স্মৃতিবিলাস (প্রথম পর্ব)

মানুষ স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে বড্ড ভালোবাসে, নিজেকে কষ্ট দিয়ে হলেও প্রায় প্রত্যেক মানুষই এক জীবনে তার মস্তিষ্কের কুঠুরিতে হাজারও স্মৃতি জমিয়ে রাখে।

মা মারা যাবার তিনদিন পর আব্বা আমাদের ভাইবোনদেরকে ডেকে বললেন, “তোমার মায়ের তো আলাদা বলে তেমন কোন কিছুই ছিল না, টাকা-পয়সা বা গহনাগুলো আমার বড় স্টিলের আলমারীতেই রাখতো । তবে শো-কেসের একটা ড্রয়ারে সে তালা দিয়ে চাবিটা নিজের কাছে রাখতো সবসময়, আমিও জানিনা সেখানে কী আছে । তবে আমি চাই তোমাদের সবার সামনে ড্রয়ারটি খুলতে।”

 

আমাদের সবার মুখ থমথমে, চোখের পানি শুকায়নি এতটুকুও, বুকের ভেতরে দগদগে ক্ষত! মায়ের সাথে আর কোনদিন দেখা হবে না, এই একটি কথা মনে পড়লেই মরে যেতে ইচ্ছে করে, সেখানে মায়ের পড়ে থাকা জিনিসে কারোরই কোন আগ্রহ নেই, তবুও আব্বার কথামতো সবাই স্ট্যাচুর মতো বসে রইলাম । আব্বা ড্রয়ার খুলে একটা একটা করে জিনিস বের করতে শুরু করলেন- আমার স্কুল জীবনের বেগুনী-সাদা ডোরাকাটা জর্জেটের একটা কলিদার ফ্রক, যে জামাটাকে আমি বাতিল করেছি অন্তত পনের বছর আগে, শিক্ষাজীবনে পোস্ট কার্ডে ইনভেলাপে করে পাঠানো মাকে আমার লেখা অনেকগুলো চিঠি, আমার ছোট ভাইয়ের স্কুল ড্রেস, অথচ ও তখন সম্ভবত অনার্স শেষবর্ষের ছাত্র, মায়ের সেলাইয়ের রঙ বেরঙের সুতার গুটি, ক্রিমের কৌটায় যত্নে রাখা ছোট-বড় সূঁচ…আর সহ্য করতে পারছিলাম না । আমরা, সবার ছোট দুই ভাই-বোন বাড়ি থেকে বেশি দূরে থাকতাম, অন্য ভাইবোনেরা একই শহরে থাকায় তাদের সাথে মাঝেমাঝে মায়ের দেখা হবার সুযোগ ছিল । তাই হয়তো মা নিজের স্মৃতির আঙিনায় আমাদেরকে সর্বক্ষণ ওভাবে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।

মেয়ের জন্য আলমারী থেকে তোয়ালে বের করতে গিয়ে ঝকঝকে একটা তোয়ালে সামনে এলো, হাতে নিয়ে ফিরে গেলাম প্রায় পঁচিশ বছর আগে।

আমার রুমমেট ছিল মুন্নী, ওর ঘনিষ্ট বান্ধবী মুন্না, নামে যেমন মিল ছিল দু’জনের তারচেয়ে বেশি মিল ছিল ওদের আত্মায়। অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময় মুন্নীর আকস্মিক বিয়ে হয়ে যায়, তার কিছুদিন পরে মুন্নারও । অনার্স পরীক্ষার আগে মুন্নাদের পরিবার খুলনা থেকে ঢাকায় শিফট করে, ফলে পরীক্ষার সময় মুন্নার থাকার মতো তেমন কোন জায়গা ছিলো না, যেহেতু আমার রুমমেটের প্রিয় বান্ধবী, তাই মেট্রন আপাকে বলে আমার রুমে ওর সাময়িক থাকার ব্যাবস্থা করেছিলাম ।

 

মুন্না আট ভাইয়ের একটাই বোন, বড্ড আদুরে ছিল ওর কন্ঠস্বর । প্রতিদিন সন্ধ্যায় একটা ছোট্ট স্টিলের মগে দুধ চা খেত মুড়ি দিয়ে । একদিন ব্যাগ থেকে দুটো তোয়ালে বের করে বললো, একটা তোর আর একটা মুন্নীর জন্য এনেছি, কোনটা নিবি? আমি হেসে বললাম- মুন্নীর মেয়ে হয়েছে, ওকে বড়টাই দিয়ে দে, আমি ব্যাচেলর মানুষ ছোটটা দিয়েই চলবে।

অনার্স পরীক্ষা চলাকালীন হরতাল অবরোধের কারণে বেশ লম্বা একটা ছুটি পড়লো । মুন্না বললো, ভালো লাগছে না রে, একটু বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। ঢাকায় যাবার সময় আমি ওকে পরিবহনে তুলে দিতে গিয়েছিলাম, কলেজের সামনে একটু এগোলেই বাসস্ট্যান্ড, বাসে ওঠার আগে ও বললো পাঁচদিন পরেই চলে আসবে । কি আশ্চর্য! পরীক্ষার দিনও মেয়েটা এলো না, পরেরদিনও না!

 

ওর ঠিক কী হয়েছে জানার কোন উপায়ও খুঁজে পেলাম না, নব্বই-এর দশকের কথা, তখন দোকান থেকে ফোন করতে হতো টিএনটি নম্বরে। চিঠিই ছিলো খোঁজ নেবার প্রধান উপায়। পরীক্ষা শেষ করে চিঠি লিখছিলাম, উত্তর আসেনি । ওর রেখে যাওয়া মগটাতে পানি খেতে গেলেই ওর কথা মনে পড়তো । মাস্টার্স পরীক্ষা শেষে আমার বিয়ে ঠিক হলো, দাওয়াত দেবার জন্য ওদের খুলনার বাড়িওয়ালার বাসায় গিয়ে একদিন টেলিফোন নম্বর জোগাড় করে নিলাম, অনেক আবেগ নিয়ে ফোন করলাম কতদিন পর মুন্নার সাথে কথা হবে! ফোনটা রিসিভ করলেন মুন্নার মা, ওর কথা জিজ্ঞেস করতেই বিষন্নকন্ঠে বললেন, ‘ও তো মারা গেছে!’

হিসেব করে দেখলাম, যেদিন আমি মুন্নাকে গাড়িতে তুলে দিয়েছিলাম তার ঠিক সাতদিন পরে ও চলে গেছে দূর অজানায় । ঢাকায় পৌঁছে কোনরকম বিশ্রাম না নিয়ে আবার হাজব্যান্ডের কাছে চট্টগ্রামে রওনা হয়েছিল, প্রেগন্যান্সির প্রথম স্টেজে ছিল, সামান্য ইনফেকশন থেকে মেয়েটা মারা গিয়েছিল! কতবার মুন্নার দেয়া তোয়ালেটা বের করে আবার রেখে দিয়েছি, কয়েক ডজন গ্লাস, মগ ব্যবহার করা হয়েছে এই পঁচিশ বছরে, কিন্তু আজও ঐ স্টিলের মগটা আমি ব্যবহার করি, ওটা দেখলে ওর কথা মনে পড়ে, ওর জন্য দোয়া করি ।

 

কোয়ারেনটাইনের এই অবরুদ্ধ সময়টাতে জমিয়ে রাখা এমন অসংখ্য জিনিস আবার ধুলো মুছে সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছি, ব্যস্ততম জীবনে হয়তো বছরের পর বছরও সেগুলো নিয়ে ভাববার সময় হতো না । আমার হাজব্যান্ড অনেক সময় বাসায় কোন মেহমান এলে গল্পের ছলে হেসে বলেন, “আমাদের বাসায় এমন কিছু জিনিস আছে যা জীবনে একবারও ব্যবহার হয়নি। তোমাদের কি এরকম কিছু আছে?” মাঝেমাঝে ও আমাকে বলে, “কাজে না লাগলে সেগুলো রেখে লাভ কী, কাউকে দিয়ে দাও।”

 

আমিও দিয়ে দিতে চাই, দিয়েও থাকি অনেক নতুন নতুন জিনিস অনেককে, কিন্তু দিনশেষে ঐ স্মৃতিবহুল জিনিসগুলোকে আবার আঁকড়ে রাখি সযতনে । অনু হয়তো ভুলে গেছে অনেক কিছু, প্রথম আলোর নকশা দেখে আমার পছন্দ করা একটা শাড়ি কিনতে কত কষ্ট করে রোজা রেখে কুমিল্লা থেকে নারায়নগঞ্জ ‘রঙ’ এ নিয়ে গিয়েছিল আমাকে, তখন ওদের ঐ একটাই শাখা ছিল । শাড়িটা পুরনো হয়েছে, হয়তো এখন অনেকে রেশমী কাতানের নামও জানে না, কিন্তু আমি এখনও শাড়িটি গোছাতে গেলে বিশ বছর আগের সেই দিনটিতে ফিরে যাই, স্পষ্ট দেখতে পাই সুন্দর সময়টাকে। সময়ের আবর্তে দিন পেরিয়ে যায় ঠিকই কিন্তু কিছু অনুভূতি পুরনো হয় না, কিছু স্মৃতি মলিনও হয় না কখনও। কেবল ব্যস্ত জীবনের আবরণে ঢেকে যায় ক্ষণস্থায়ী মেঘের মতো!

মানুষ হিসেবে স্মৃতিধারণ আমাদের অনন্য বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর আর কোন প্রাণী একই সাথে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করতে পারে না ।

 

স্মৃতির একটা বিশাল পাহাড় জমে আছে মাথার ভেতরে । আমি হাঁটতে শুরু করি অন্য কোন স্মৃতির আঙিনায়, যেদিন মায়ের সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিল, ৩৫৪ দিন পর এক সন্ধ্যায়, সাদা ধবধবে একটা পোশাকে পুরো শরীরটাকে জড়িয়ে মা আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন…!

 

মতামত
লোডিং...