশ মনে করে ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নেওয়া ভিক্ষুকদের। অনেকে অজ্ঞাতসারে এদের ফকির সম্বোধন করলেও, বস্তুত ‘ফকির’ বিশেষ্যটি অনেক উচ্চস্তরের মানবদের জন্য ব্যবহৃত হয়।

এই উপমহাদেশের মানুষ পীর-ফকির, সুফি-দরবেশদের আদিকাল হতে সম্মানের চোখে দেখেন, যথাসাধ্য ভক্তি করেন।

ফকিরদের সংজ্ঞা ঠিক কী রকম হলে যথার্থতা লাভ করবে বলা মুশকিল, তবে মনে আসছে কোন এক বিখ্যাত সূফি ব্যক্তির একটি অভিমত, “কোন সাধকের বাম কাঁধের ফেরেশতা যদি টানা ২০ বছর তাঁর আমলনামায় কোন গুনাহ লিখার সুযোগ না পায় তখনই সে ফকির হিসাবে সব্যস্থ হবে।”

 

মহিউদ্দীন ইবনুল আরাবি, মনসুর হল্লাজ, শামসে তাব্রিজ, জালালুদ্দীন রুমি, খাজা আজমেরি ও গোলামুর রহমান বাবা ভাণ্ডারী সহ এই ধরাধামে অজস্র ফকির দরবেশদের আগমন ঘটেছে। এর মধ্যকার কতশত সুফি-দরবেশ-ফকির সম্পর্কে আমাদের জানাশুনা আছে সেটাও একটা ভাববার বিষয়, বা আমরা বিখ্যাত যাদের সম্পর্কে মোটামোটি জ্ঞান রাখি তাঁদের সম্পর্কে আমাদের জানার জ্ঞানের পরিধিটা কতটুকু সেটাও গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়।

 

শায়খুল ইসলাম মহিউদ্দীন ইবনুল আরাবি ছিলেন একজন জ্ঞান তাপস ফকির দরবেশ, ক্বলবে প্রভুর সান্নিধ্য পাওয়া ছিলো তাঁর রেয়াজতের অন্যতম বিষয়। তাঁর সাধনার অন্ত ছিলনা, দেশ হতে দেশান্তরি ঘুরে ঘুরে সাধনা করতেন। কিছুদিন মক্কা তো আবার কিছুদিন মদিনায় সাধনা করতেন। সেলজুক সাম্রাজ্যে ছিলেন তাঁর বসবাস, ভিবিন্ন পাহাড় জঙ্গলে নিরবে নিবৃত্তে সাধনা করতেন ও বিভিন্ন সৃষ্টিতে প্রভুর রহস্য উদ্ঘাটন করে যেতেন। প্রভুর সর্বব্যাপী অস্তিত্ব নিয়ে তিনি সাধনায় মগ্ন থাকতেন। দরবেশদের সাথে মিলিত হলে গভীর অরণ্যে একসাথে ‘হেলেদুলে’ জিকিরে রত থাকতেন, দীর্ঘ সময় জিকিরে মশগুল থাকার পর আত্মিক তৃপ্তি আসার পর তারা শান্ত হতেন।

 

আবু উমর হোসাইন বিন মনসুর হল্লাজ ছিলেন এক মহান দরবেশ ফকির। মরমী প্রেমের জীবন্ত কিংবদন্তি, শহীদত্মে পরম সত্তার প্রামাণিক সাক্ষ্যেরূপে যিনি সমুজ্জ্বল। তাঁর দেহের প্রতিটি অনু-পরমানুই যে সাক্ষ্যের জলন্ত প্রমান। ‘আনাল হক’ থেকে মনসুর হাল্লাজকে নাড়তে পারেননি কেউ। এমনকি ‘আনাল হক’ এর জন্য তার প্রাণ পর্যন্ত উৎস্বর্গ করতে দ্বিধাবোধ করেন নি।

মনসুর হল্লাজ একটি জিকিরেই মশগুল, যেন এতেই তার সকল প্রাপ্তি, সেই জিকিরে তার সকাল হয় সন্ধ্যা নামে; তা হলো- আনাল হক, আনাল হক, আনাল হক। ‘আনাল হক’ বলা থেকে সরে না আসার দরুন তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হলো, জল্লাদ আবু হারিস  তাঁর মুখে ঘুষি মারতেই নাক মুখ দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকলো। তারপর মারা হলো পাঁচশত চাবুক! দেহ নিথর, তাও একটিমাত্র বাক্য উচ্চারিত হয় ‘আনাল হক’।  এরপর হল্লাজকে ক্রুশে চড়ানো হলো, প্রথমদিন ছিন্ন করা হলো দুই হাত আর দুই পা, এই অবস্থায়ও একটি মাত্র কথা মুখে: ‘আনাল হক’! দ্বিতীয় দিন কাটা হলো তাঁর মাথা। উপস্থিত শিবলি, ওয়াসিতি ও অন্যান্য সূফি দরবেশরা চিৎকার করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। ‘আনাল হক’ ধ্বনি ধ্বনিত করে এ মর্তধাম হতে বিদায় নেন হল্লাজ।

 

 

শামস উদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে মালিকদাদ তাবরিজি। হিজরি ৬৪২ সালের ২৬ জমাদিউস সানি শনিবার সকালে তিনি কুনিয়ায় পৌঁছেন। অভ্যাস অনুযায়ী কুনিয়ায় চিনি ব্যবসায়ীদের সরাইখানায় (হোটেল) উঠে একটি কামরা ভাড়া নেন। তার কামরার দরজায় দুই থেকে তিন দিনার মূল্যের তালা ঝুলিয়ে দিতেন। তালার চাবিটি গায়ের চাদরের কোনায় বেঁধে কাঁধের ওপর ছেড়ে দিতেন। যাতে সাধারণ লোক ধারণা করে, তিনি বড় একজন ব্যবসায়ী। অথচ কামরার ভেতরে পুরনো মাদুর, ভাঙা কলসি ও খড়ের বালিশ ছাড়া অন্য কিছু থাকত না। সফরকালীন জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনটি পেশা অবলম্বনের কথা তার আত্মজীবনীতে পাওয়া যায়। যেমন পাজামা সেলাই, পরিচয় গোপন রেখে নির্মাণ শিল্পে কুলির কাজ এবং বাচ্চাদের কোরআন মজিদের তালিম দেয়া।

রুমির মতো বিশ্বজনীন কবিকে যিনি উদ্দীপিত ও প্রভাবিত করেছেন সেই সন্ত বা দরবেশ শামসের বাক্যের বাঁকে যে ইশারার ঝিলিক, যে দৃশ্য-সুষমা তা উপলদ্ধি বা ধারণ করার মতো শিষ্য পাওয়াও দুষ্কর। শামস তাবরিজি ছিলেন একজন ইরানি সুফি সাধক। নির্জনতাপ্রিয় এই জ্ঞানতাপস জীর্ণ পোশাকে ঘুরে বেড়াতেন একা। শামস তাবরিজি সম্পর্কে আজো বিশ্ব ইতিহাসে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত তেমন পাওয়া যায় না। মূলত, তিনি এমন এক সত্ত্বা যিনি নিজেকে নিজের মধ্য দিয়ে বিকশিত করতে চাননি। তিনি প্রকাশিত হয়েছিলেন তাঁর শিষ্য এবং পরম বন্ধু সুফি সাহিত্যিক, দার্শনিক কবি জালালউদ্দীন রুমীর  মধ্য দিয়ে।

 

তাব্রিজ তিনি ছিলেন সময়ের সূফিসম্রাট। তিনি ছিলেন নির্জনতা প্রিয় এবং একা। পরিব্রাজক ছিলেন বলে তাকে পারিন্দা বলা হতো। তিনি এক জায়গায় স্থির থাকতেন না। ঘুরতেন নানা স্থানে; পাহাড়, অরণ্য, মরুতে।

জালাল উদ্দীন মুহাম্মদ রুমি হতে শামসে তাব্রিজ  নিরুদ্দেশের পর বিচ্ছেদের বিষাদে ভেঙে পড়েন রুমী। তিনি এই বিচ্ছেদের সাগরে নিমজ্জিত হতে থাকেন এবং অন্তরের চোখ দিয়ে ভালবাসার মহাসমুদ্রে উপনীত হন তিনি।তাবরিজির সঙ্গে বিচ্ছেদের পর  তিন দশক ধরে রুমি কাব্য, গীতি ও নৃত্যকে ধর্মীয় চর্চায় আত্তীকরণ করেন।  ঘূর্ণিনৃত্যে পাক খেতে খেতে ধ্যান করতেন, মুখে মুখে কবিতা রচনা করে ফিরতেন। তাঁর এই অসাধারণ দরদী ভালবাসার মাখনে আচ্ছাদিত কাব্যের জন্য তিনি আনন্দ ও ভালোবাসার কবি হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন।

‘মালাকাতে শামসে তাবরেজ’ ও ‘দিওয়ান-ই শামস তাবরেজ’ গ্রন্থে তাঁর গুরুকে হারানোর যন্ত্রণার কথা বর্ণনা করেছেন। গুরু-শিষ্যের মধ্যে পবিত্র আধ্যাত্মিক বন্ধন ভেঙে গেলে একজন প্রেমিক শিষ্য কী যন্ত্রণা ভোগ করেন তার বর্ণনা পাওয়া যায়।

 

রুমির সঙ্গে যখন শামস তাবরিজির পরিচয় হয় তখন তাবরিজির বয়স ষাট, তবে তাবরিজ ছিলেন খুবই শক্তিশালী এক আধ্যাত্মিক পুরুষ।

তাঁকে লোকে ‘পাখি’ বলে ডাকতেন। মানুষের বিপুল কৌতূহল ছিল তাঁকে নিয়ে। খুবই রহস্যঘেরা ছিল তাঁর জীবন। এর  কারণ, তিনি এক জায়গায় বেশিক্ষণ স্থির থাকতেন না। দ্রুত অন্যত্র চলে যেতেন। মনে হতো তিনি যেন কী খুঁজছেন, কাকে যেন খুঁজছেন। তিনি সবসময় একজন পরম জ্ঞানী শিষ্য খুঁজতেন। তাঁর একজন যোগ্য উত্তরসূরি প্রয়োজন ছিল। শেষ পর্যন্ত রুমির মধ্যে  সেই গুণ খুঁজে পাওয়ার পর বোঝা গেল আসলেই তাবরিজি কি খুঁজছিলেন।

বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত হতে জানা যায়, রুমির ব্যক্তিত্ব ছিল সাংঘাতিক আকর্ষণীয়। ধীরে ধীরে তাবরিজির কাছে রুমির অসাধারণ ব্যক্তিত্বের কারণে আকর্ষিত হন তাবরিজি।

 

খাজা মইনুদ্দীন চিশতী আজমেরী, খোরাসানে তাঁর জন্ম। ১৫ বছর বয়সের মধ্যে পিতামাতা মারা যান। একদিন উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ফল বাগানে কাজ করছিলেন, ক্লান্ত মইনুদ্দিন বসে ছিলেন এমতবস্তায় আসেন এক ব্যক্তি, মইনুদ্দীন তাকে কিছু ফল দিয়ে আপ্যায়ণ করেন। ব্যক্তিটি ছিলেন বিখ্যাত সূফি দরবেশ শেখ ইবরাহিম খুন্দুসী। তিনি মইনুদ্দিনকে এক টুকরো রুটি খেতে দিলেন, এরপর তাঁর হৃদয়ে অন্যরকম অনুভূতি জাগ্রত হলো, হয়ে পড়লেন উদাসীন। সব ধনসম্পদ গরিবদের বিলিয়ে বের হয়ে পড়লেন সাধনার নেশায়।

 

খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী বোখারা থেকে নিশাপুরে আসেন। সেখানে চিশতীয়া তরীকার অপর প্রসিদ্ধ সুফি সাধক খাজা উসমান হারুনীর নিকট মুরীদ হন/শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তার সেবায় ২০ বছর একাগ্রভাবে নিয়োজিত ছিলেন। পরে উসমান হারুনী তাকে খিলাফত বা সুফি প্রতিনিধিত্ব প্রদান করেন। তিনি ইরাকের বাগদাদে বড়পীর গাউসুল আযম আবদুল কাদির জিলানীর সাহচর্যে ৫৭ দিন অবস্থান করেন। তার জীবনীতে বর্ণিত আছে যে, এ সময় আব্দুল কাদির জিলানী তাকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন, ইরাকের দায়িত্ব শায়েক শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীকে আর হিন্দুস্থানের দায়িত্ব আপনাকে দেওয়া হলো। তিনি আরব হতে ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান হয়ে প্রথমে লাহোর পরে দিল্লী হয়ে আজমিরে বসতি স্থাপন করেন।

 

লাহোরে তিনি শায়খ দাতা গঞ্জেবক্স লাহোরী এর দরবারে কিছুদিন সাধনা করে আজমীর আসেন। সেখান হিন্দু রাজা, হিন্দু তান্ত্রিক, যোগীরা তাঁকে নানা কৌশলে থামানোর চেষ্টা করেন। তিনি তাঁর ৪০ জন শিষ্য নিয়ে ইসলামের আমলগুলো করতে থাকেন এবং দলবদ্ধ হয়ে ধ্যান ও জিকিরে মশগুল থাকতেন। দরবেশ খাজা সাহেব ও তাঁর শিষ্যদের দেখতে হাজার হাজার হিন্দুরা চারপাশ থেকে আসতে থাকে এবং খাজা মইনুদ্দীন চিশতীর রেয়াজত ও অজ্দ এর তালে তালে তারা মগ্ন ও মোহিত হয়ে পড়ে। দলে দলে তার হাতে ইসলামের বায়াত গ্রহণ করতে থাকে এবং হিন্দুস্থান ইসলামের শামিয়ানা উড়তে থাকে।

 

সৈয়দ গোলামুর রহমান মাইজভাণ্ডারী। বাবা ভাণ্ডারী নামে যিনি সর্বাধিক খ্যাত। বাংলাদেশে বানিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম হতে ২৪ মাইল উত্তরে মাইজভাণ্ডার নামে ছোট্ট গ্রাম, এই গ্রামের ভৌগলিক অবস্থান যে কোন ভাবুক প্রাণের চোখে ধরা পড়ে। তার নৈসর্গিক শোভা, সারাটি দেহ শ্যামল শোভায় ঝলমল, তার পাশে ছোট প্রবাহিণী কুল কুল রবে বয়ে চলেছে, অফুরন্ত ঘন বনানীর কাজলকালো ছায়া তাকে বেষ্টন করে আছে গভীর মায়ায়। সেই ছবির মতো সুন্দর ছোট্ট গ্রামে গোলামুর রহমান মাইজভাণ্ডারীর জন্ম।

শিশুকাল হতে তিনি ছিলেন খুব অল্পভাষী। মাত্র ৮ বৎসর বয়সে শেষ রাতে ঘরের বারান্দায় আলো দেখে মাতা ঘুম থেকে উঠে বাইরে চেয়ে দেখে তাঁর ছোট্ট শিশু সালাত আদায় করছেন এবং তাঁর আলোয় চারপাশ আলোকিত হয়ে গিয়েছে। যুবক বয়সে বহদ্দার পাড়া চৌধুরি বাড়িতে জায়গীর থেকে তৎকালীন চট্টগ্রাম মোহছেনিয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়া শুরু করেন। যাদের ঘরে জায়গীর তাদের দেওয়া রাতের খাবার সাহরি হিসেবে গ্রহণ করতেন শেষ রাতে। সারারাত বহদ্দার বাড়ি জামে মসজিদে ইবাদতে মশগুল থাকতেন, এবং গৃহকর্তা জানতে পেরে কী করেন তা দেখতে গেলে; দেখতে পান সাদা পোশাকধারী অনেক ব্যক্তি তার পেছনে এক্তেদা করছেন। তিনি ছিলেন মূলত ‘ছায়েমুদ্দাহার’ ও ‘কিয়ামুল লাইল’ তথা সারাবছর রোজা পালনকারী ও সারারাত দাঁড়িয়ে সালাত আদায়কারী সাধু পুরুষ। এই ঘটনা বহদ্দরবাড়ি জানাজানি হয়ে গেলে তিনি অল্পদিনের মধ্যে সেখান থেকে প্রস্থান করেন।

 

তিনি তাঁর মিতামহ/মুর্শিদের প্রতি এতোটা প্রেমাসক্ত ছিলেন যে, পরীক্ষাকক্ষ হতে কাগজ কলম ছুড়ে ফেলে একেবারে চলে আসেন। এবং সর্বদা নিজ মুর্শিদের পানে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন। দিন দিন অবস্থা আরো ভয়াবহ রূপ নেয়; রোদ, বৃষ্টি বা রাত, দিন সর্বদা মুর্শিদের দিকে অপলক দৃষ্টিতে ছেয়ে থাকে। ঘরে বন্ধি করে রাখলে এমন অবস্থা হয় সকলে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।

 

এরপর আসে গভীর অরণ্যে সাধনা কাল। একেক সময় একেক স্থানের গভীর জঙ্গলে গিয়ে ধ্যানে মগ্ন থাকেন। চট্টগ্রামের পূর্ব পার্বত্য পাহাড়, দেয়াঙ্গের পাহাড়, সীতাকুণ্ড পাহাড়, রাঙ্গুনিয়া পাহাড়, খিরাম পাহাড়, উত্তরা পাহাড় সহ চট্টগ্রামের প্রায় সব পাহাড়েই তিনি প্রভুর ধ্যান সাধনায় মগ্ন থাকতেন। তাঁর ভ্রাতাগণ তাঁকে খুজে আনতেন সুযোগ বুঝে তিনি আবার চলে যেতেন। তিনি পড়ে ছিলেন নিরবতার মোহর, দীর্ঘ ২৩ বৎসর তেমন কোন কথাই বলেন নি, শুধুমাত্র ইশারা করতেন। গহীন জঙ্গলে, পাহাড়-পর্বতে বহু কারামতগুলো তাঁর জীবনীতে পরিলক্ষিত হয়। অতঃপর যখন শাহ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী ধরাধাম ত্যাগ করার সময় হলে খলিফা পাঠিয়ে তাঁকে গহীন জঙ্গল থেকে দরবার নিয়ে আসার জন্য পাঠান, আসার কিছুদিন পর আবার তিনি গহীনে হারিয়ে যান। হযরত আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর পর তিনি মাইজভাণ্ডার সিংহাসনে আরোহন করেন। তরিকার ব্যাপক প্রসার ঘটান, বার্মা, ভারতসহ নানা দেশ হতে আশেকগণ তার কাছে চুম্বকের ন্যায় ছুটে আসতে থাকে।

 

উল্লেখিত সূফি দরবেশগণ  ছিলেন জামানার শ্রেষ্ঠ ফকির। তবে তাঁদের কাজের ধরন, প্রেক্ষাপট, অবস্থা ছিলো ভিন্নতর।

কেউ ছিলেন রহস্যে ঘেরা মহাপ্রতিম, কেউবা আপন প্রভুকে ক্বলবে ধারণ করে ‘আমিই সত্য’ প্রতিষ্ঠার জন্য অন্তর্ধান, অন্যজন পাখির মতো দ্রুত পরিব্রাজক হয়ে ইশকে এলাহিতে মগ্ন হয়ে নিজ শিষ্যের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ, বা নিজ মুর্শিদ কর্তৃক আপন হৃদয়ের সঠিক ঠিকানা পাওয়া কোন  মহামণ্ডিত নিজ কিতাব কালাম ছেড়ে দিয়ে মুর্শিদ প্রেমে বিভোর হয়ে পড়া, অন্যজন বহু গুরুর শিষ্যত্ব লাভের পর মইনুদ্দিন নাম ধারণ করে উপমহাদেশের ইসলামের ঝাণ্ডা তুলে ধরেন, অন্যজনতো নিজেকে ফানা করে ভাণ্ডারের চাবি নিয়ে ঘোষণা করেই দিলেন, “আমি স্রষ্টার গুণে গুণান্বিত, প্রকৃতির ন্যায় উদায়।”

 

এই সকল পীর-ফকির-দরবেশগণের প্রত্যেকের আত্মার মধ্যকার প্রভু-প্রেমের ঝংকার উপলদ্ধি করতে পারার অমৃত সুধা ভিন্ন, কিন্তু উদ্দেশ্যে একই। তাই তো, ইবনে আরাবির ওহদাতুল ওজুদের উদ্দেশ্যে হেলে-দুলে জিকির করা ও প্রত্যেক কিছুতে প্রভুকে খোঁজ করা, প্রভু জ্যোতিকে মনসুর হল্লাজের হৃদয়ে ধারণ করে আনাল হকে ফানাহ্ হওয়া, তাব্রিজের পরিব্রাজক হয়ে গভীর অরণ্যে প্রভুর ইয়াদগারী, রুমির ঘূর্ণায়মান নৃত্যের তালে তালে জিকির করে হৃদয়ে প্রভু প্রেমের প্রশান্তি লাভ করা, মঈনুদ্দীন চিশতির শিষ্যদের নিয়ে জিকিরে এলাহিতে মগ্ন হওয়া, সুকৌশলে অমুসলিমদের মুসলিমে পরিণত করে প্রভুর ইয়াদগারীর তৃপ্ত করা এবং বাবা ভাণ্ডারীর সেমার মাধ্যমে জিকরে ইলাহিতে মশগুল হয়ে আশেকদের হৃদয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করে প্রভুর সুধা পানের প্রাপ্তিই হলো প্রত্যেকজন সূফি দরবেশের ভিন্ন কিন্তু একই উদ্দেশ্য সাধনে আসা পরম পাওয়া। আর এই পরম পাওয়ার চিরতৃপ্ত হওয়ার মহুর্ত উদযাপনে প্রভু সমীপে অজ্দ, জিকির, সামা, নৃত্যে মশগুল থেকে যে উল্লাস করা হয় সেই উল্লাসই হলো; ফকির উল্লাস।

মতামত
লোডিং...