মহাযজ্ঞে ধ্রুবক

ঈশ্বর কী আদৌ আছেন? ঈশ্বর কী সত্যিই আছেন? যার কোন ভিডিও নেই তাকে আমি কিভাবে বিশ্বাস করি? আর তাই এখন আমি নাস্তিক। এটুকু লিখে একটা ম্যাসেজ কয়েকদিন আগে আমার ফেসবুক ইনবক্সে পাঠায় ক্লাস নাইনে পড়ুয়া নিতান্তই বাচ্চা এক ছেলে! আমিও বয়সে বাচ্চা বটে। কিন্তু তার এই প্রশ্ন শুনে ঈশ্বর কি আসলেই আছে কিনা তা নিয়ে আমার মাথায় একটা আইডিয়া আসে। আইডিয়াটা একটু ব্যাখ্যা করতে হবে। কিন্তু তার আগে একটা ভূমিকা দেয়া দরকার।

আমরা আমাদের পরিচিত পৃথিবীটাকে যতটা গোছালো দেখি সেটা কিন্তু এতটা গোছালো ছিলো না। প্রত্যেকটি পরতে পরতে অদ্ভুত এক শক্তি সবকিছুকে সঠিকভাবে পরিচালনা করছে। কিন্তু বলাটা যতটা সোজা ব্যাখ্যা করা ততটাই কঠিন। বাঙালীর স্বভাব হলো কোন কিছু একটু জটিল হলেই এড়িয়ে যাওয়া। আর তাতে যেটা ঘটে তা হলো, সঠিক জ্ঞানের চর্চা হয় না। ধরুন, দাবী করা হয় কোরআন এমন একটি বই যেটিতে কোন বৈজ্ঞানিক ভুল নেই। এটা নিয়ে কথা বলাটা জটিল। কারণ হাজারখানেক আগে লেখা একটি বইয়ে কোন ভুল নেই এটা দাবী করতে হলে আপনার সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর বিষয়ে জ্ঞান থাকা জরুরী। কিন্তু আমরা মুখে বলতে খুবই পছন্দ করি, এখানে কোন ভুল নেই। কিন্তু যদি সত্যি সত্যি কোন অসামঞ্জস্যতা নিয়ে আসে তবে কি আপনি সমাধান করতে পারবেন? বেশীরভাগ বাঙালী মুসলমানই পারবে না। কারণ তার জ্ঞান মুখে বলা পর্যন্তই। এই নির্ভুলের তাৎপর্যতা নিয়ে জটিল চিন্তা সে কখনই করেনি।

 

এখানকার ব্যাপারটাও এরকমই। কোটি কোটি বছর ধরে বলা হচ্ছে একজন অতি-ক্ষমতাধর আছেন যিনি পুরো বিশ্ব চালাচ্ছেন। কিন্তু সত্যিই কি এই দুনিয়াটা চালাতে অতি-ক্ষমতাধর কারো প্রয়োজন আছে কি? আমরা তলিয়ে ভাবিনি। এই তো সকালে উঠছি, ব্রাশ করছি। কাজে যাচ্ছি, আয় করছি, খাচ্ছি এবং বেড়ে উঠছি। মাঝখানে এই ক্ষুদ্র জীবনকে সহজ করতে আমরা মানুষেরা মিলেই বের করছি অবিশ্বাস্য সব প্রযুক্তি। বিজ্ঞানশাস্ত্র আমাদের সাহায্য করছে। যেটি আবিস্কার করেছি আমরাই। এখানে অতি-ক্ষমতাধর কারো কি থাকার প্রয়োজন আদৌ আছে? নাকি এই ধারণাটা আসলে ভুয়া?

 

তবে এখন এই জগতের কোটি কোটি জটিল বিষয় থেকে মাত্র একটা বিষয় নিয়ে বাৎচিত করা যাক। তবে আগেই বলে রাখি, এখন যা লিখছি তা বুঝতে হলে আপনাকে অন্তত এসএসসি লেভেল পর্যন্ত যেতে হবে। আমরা যারা নাইন-টেনে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হয়েছিলাম তারা একটা শব্দের সাথে বেশ পরিচিত। তা হলো ‘ধ্রুবক’। ধ্রুবক কী বা কেন? এসব না জানলেও সবাই আমার মত একটা জিনিস ঠিকই জানে যে ধ্রুবকের একটি নির্দিষ্ট মান রয়েছে। যা অপরিবর্তনীয়। এ যেমন আমার ভাই তানভীর ধ্রুব তো তার বায়োতে লিখে রেখেছে, মহাকর্ষীয় ধ্রুবকের মান পরিবর্তন হবে কিন্তু তানভীর ধ্রুবের মান পরিবর্তন হবে না। তবুও যারা জানেন না তাদের বলি, ধ্রুবক হলো এমন একটি বাস্তব সংখ্যার উপস্থিতি যার মান সবসময় অপরিবর্তনীয় (উইকিপিডিয়া থেকে টুকে দিলাম!)। আরো সহজভাবে বলতে গেলে, গণিতের একটি বিশেষ নিয়ম হচ্ছে ধ্রুবক। যেটির মান কখনই পরিবর্তন হয় না। যেমন: পৃথিবীড় প্রত্যেকটি বস্তুকে পৃথিবীর কেন্দ্রে থাকা অভিকর্ষ তার নিজের দিকে টানছে। মানে আপনি যখন একটা বস্তু হাত থেকে ফেলেন তখন সেটা নিচে পরে যায় কেন? কারণ অভিকর্ষ। মানে পৃথিবীর কেন্দ্রে থাকা অভিকর্ষ বল সেটিকে টানছে। মজার ব্যাপার হলো, অভিকর্ষ বল কিন্তু পৃথিবীর সকল বস্তুকে সমানভাবে টানছে। রাস্তা দিয়ে রিক্সা যাচ্ছে সেটিকে যেমন টানছে, আপনি যেমন হেটে যাচ্ছেন আপনাকেও একই মাপের শক্তি দিয়ে টানছে। আর এই টানের কারণেই রিক্সাকে সামনে নিতে রিক্সাওয়ালার বল প্রয়োগ করতে হয়। শক্তির বিপরীতে কাজ করতে হলে তো শক্তি দিতেই হবে!

ধ্রুবকের সবচেয়ে সহজ উদাহরণ হলো- মহাকর্ষীয় ধ্রুবক। এটির নাম শোনার সাথে সাথেই সদ্য বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হওয়া পোলাপানের মাথায় এর মান ঝলক মেরে গেছে। মহাকর্ষীয় ধ্রুবক হলো মহাকর্ষীয় শক্তির গানিতিক প্রকাশ, যেই শক্তি দিয়ে পৃথিবীর প্রত্যেকটি বস্তু একে অপরের দিকে টানছে। মহাকর্ষীয় ধ্রুবককে সাধারণত ইংরেজি অক্ষরের বড় হাতের G দিয়ে প্রকাশ করা হয়। এর মান হলো সিক্স পয়েন্ট সিক্স সেভেন ইন্টু টেন টু দি পাওয়ার ইনভার্স এলাভেন। আরো সহজভাবে বলি, ১ এর পিঠে ১১ টি শূন্য বসালে যে সংখ্যাটি পাওয়া যায় তা হলো ‘এক লক্ষ কোটি’। এই সংখ্যা (এক লক্ষ কোটি) দিয়ে ৬.৬৭ সংখ্যাটিকে ভাগ করলে যে ভাগফল পাওয়া যায় সেটাই হলো মহাকর্ষীয় ধ্রুবক। ভাবতে পারছেন এই ধ্রুবকের মান কত ক্ষুদ্র! আরে আমাদের আদর্শ সড়ক মোড়ের নশুর মুদি দোকানের ক্যালকুলেটরে এই হিসেব চাপতে গিয়ে ক্যালকুলেটরটাই নষ্ট হয়ে গেছে!

নিউটনের একটা বিখ্যাত সূত্র হলো ‘মহাকর্ষ’ সূত্র। আমি কদিন আগে মুখস্থ করেছি। মহাবিশ্বের যে কোন স্থানে থাকা দুইটি (ভারবিশিষ্ট) বস্তু একে অপরকে বল দিয়ে আকর্ষণ করে। একেই বলে মহাকর্ষ বল। এই বল কতটুকু তা বের করা খুবই সোজা। নিউটনের সূত্রানুযায়ী, ‘মহাকর্ষীয় বল দু’টি বস্তুর ভরের গুনফলের সমানুপাতিক ও তাদের মধ্যকার দূরত্বের বর্গের বস্ত্যানুপাতিক’। গাণিতিক সমীকরণে লিখতে হয়, এফ ইক্যুয়েলটু জি (G) ইনটু এম (m) ডিভাইডেট বাই আর (r) স্কয়ার। এখানে G-টা হলো সেই মহাকর্ষীয় ধ্রুবক যার মান আমরা আগেই বলেছি।

এবার একটু ভাবুন, আমরা মানুষেরাও একপ্রকার বস্তু। কিন্তু কই আমরা তো একে অপরের প্রতি আকর্ষণ বল অনুভব করি না! কই আমার অদূরে সিল্কি চুলের দুই বিনুনিওয়ালা মেয়েটা দাঁড়িয়ে থাকলেও তো এই মহাকর্ষীয় বলের প্রভাবে সে আমার কাছে চলে আসে না! কেন আসে না? আসলে মহাকর্ষীয় বল এক্ষেত্রে খুবই দুর্বল। তাই আমরা বলটা অনুভব করতে পারি না। আগেই তো বলেছি, এর বলের মান এতই ক্ষুদ্র যে তা বের করতে গিয়ে নশু আঙ্কেলের ক্যালকুলেটর নষ্ট করে ফেলেছি।

আচ্ছা যদি এর মান আরেকটু বেশি হতো? অর্থাৎ এতই কম প্রভাব যে বিনুনি করা মেয়েটা কাছে আসা দূরে থাক টেরই পাই না। তাহলে বেশি হলে কিইবা ক্ষতি হতো! আচ্ছা, এই বিষয়ে বলার আগে আমরা বরং বেশি মানের একটা বলের ধ্রুবক নিয়ে আলাপ করি।

যে কোন দু’টি বস্তুর মধ্যকার আকর্ষণ বল যেমন নিউটনের সূত্র দিয়ে বের করা যায় ঠিক তেমনি দুইটি চার্জের মধ্যকার আকর্ষণ বল বের করা যায় কুলম্বের সূত্র দিয়ে। কুলম্ব মশাই নিউটনের সূত্র মুখস্থ করে চার্জের উপর খাটিয়ে দেখলেন, বাহ ঠিকই খাটে। নিউটনের মহাকর্ষীয় বলের সূত্রের m এর জায়গায় q বসালেই হয়ে যায়। মানে m হলো বস্তুর ভর আর q হলো চার্জের ভর। কিন্তু এই সূত্রটা প্রকাশ করার আগে তার আরেকটি ধ্রুবকের মান বের করতে হলো। কুলম্বের সূত্রে তাকে K দিয়ে প্রকাশ করা হয়। K এর মান এত বড় যে, এটির সঠিক মান বের করতে হলে 8.988 এর সাথে প্রায় দশ কোটি দিয়ে গুন করতে হবে!

মহাকর্ষীয় ধ্রুবক G এর তুলনায় এটা কয়েক কোটি গুন বৃহত্তর। আচ্ছা এবার ভাবুন এই মানটা বা এই প্রভাবটা যদি চার্জের বদলে মহাকর্ষীয় বলে থাকতো, তবে কী হতো? ধরুন, আপনি গরম চায়ে আলতো করে চুমুক দিলেন। চায়ের কাপ আপনার ঠোটে এইট পয়েন্ট নাইন ইনটু টেন টু দি পাওয়ার নাইন গতিতে আকর্ষণ করতো। পৃথিবীর কিছুই একে আলাদা করতে পারতো না। ধরেন এটা আলাদা করতে আসলো একটা ক্রেন। সেই ক্রেনও তো ভরবিশিষ্ট একটি বস্তু। মহাকর্ষীয় বলের আকর্ষনও তো তার মধ্যে বিদ্যমান। যেই আকর্ষণে গরম চা কাপ সমেত আপনার ঠোটে আটকে আছে সেই একই পরিমান বল নিয়ে ক্রেনও আপনাকে আকর্ষণ করতো। একে একে পৃথিবীর সব কিছু কাজে লাগালেও লাভের লাভ কিছুই হতো না। অথবা ধরুন, বাথরুমে কমোড থেকে উঠতে গেলেন। কমোড আপনার শরীরের সাথে উঠে চলে আসতো। আপনার শরীর আলাদা করে ফেললেও সেটা আলাদা হতো না। নিউটন এই বিষয়টি সবার আগে প্রত্যক্ষ করেন। এজন্য উনি এই প্রাকৃতিক বিষয়টিকে ধ্রুবকের মধ্যে সাব্যস্ত করেন। কারণ উনি জানতেন শুধু ঢাকার মিরপুরের রাস্তা কেন পুরো পৃথিবীর নিয়ম পরিবর্তন হলেও প্রকৃতির নিয়ম পরিবর্তন হবে না।

তবে উপরের কথাগুলো থেকে ভালো করে চিন্তা করলে বোঝা যায় ধ্রুবকের মান এত ক্ষুদ্র বা চার্জের ক্ষেত্রে এত আকর্ষণ বল বেশি হবার কারণ কিন্তু একটাই। প্রকৃতিতে যেন কোন বিশৃঙ্খলা না ঘটে। কোন বস্তুর যেন তার নিজ-কর্মে ব্যাঘাত না ঘটে। এখন আমার প্রশ্ন হলো, কয়েক হাজার কোটি বছর আগে এই মহাবিশ্বের যখন যখন কিছুই ছিলো না ঠিক তখন প্রকৃতির অনিয়ম রুখতে, পৃথিবীর সব বস্তুর কাজের গতি ঠিক রাখতে এত সুক্ষ্মভাবে ধ্রুবকের মান কে নির্ধারণ করেছিলেন?

কেইবা জানতো এই মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র একটি গ্রহে প্রাণের সঞ্চার হবে? যেখানে প্রকৃতির সকল নিয়ম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সামান্য ধ্রুবকের মান নির্ধারণ করার প্রয়োজনীয়তা কে বোধ করেছিলেন? এত বড় মহাযজ্ঞের পরিকল্পনাটা কার ছিলো?

মতামত
লোডিং...