স্মৃতিবিলাস (তৃতীয় পর্ব)

ছোটবেলায় বাবা-মা আর নয় ভাই-বোনের একটা বিশাল পরিবার ছিল আমাদের৷ ছয় বোন, তিন ভাইয়ের মধ্যে আমি অষ্টম, বোনদের মধ্যে ছোট৷ অনেকটা বড় হয়ে জেনেছি, আমরা আসলে দশ ভাই-বোন ছিলাম, বড় ভাইটা জন্মের কয়েকমাসের মধ্যেই নাকি মারা গিয়েছিল। সবাই তার কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল, এমনকি সংখ্যার হিসেবেও অস্তিত্ব ছিল না, কেবল মাঝেমাঝে প্রসঙ্গক্রমে মা তার কথা বলতেন।

 

বড় বোনদের কাছ থেকে জেনেছি, ছয়মাস বয়সে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া ভাইয়ের নাম ছিল সাইফুল ইসলাম, তার আকিকা অনুষ্ঠানের ব্যাপক আয়োজন করা হয়েছিল বাড়িতে, দূর-দুরান্ত থেকে অনেক লোক এসেছিল সেই অনুষ্ঠানে, আগতদের মধ্যে একজনের নাকি টাইফয়েড ছিল। যদিও এটা কোন ছোঁয়াচে রোগ নয়, তবুও টাইফয়েড আক্রান্ত ব্যক্তির স্পর্শের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া স্থানান্তর হলে রোগটি অন্যদেরও হতে পারে। জানিনা কিভাবে কি হয়েছিল, তবে টাইফয়েড জ্বরে গুরুতর অসুস্থ হয়েই আমাদের বড় ভাই শিশু বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিল।

 

আব্বা-মা ঐ সময়টাতে আমাদের গ্রামের বাড়িতে (বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলায় অবস্থিত হেদায়েতপুর গ্রামে) থাকতেন। শুনেছি ঐ ঘটনার পর দুঃখ-কষ্ট সইতে না পেরে আব্বা ছয়মাস গৃহ ত্যাগ করেছিলেন। সে বছর বি.এ. পরীক্ষাটাও আর দিতে পারলেন না তিনি। বাগেরহাট শহরের সন্নিকটে খানজাহান আলীর দরগাহ শরীফের পাশে অবস্থিত এক চাচার বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন সেই সময়। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর থেকে কান্না শুরু করতেন তিনি, সারাক্ষণ মনের ব্যথায় কাতর হয়ে থাকতেন।

একদিন খুব ভোরে খানজাহান আলীর দরগাহ শরীফের মিনারের উপরে উঠে আজান দিলেন নিজেই, তারপর কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহকে বললেন, ‘তোমার আমানত তুমি নিয়ে গেছ, আমি কেন এত কষ্ট পাচ্ছি?’

এরপর থেকে না-কি আব্বার শরীরটা ধীরেধীরে হালকাবোধ করছিলেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছিলেন।

 

মায়ের প্রকাশভঙ্গি অবশ্য ঠিক এর উল্টো ছিল। স্বাভাবিক নিয়মে সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব একা হাতে সামলে নিয়েছেন তিনি। যৌথ পরিবারে শাশুড়ি, দেবর, জা, তাদের সন্তান, সবার দিকেই খেয়াল রাখতে হতো মাকে, কারণ তিনি ছিলেন বাড়ির বড় বৌ। তখন আমাদের সবার বড় বোনটার বয়স মাত্র তিন বছর। তের বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া একটা কন্যা শিশু ষোল বছর বয়সে প্রথম মা হন, সবাই ভেবেছিল, আঠার বছরে প্রথম ছেলে সন্তানটিকে হারানোর ব্যথা তিনি কন্যা শিশুটিকে বুকে আগলে রেখে কিছুটা কমিয়ে ছিলেন হয়তো, কিন্তু না পঞ্চাশের দশকে জীবন থেকে হারিয়ে ফেলা শিশুটির ছোট ছোট কাঁথা-কাপড় তিনি অতিযত্নে সংগোপনে একটা ছোট মটকিতে মুখ আটকে রেখে দিয়েছিলেন নিজের কাছে, যেটা নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত আমাদের বাসায় ছিল! কোন পরিবর্তনের হাওয়া বা ঝড়-ঝাপটা মায়ের কোল থেকে তাকে উড়িয়ে নিতে পারেনি কখনও। নিজের ভেতর তোলপাড় করা সেই আবেগ তিনি কাউকে কখনও দেখাননি, কেবল একান্ত নিভৃতে জীবন্ত স্মৃতিটুকু আগলে রাখার নিরন্তর চেষ্টা করে গেছেন।

ঊনষাট সালে আমার মেজো বোনের জন্ম হয়, একষট্টি সালে আমার মায়ের কোলে আসে আর একটি ছেলে, যাকে আমরা বড় ভাই বলে জেনে এসেছি চিরকাল। আব্বা আর ঝুঁকি নেননি, উনিশ’শ একষট্টি সালেই তিনি নিজের পরিবার নিয়ে গ্রাম থেকে বাগেরহাট শহরে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এরপর একে একে পৃথিবীতে আসেন সেজো আপা, মেজো ভাই, তারপর আমিসহ তিন বোনের আগমন। সর্বশেষ উনিশ’শ একাশি সালে কনিষ্ঠ ভাইটির জন্ম হয়। আমাদের বাড়িটিও ছিল চমৎকার, ভেতরে প্রবেশ করলে পুরোপুরি গ্রামের ছোঁয়া, বাইরে শহরের আবহ। সেখানেই মায়া মমতায় জড়াজড়ি করে কাটিয়েছি জীবনের প্রায় চব্বিশটি বছর। সেখানে না হয় সবাইকে আর একদিন নিয়ে যাবো…।

 

আমার আব্বা অতিমেধাবী কিন্তু অতিসাধারণ একজন ভালো মানুষ ছিলেন৷ জীবনে কোনো পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় হননি৷ লেখাপড়ার ক্ষেত্রে সবসময় প্রথম হয়েছেন, সেরাদের সেরা! তিনি তাঁর গ্রামের প্রথম গ্রাজুয়েট ছিলেন। শিক্ষাজীবনে তিনি মাদ্রাসা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করেছিলেন, সাথে বি.এড এবং এম.এডও করেছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তাঁর স্বনামধন্য বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি হয়েছে, মদিনায় চাকরির জন্য চিঠি এসেছিল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও একবার শিক্ষকতার সুযোগ হয়েছিল, সেসব চাকরি তিনি করেননি, তাঁর অজুহাত ছিল, ‘এতগুলো ছেলে-মেয়ে রেখে দূরে গেলে কে ওদের দেখবে?’ মনের পিছুটান আর প্রিয় স্যারের অনুরোধে স্থানীয় একটা বেসরকারী হাই স্কুলে (বর্তমান নাম বাগেরহাট কলেজিয়েট স্কুল) শিক্ষকতা শুরু করেন আব্বা৷ সেখানেই পেশা জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন তিনি৷

ছোটবেলায় এসব কথা জানার পর আমি ভাবতাম- আব্বা কী খুব বোকা, না কি বুদ্ধিমান! হিসেব মিলতো না৷ তবে এতটুকু বুঝতাম, যে বাবা তার সন্তানদের থেকে দূরে না থাকার জন্য নিজেকে নিয়ে, নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে এতটুকু ভাবেনি,

সে বাবার স্থান নিঃসন্দেহে ভালো বাবাদের শীর্ষে৷

 

আব্বার পেশা প্রসঙ্গে এত কথা লিখতে হলো এজন্য যে, তাঁর সততা, পেশার প্রতি আন্তরিকতা এসব ঠিক রাখতে গিয়ে আমাদের পরিবারে খুব একটা সচ্ছলতা ছিল না কখনোই৷ সারাক্ষণ অভাব অভিযোগ ছিল না ঠিকই কিন্তু এর পরোক্ষ প্রভাব পড়ত সবার লেখাপড়ার উপর৷ স্কুল জীবনের পড়াশুনা সবাই আব্বার স্কুলে শেষ করেছি, কলেজ পর্যায়ে গিয়ে সবার পড়াশুনার ব্যয়ভার বহন করা উনার জন্য ভীষণ কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল৷ আমরা ভাই-বোনেরা অতিমেধাবী না হলেও মেধাবী ছিলাম৷ তাই বেশ কষ্ট করে হলেও সবাই পড়াশুনা শেষ করেছি৷ তিনি আমাদেরকে অনেক শক্তভাবে মানুষ করেছেন ৷ সব সময় বলতেন: “সব কাজই মন দিয়ে করবে, আমি যেন বলতে পারি আমার ছেলে-মেয়েরা সব কাজ পারে”৷

 

আট বছর বয়সে এতিম হয়ে যাওয়া একজন মানুষ কিভাবে শিক্ষা-দীক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছিলেন – আব্বার সেই সব বাস্তবতা আমাদের কাছে আজও শ্রেষ্ঠতম আদর্শ৷ ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়গুলো যেমন-নামাজ, রোজা ছাড়াও সত্য বলা, বিপদে মানুষকে সহযোগিতা করা, অন্যের দুঃখে ব্যথিত হওয়া প্রভৃতি নৈতিক শিক্ষাগুলো আব্বার কাছ থেকেই পেয়েছি৷ তিনি খুবই ধর্মভীরু ছিলেন, তবে গোঁড়া নন৷ আধুনিক মন মানসিকতার ছিলেন এবং সেই বিষয়গুলো আমাদের মাঝেও সঞ্চারিত করেছেন৷ বাড়ির সামনে নারকেল গাছ ঘেরা একটা বিশাল পুকুরসহ প্রায় একবিঘা জায়গা ছিল আমাদের৷ সেটা দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল গনি মিয়াকে৷ কয়েক বছর পর আমরা জেনেছিলাম, গনি মিয়া কিভাবে যেন জায়গাটা জাল দলিল করে নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছে৷

 

আব্বা খুব দুঃখ পেলেন কিন্তু ভেঙে পড়েননি! আমাদেরকে ডেকে সান্ত্বনা দিলেন, যেন নিজের মনটাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন! বুঝিয়ে বললেন: ‘দিয়ে ধন, বুঝে মন, কেড়ে নিতে কতক্ষণ? তোমরা চিন্তা করো না, পরকালে ঐটুকুই আমাদের থাকবে৷’ কি অপরিসীম ধৈর্য ছিল তাঁর…

(চলবে)

মতামত
লোডিং...