স্মৃতিবিলাস (চতুর্থ পর্ব)

আজকাল অনেকেই জানতে চান- কী হতে চেয়েছিলেন? কী হলেন? ছেলেবেলার সেই স্বপ্ন বা অপূর্ণ স্বপ্নের কথা বলি তবে- শিশুকালে আমার সঙ্গী অনেকেই পুতুল নিয়ে খেলতে পছন্দ করতো, কিন্তু আমার দোকানদার সাজতে খুব ভালো লাগতো। পুকুরের পাড় থেকে মাটি তুলে হাত দিয়ে বিভিন্ন আকৃতির মিষ্টি তৈরী করতাম, সেগুলো রোদে শুকিয়ে একটু শক্ত হলে তারপর লম্বা মিষ্টিগুলোর গায়ে ইটের গুঁড়া মাখিয়ে চমচম আর গোল মিষ্টিগুলোর গায়ে গুঁড়া চুন মাখিয়ে রসগোল্লা নাম দিতাম। রসগোল্লাগুলোকে আবার বাটিতে পানি দিয়ে রসে ভেজাতাম। পানের দোকান দিতেও খুব ভালো লাগতো। বাড়ির পেছনদিকের বাগানে এক ধরণের লতানো গাছ পাওয়া যেতো, যার আঞ্চলিক নাম জার্মানির লতা, এই গাছের পাতাগুলো দেখতে অনেকটা পানপাতার মতো। সেই পাতাগুলো বোটাসহ ছিঁড়ে উল্টো করে করে সাজিয়ে রাখতাম, খেজুরের বীচি দিয়ে সুপারি বানাতাম, একটা কাপড় বা চট ভাঁজ করে বিছিয়ে তার উপর বসতাম। চটের ভাঁজে কাগজের কৃত্তিম টাকাগুলোকে বিভিন্ন আকার অনুযায়ী মহাজনের মতো সাজিয়ে রাখতাম! স্কুলে ভর্তি হবার পর স্যার, আপারা বেশ আদর করতেন, কারণ আমি বরাবরই শ্রেণিতে প্রথম হতাম। পরবর্তীতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার কারণে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী স্কুলের শিক্ষকরা ডাক্তার বা ইন্জিনিয়ার হবার স্বপ্ন দেখাতেন। আমাদের দশ ভাই-বোনের সংসারে তখন পেশা নির্বাচনের কথাটা মাথার উপর দিয়ে চলে যেতো কারণ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে সবকিছু সামলে শেষ পর্যন্ত পড়াশোনাটা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে কি না, সেই দুরাশা-ই তখন জোরালোভাবে জায়গা করে নিয়েছিল মনের ভেতর। কলেজে ভর্তি হবার পর অশোক স্যার আমার ইংরেজির প্রতি আকর্ষণ দেখে আব্বাকে ডেকে বলেছিলেন, “মেয়েটাকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াবেন, সে চেষ্টা করলে ইংরেজির ভালো শিক্ষক হতে পারবে।” কিছুদিনের জন্য সেটাই তখন স্বপ্নে পরিণত হয়েছিল। এইচএসসি পরীক্ষার পর উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হওয়া নিয়ে আবার ঝামেলা শুরু হলো। আব্বা দূরে কোথাও ভর্তি করাতে রাজি নন। তাছাড়া আবার বড় পাঁচ বোনেরই এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার পরপরই বিয়ে হয়ে গেছে, সেসব নিয়ে বেশ দুঃশ্চিন্তা হতো, মনে হতো দূরে গিয়ে পড়ার বিষয়ে জোর করলে আব্বা যদি আবার বিয়ে দিয়ে দেন! তারচেয়ে খুলনাতেই পড়তে রাজি হয়ে গেলাম, প্রাণিবিজ্ঞানে অনার্স। ভেতরে ভেতরে খুব আফসোস হতো, ইস! যদি আমাকে মেডিকেলে একটিবার ভর্তি পরীক্ষা দিতে দিতো অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে! বিয়ের আগেই অনার্স, মাস্টার্স শেষ করলাম। মাস্টার্স পরীক্ষার এক মাসের মধ্যে বিয়ে হয়ে গেলো, ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে। স্বামী ভদ্রলোক, অত্যন্ত ভালো মানুষ! সে যেন আমার মনের আকুতির কথা বুঝতে পারতো। ঘরের কাজকর্ম বা নতুন নতুন রেসিপি নিয়ে রান্না-বান্না করতে গেলে সবসময় বলতো, ‘তুমি পড়াশোনা জানা মেয়ে, শুধু ঘরের কাজ করে সময় নষ্ট করো না, চারিদিকে চোখ কান খোলা রেখে দেখো, অনেক কিছু করার আছে তোমার, যেটা ভালো লাগে সেটাই করার চেষ্টা করবে।’ ওর মুখে কথাগুলো শুনে খুব ভালো লেগেছিল সেদিন। সাহস করে বলেছিলাম, ‘আমি আরও পড়তে চাই।’ সেও খুশি হয়ে বলেছিল, ‘ঠিক আছে।’ কুমিল্লায় বাসা ভাড়া নিয়ে সংসার জীবন শুরু করলাম ২০০১ সালে। একা একা বাসায় থেকে সারাদিন সময় আর কাটে না। এক সপ্তাহ পর থেকেই বায়না শুরু করলাম, ‘কিছু একটা করতে চাই।’ সেও হন্যে হয়ে বউয়ের জন্য খোঁজ শুরু করে দিল, কোথায় কী করানো যায়। সে বছরই ভর্তি হলাম কুমিল্লা সরকারী টিচার্স ট্রেনিং কলেজে, বিএড-এ। আমাদের বাসা ছিল শুভপুর, সেখান থেকে রিকশায় করে টমছমব্রিজ যেতে হতো। ওখান থেকে বাস বা বেবিট্যাক্সিতে চড়ে টিটি কলেজে যেতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগতো। বিকেল পাঁচটায় ক্লাস শেষ করে আবার একই নিয়মে বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা। রাতে রান্না-বান্না শেষ করে পড়তে বসতে হতো। ওখানেও পাঁচজন মনের মতো বন্ধু খুঁজে পেয়েছিলাম, রুপা, মুনা, সোমা, অনু ও শিমুল। এরমধ্যে তিনজনই নতুন সংসার শুরু করেছি তখন, সবাই সবাইকে খুব ভালো বুঝতাম, মিলেমিশে পড়াশুনা করতাম, নোটগুলো একে অন্যের সাথে শেয়ার করতাম। সবকিছু মিলিয়ে কষ্টগুলো অনুভব করিনি কখনও। সেখানেও আমার ভালো রেজাল্ট হলো, স্কলারশিপ পেয়েছিলাম। তখনও খেলাধুলা, আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতা… সবই করতাম। ওখানকার শিক্ষকদের কেউ কেউ ভাইবা বোর্ডেও প্রশ্ন করা বাদ দিয়ে আবৃত্তি শুনতে চেয়েছিলেন।

বিদায়বেলা প্রিয় শিক্ষকদের কমেন্টসগুলো আমার মনের মধ্যে তখনই পেশা নির্ধারণের জন্য স্বপ্নের বীজ বপন করে দিয়েছিল, বিশেষ করে মাইনুদ্দিন স্যারের কথাটা, “আপনি যদি শিক্ষকতা পেশায় না আসেন, তাহলে দেশ একজন ভালো শিক্ষককে হারাবে।”

কুমিল্লা থেকে প্রচুর আত্মশক্তি জমিয়ে নিয়ে ২০০৩ সালে ঢাকায় এলাম, চাকরির জন্য পড়াশুনা শুরু করেছি তখন নতুন উদ্যমে। বিসিএস-এর জন্য প্রস্তুত হতে হবে, আমার চেষ্টার কোন কমতি ছিলনা কখনও, আর আমার হাজব্যান্ড অনু, এমন বিশ্বস্ত, পরোপকারী বন্ধু পাশে থাকলে হাজার আলোকবর্ষ হেঁটে পাড়ি দেয়া যায়। যখন যে বই দরকার হয়েছে, বলার সাথেসাথেই হাজির করেছে, ২৪তম বিসিএস এর শেষ পর্যন্ত গিয়েছিলাম, মৌখিক পরীক্ষাও খারাপ হয়নি, আমি প্রায় ৯৯% নিশ্চিত ছিলাম, চাকরিটা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হলো না, টানা তিন বছরের চেষ্টা বিফলে গেল! আমার ভাগ্যে ছিল না হয়ত। সেবার ভেতরে ভেতরে আমি খুব ভেঙে পড়েছিলাম, মনে হতো আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না! কাউকে কিছু না বলে একাই বায়োডাটা তৈরী করে কাগজপত্র রেডি করলাম অনেকগুলো, মনেমনে স্থির করলাম, আশেপাশের যত স্কুল-কলেজ আছে, নিজে গিয়ে সেখানে বায়োডাটা দিয়ে আসবো, মানসিক অস্থিরতা থেকে পরিত্রাণ দরকার। কিছু একটা করতেই হবে। মধুবাগে বাসা ছিল তখন, একদিন দুপুরে বাসার সন্নিকটে অবস্থিত ‘শহীদ (লেঃ) সেলিম স্কুল এন্ড কলেজে’ গিয়ে অফিসরুমে বায়োডাটা জমা দিয়ে এলাম। বাসায় এসে কেবল দুপুরের খাবার খেতে বসেছি, এরমধ্যে ঐ স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফোন করেছেন, ‘আপনি কি এখন একটু আসতে পারবেন?’ ‘এখনই?’ ‘জি, এখন আসলে ভালো হয়।’ ‘আচ্ছা, আসছি।’ যাবার পর একটা কাগজে লেখা গণিত প্রশ্ন দিয়ে উপস্থিত মতো আমার একটা পরীক্ষা নেয়া হলো, এরপর একঘণ্টা বসিয়ে রেখেছিলেন। সন্ধ্যায় একেবারে জয়েন করেই বাসায় ফিরলাম। মাত্র ১৫০০ টাকা বেতনে চাকরি শুরু করলাম। কিছুদিন পরে অবশ্য একটা ক্লাসের সার্বিক দায়িত্ব পালন করার জন্য বেতন বাড়িয়ে ৩০০০ টাকা করা হয়েছিল। স্বল্প বেতন ছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা কখনও মাথায় রাখিনি, নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। তাইতো চলে আসার পনের বছর পরেও সেখানকার সহকর্মীরা একইভাবে মনে রেখেছে আমায়, প্রতিষ্ঠানের বর্ষপূর্তিতে বা স্কুলের কোন ভালো-মন্দ সময়ে ঠিকই আমাকে মনে পড়ে তাদের! ২০০৫ সালের শেষ দিকে ইস্পাহানি গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ এর মগবাজার শাখায় কলেজ সেকশনে জয়েন করি। মাত্র তিনমাস সেখানে চাকরি করার সুযোগ হয়েছিল, কারণ কিছুদিন পরই ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের সার্কুলারটা চোখে পড়ে। নানারকম যাচাই বাছাইয়ের পর চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হই। ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে পেলাম ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে মানুষ গড়ার দায়িত্ব! একই দিনে দুটো বিশেষ ক্ষণ পালনের সুযোগ আসে আমার জীবনে। ২০০৭ সালেই ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, এম এড করলাম। টানা দুটো বছর সংসার, চাকরির পাশাপাশি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা, সব মিলিয়ে প্রচুর কষ্ট করতে হতো, কষ্টগুলো কোথায় যেন মিলিয়ে গেল যখন দেখলাম ফলাফল প্রথম শ্রেণিতে প্রথম। আজও পেছন ফিরে তাকালে একটাই শুধু আফসোস, মনে হয় সুযোগ পেলে হয়তো আরও ভালো কিছু করতে পারতাম জীবনে। এখনও তাই যে কাজটাই করি, শতভাগ চেষ্টা করি সবসময়, অন্তত কোনো আফসোস যেন আর না থাকে। (চলবে)

১১/১১/২০২০

মতামত
লোডিং...