মাধুডাঙাতীরে : হাসান রোবায়েত

প্রকাশনী: ঐতিহ্য ; প্রকাশকাল: ২০২০ ; মুদ্রিত মূল্য: ১৩০

ব্যক্তিগত অনুভূতি দ্বারা সমালোচনা শুরু করাটা মহত্ত্বের আলামত বলে জানি। কারণ, একজন সমালোচকের ব্যক্তিক অনুভূতির পথ ধরেই সমালোচনার রাস্তা আগায়।

কিছুদিন আগেও বর্তমান মানে জীবিত কবিদের কবিতা খুব একটা পড়তাম না, যদিও বা প্রবন্ধমাত্রই অজ্ঞান! বই পড়ার তুলনায় জীবিত কবিদের কবিতার বই শতে এক ভাগও হবে না, নিঃসন্দেহে। কিন্তু, হাসান রোবায়েতের কবিতা পড়ার পর একটা পরিবর্তন আসলো। একজন কাঠখোট্টামার্কা পাঠককে কবিতায় নিবিষ্ট করে রাখার জন্য যত উপাদান দরকার তার সবকিছু আছে হাসানের কবিতায়।

 

২০১৬-১৭ সালে রচিত ৩৯টি কবিতার সমাবেশ ঘটেছে মাধুডাঙাতীরেতে। এ কাব্যগ্রন্থের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রথমেই পাঠককে মায়াজালে আঁটকে ফেলবে। প্রথম কবিতার শেষে যখন আপনি উচ্চারণ করবেন: আমি কি আমি-ই নাকি পর / একতারে লুকানো ডাহুক! / অনর্থে প্রিয় কোনো সুরে / বেজে যায় আমাদের মুখ– তখন একটা নিবিড় ঘোরলাগা কাজ করবে অবশ্যই। এই ঘোরলাগা আস্তে আস্তে চেনাবে মাধুডাঙাতীরের জনপদ।

 

‘তোমার মুখের থেকে বেশি / মহাকাল নাই পৃথিবীতে’র মতো উচ্চারণে যখন অতল প্রেমের সজল অভিব্যক্তি নিয়ে ভাবতে মন টানবে ঠিক তখনই ‘ভাষার অধিক স্বীয় ভূমি / কখনো কি ছিল আমাদের!’ উচ্চারণ আপনাকে ভাষার দার্শনিক কূপে ফেলে দেবে। পুরো কাব্যগ্রন্থজুড়েই ভাষার দার্শনিক ব্যাপার খানিক পরপর এসেছে। কিছু উদ্ধৃতির লোভ সামলানো দায়:

কী যেন বলার ছিল, ভাবি

ফিরে এসে আমি পুনরায়

ভাষার চূড়ায় বসে পাখি

সারাদিন ধুলা ঝেড়ে যায়-

(১২ পৃষ্ঠা)

 

তবুও দূরের আলো আসে

সন্ধ্যা ও নিভৃতির নিচে

বহমান আমি ক্ষণকাল

জননীর চেনা দহলিজে-

(১৫ পৃষ্ঠা)

 

ভাষার বাইরে সবই ফাঁকা

সন্দেহ, দ্বিধা নিরুপায়

মানুষের ঘর ফাঁকা হলে

হাওয়ায় সেসব রটে যায়-

(২৩ পৃষ্ঠা)

ঋতুর ওপারে নদীতীর

চাল দেয় কী গভীর পাশা!

নিখিল তোমাকে ভেবে যাই

বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভাষা

(২৬ পৃষ্ঠা)

 

ভাষার ব্যাপারে এমন দার্শনিক জটলার ভাবনাগুলো কবিতায় একেবারে ‘শিমুলের তুলা’র মতো তুলতুলে ভঙিমায় নিয়ে আসা তাঁর পক্ষেই সম্ভব, যিনি সহজাত কবি।

 

তাক লাগানোর মতো, শরীরে ঝিম সৃষ্টি করার মতো, হঠাৎ দাঁড়িয়ে ভাবনার জগতে ডুব দেয়ার মতো স্তবক আছে যথেষ্ট, কিন্তু মাধুডাঙাতীরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য এখানে মুদ্রিত নয়। তাহলে কোথায়?

যেখানে কবি কাব্যকে দাঁতভাঙা শব্দের শব কিংবা পাণ্ডিত্যের পোশাক পড়ানোর হাঙ্গামায় লিপ্ত নেই- কোনোদিন কবিতা পড়েনি এবং কবিতার শ্রেষ্ঠতম পাঠক উভয়কেই হঠাৎ পড়া শীতে ঠোঁটের চামড়ার মতো টানতে সক্ষম এই কাব্যগ্রন্থ।

এবং আমি মনে করি, মাধুডাঙাতীরের প্রধান বৈশিষ্ট্য এখানে কেবল মুদ্রিত নয়, খোদিতও।

বঙ্কীমীয় কিংবা মান্নান সৈয়দীয় প্রবন্ধের ঘানি টানতে টানতে যখন সরলতার আশ্রয় খুঁজি তখন আমাকে হাসান রোবায়েত আশ্রয় দেবেন তাঁর মাধুডাঙাতীরে ভ্রমণের আহ্বানে; কতদিন? আমরণ।

মতামত
লোডিং...