হাঙর নদী গ্রেনেড : সেলিনা হোসেন

সাদিয়া তাবাচ্ছুম

সত্তরোত্তর অধুনা বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস লেখা হয়েছে বেশ ক’টি। স্বনামধন্য বাঙালি লেখিকা সেলিনা হোসেন-এর ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ তন্মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের কাতারে একেবারে শীর্ষে। এ উপন্যাসটির আলোকে নির্মিত হয়েছে বিখ্যাত বাংলা সিনেমাও।

 

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত উপন্যাসটিতে নায়িকা হল এক বুড়ি। জীবন পরিক্রমার শেষপ্রান্তে এসে সাক্ষী হয়েছে দেশমাতার মুক্তিসংগ্রামের। মুক্তিযোদ্ধের জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে যে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে গেছে, তা বর্তমান যুগের জন্যও নিঃসন্দেহে প্রেরণার বাতিঘর।

বুড়ি নামে সম্বোধিত হতে সে মোটেই পছন্দ করত না। সে ছিলো চঞ্চল ও উদাস। সবসময় আকুল হয়ে থাকত নিজ গ্রামের বাইরের পৃথিবীটায় বিচরণের। গফুরকে বিয়ে করতে সম্মতি দেওয়ার পেছনে এটিই ছিল আসল কারণ। কিন্তু বুড়ির ইচ্ছে অপূর্ণই রয়ে গেল। বাপের বাড়ির ঠিক দক্ষিণ দিকটাতেই তার শ্বশুরালয়। তবুও যখন গফুর তাকে নৌকায় করে ঘুরতে নিয়ে যেত, তার আনন্দের যেন সীমা থাকত না। বুড়ির স্বামী গফুর বয়সে তার থেকে বেশ বড়ো হলেও বুড়িকে সব সময় খুশি রাখতে সচেষ্ট থাকত।

 

গফুরের সাথে বেশ আনন্দেই কাটতে থাকে বুড়ির দাম্পত্য জীবন। কিন্তু তার আর এসবে মন ভরে না। সে চায় মা হতে। বিয়ের পর অনেক বছর কেটে গেলেও বুড়ি তখনও সন্তানের মুখ দেখেনি। তার ছোটোবেলার সই তাকে এক বাবার নামে মানত করতে পরামর্শ দেয়। অনেক কাল পরে এক সময় তার ইচ্ছা পূর্ণ হয়। মাতৃত্বের সুধা তাকে ধরা দেয়। ছেলের নাম রাখে ‘রইস’ কিন্তু অদৃষ্টের নির্মম পরিহাস, তার সন্তান রইস হলো হাবা-বোবা। গফুরের সাথে বিয়ে হওয়ার আগে বুড়ির আরও একবার বিয়ে হয়েছিল। সে ঘরে অবশ্য বুড়ির দুই ছেলে আছে- সলিম আর কলিম। ছোটো থেকে তারা বুড়ির কোলেই মানুষ। এখন তারা বড়ো হয়েছে। সলিমের তো বিয়েও হয়ে গেছে। আবার সলিমের ঘরেই এসেছে এক পুত্র সন্তান। বুড়ির সংসার এখন নাতির আগমনে যেন চাঁদের হাট।

 

দিন কয়েক হলো সলিমকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে। বুড়ি লক্ষ করল তার সেই চিরচেনা গাঁ আর আগের মতো নেই। সবাই কেমন যেন সাহসী হয়ে ওঠেছে। একসময় সলিম বুড়ির কাছ থেকে বিদায় নিতে আসে। সলিম মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়। ইতোমধ্যে গ্রামে মিলিটারি হানা দিয়েছে। গাঁয়ের গণমানুষের ওপর তাদের অত্যাচার তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠেছে।  বুড়ি চাইত সলিম-কলিমের মতো সে নিজে এবং রইসও যেন তাদের গাঁয়ের জন্য কিছু করতে পারে।

বুড়ির গ্রামে এখন মুক্তিযোদ্ধা আছে কয়েকজন। কলিম অবশ্য যুদ্ধে গিয়ে শহিদ হয়েছে। গাঁয়ের হাফিজ ও কাদের মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আগে বুড়ির কাছে এসেছিল বিদায় নিতে। কেমন করে যেন মিলিটারি খোঁজ পেয়েছিল যে, হাজিফ ও কাদের বুড়ির ঘরে আছে।  মিলিটারি যখন বুড়ির ঘরে আসে, তখন বুড়ি হাফিজ ও কাদেরকে ঘরে লুকিয়ে রেখে আপন ছেলে রইসকে ঠেলে দেয় মিলিটারির দিকে। তখনই মিলিটারিরা ধাতব বুলেটে ঝাঝরা করে দেয় রইসের বুক। মিলিটারি চলে গেলে বুড়ি হাফিজ আর কাদেরকে পরামর্শ দেয় মিলিটারির চোখ এড়িয়ে পালিয়ে যেতে। বুড়ির ত্যাগ আর সহযোগিতায় সেদিন হাফিজ আর কাদের মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে পেরেছিল।  দেশমাতার স্বাধীনতার জন্যে এক মা আপন সন্তানকে বিসর্জন দিতেও পিছ পা হননি।  এমনি এক মা ‘বুড়ি’।

বুড়িটির মতো এমন হাজারো মায়ের আত্মত্যাগে আজ আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন দেশ। এমন বীরাঙ্গনা মায়েরা আমাদের অহংকার, আমাদের অনুপ্রেরণা।

মতামত
লোডিং...