নজরুল : এক তুখোড় প্রবন্ধ শিল্পী

শ্রীশচন্দ্র দাস বলেন, “কল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তিকে আশ্রয় করিয়ে লেখক কোন বিষয়বস্তু সম্বন্ধে যে আত্মসচেতন নাতিদীর্ঘ সাহিত্য-রূপ সৃষ্টি করেন, তাহাকেই প্রবন্ধ বলে।” প্রবন্ধ দুই ধরণের। এক, তন্ময় বা বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধ। এই ধরণের প্রবন্ধতে সুচিন্তার একটি সীমারেখা নির্ধারিত থাকে। এখানে ‘গরু’ নিয়ে লিখতে গিয়ে ‘গোপালক’ সম্বন্ধে  একটি কথাও বলা যাবেনা। এই ধরণের প্রবন্ধে লেখকের চিন্তাশীলতা এবং বুদ্ধির প্রখরতা পাঠকের মস্তিস্কের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, হৃদয়ের সাথে নয়। আরেক ধরণের প্রবন্ধ হলো, মৃন্ময় বা ব্যক্তিগত প্রবন্ধ। এই প্রকার প্রবন্ধে লেখকের ব্যক্তিচিন্তার চেয়ে ব্যক্তিহৃদয়ই প্রধান। প্রবন্ধের এই শ্রেণী বিভাজন দেখলে সহজেই বুঝতে পারি যে, নজরুল-প্রবন্ধ দ্বিতীয় প্রকার অর্থাৎ, মৃন্ময় প্রবন্ধের অন্তর্ভুক্ত। নজরুল-প্রবন্ধে ভাব-রস, অলংকার, উপমা, উৎপ্রেক্ষার ব্যবহার এতই বেশি যে, প্রবন্ধগুলো মানুষের মনের গভীরে গিয়ে আঘাত করে। সমালোচকদের মতে, প্রবন্ধের এই ভাব-রস, অলংকার, উপমা, উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদি বিষয়ের আধিক্যই নজরুল-প্রবন্ধের সবচেয়ে বড় ত্রুটি। নজরুল-প্রবন্ধের ‘ত্রুটি’ সম্পর্কে ড. সুশীল কুমার গুপ্ত বলেন, “নজরুলের রচনার সবচেয়ে বড় ত্রুটি মননশীলতার স্বল্পতা ও শিল্পসৌষ্ঠব সম্পর্কে আবেগ প্রাবল্যজনিত উদাসীনতা ও অসতর্কতা।” ঠিক এই কারণেই বলা হয়, “নজরুল জাত প্রাবন্ধিক না।”

 

নজরুল-পূর্বে অনেকেই মৃন্ময় বা ব্যক্তিগত প্রবন্ধ রচনা করেছেন। যেখানে গুরুর আসনে রয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র এবং হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রবীন্দ্রনাথ  ঠাকুরসহ অনেকেই আছেন শিষ্যের আসনে। কিন্তু নজরুলের রচনাশৈলীর সাথে এঁদের কারোরই কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।  নজরুলের ‘অনিয়ম, উচ্ছৃঙ্খল’ ভাব তাঁর প্রবন্ধেও প্রচুরভাবে প্রভাব ফেলেছে। তিনি বঙ্কিমের মৃন্ময় ধাঁচের প্রবন্ধে স্বামী বিবেকানন্দের বীর রসকে মিশ্রিত করে নিজের এক ভিন্ন ধারা সৃষ্টি করেছেন। প্রবন্ধের এই ধারার তিনি একচ্ছত্র অধিপতি। তাঁর প্রবন্ধের ধারায় আরো অনেকের ছায়া পাওয়া যায়, যার মধ্যে সখারাম গনেশ দেউস্কর (১৮৬৯-১৯১২) এবং ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় (১৮৬১-১৯০৭) অন্যতম। এই বিশেষধারা সৃষ্টি করাটা তাঁর একধরণের কৌশলও বটে।

নজরুল জানতেন যে, বাঙালি ভাবপ্রবণ জাতী। এদেরকে ভাবের সাগরে ডুবিয়ে রেখেই সবকিছু আদায় করে নিতে হবে। তাই, বস্তুগত প্রবন্ধকে প্রাধান্য না দিয়ে তিনি ব্যক্তিগত প্রাধান্যকেই নিজের হাতিয়ার বানিয়েছেন। সৃষ্টি করেছেন ভাবের সাগর। যেখানে নিজের ইচ্ছেমত বেদনা, আশা, হাহাকার, বিদ্রোহ সবগুলোর রসকে মিশ্রিত করেছেন। আর এই রসই বাঙালির জন্য হয়েছিল সুধাসম।

 

নজরুল-প্রবন্ধের প্রায় সবগুলো প্রবন্ধই পত্রিকার সম্পাদকীয় অংশ। যেখানে  ফুটে ওঠে সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটনার আলোচনা-সমালোচনা। এই ধরণের প্রবন্ধ দিন বদলের সাথে সাথে অনেকটাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। ২০ বছর আগের প্রবন্ধ আজকের দিনে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় নাও হতে পারে। তাই এগুলোকে সাহিত্যের মধ্যে গণনা করা যায় না। কিন্তু নজরুল-প্রবন্ধ ভিন্ন। প্রায় শত বছর পুরনো লেখাগুলো আজো যেন তরুণ। তাই বলা হয়, Literature that does not last is journalism, journalism that lasts is literature. ‘যে সাহিত্য টিকে না তা সাংবাদিকতা, আর যে সাংবাদিকতা টিকে তা সাহিত্য’। আর আমরা দেখতে পাই, নজরুলের সাংবাদিকতার অধিকাংশই টিকে গেছে। শুধু টিকে গেছে তা-ই না, আজ পর্যন্ত এগুলো জীবন্ত ও শাশ্বত।  নজরুল-প্রবন্ধের শাশ্বত দিক সম্পর্কে ড. সুশীল কুমার গুপ্ত বলেন, “তাঁর রচনার শ্রেষ্ঠগুণ যৌবনধর্ম, অন্তর্মুখী ভাববেগের অকৃত্রিমতা ও কাব্যধর্মী ওজস্বিতা। কোনো কোনো রচনায় তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে রোমান্টিক ভাবাদর্শের বিবাহ বন্ধনে অসামান্য শক্তি ও উদ্দীপনা সঞ্চারিত। প্রধানত সাংবাদিকতার উদ্দেশ্যে রচিত হলেও নজরুলের কতগুলো প্রবন্ধ যে সয়াময়িকতার গণ্ডি পেরিয়ে আজও টিকে আছে তাতে অবশ্যই তাদের সাহিত্যগুণের অভ্রান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়।”

 

জাতির বিবেকখ্যাত সাহিত্যিক আবুল ফজল বলেন, “ধূমকেতুর সম্পাদক হিসাবে নজরুল যখন তাঁর অনলবর্ষী সম্পাদকীয় প্রবন্ধমালা রচনা করেন, তখন তা’ একাধারে বাংলা সাহিত্যে প্রকাশ ভঙ্গির সবলতা এবং বিদেশী রাজ-শক্তির বিরুদ্ধে তরুণ সমাজের প্রচণ্ডতাকে সার্থক-ভাবেই রূপদান করতে সক্ষম হয়েছিল।” ভাষার বহুল অলংকারিতা, ভাবোচ্ছ্বাস, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপকতা এগুলোই নজরুল-প্রবন্ধের সবচেয়ে বড় ত্রুটি। ‘জাত প্রাবন্ধিক’ হতে না পারার অন্যতম প্রধান কারনও এগুলোই।

 

কিন্তু নজরুলের এইসব ব্যবহার তাঁর সার্বভৌম কবিসত্তারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। নজরুলের মত রবিন্দ্রনাথের প্রবন্ধেও কবিসত্তা ভরপুর ছিল। সুখরঞ্জন মুখোপাধ্যায় বলেন, “রবীন্দ্রনাথ প্রাবন্ধিক বা প্রবন্ধ-বিজ্ঞানী নন, তিনি প্রবন্ধ শিল্পী। শিল্পীর থাকে রূপ-রচনার আবেগ ও কৌশল এই আগ্রহ ও কৌশল তিনি যে গদ্য রচনাগুলোতে রূপ দিয়েছেন, সেগুলোও তাই যথাবিধি শিল্পকর্ম হয়ে উঠেছে।” নজরুলের বেলায়ও আমরা ঠিক এই কথাটাই বলবো। তিনি জাত প্রাবন্ধিক বা প্রবন্ধ-বিজ্ঞানী নন, তিনি একজন তুখোড় প্রবন্ধ শিল্পী।

 

তথ্যসূত্র

১.  সাহিত্য-সন্দর্শন : শ্রীশচন্দ্র দাশ।

২.  প্রাগুক্ত

৩.  ড. সুশীল কুমার গুপ্ত : নজরুল চরিতমানস।

৪.  প্রাগুক্ত

৫.  সাহিত্যশিল্পী আবুল ফজল : আনোয়ার পাশা।

৬.  গদ্য-শিল্পী রবীন্দ্রনাথ : সুখরঞ্জন মুখোপাধ্যায়।

মতামত
লোডিং...