স্মৃতিবিলাস (পঞ্চম পর্ব)

এবাদাতের ক্ষেত্রে যে এমন প্রতিযোগিতা হতে পারে, ভাবিনি কখনও! যদিও এ আমার একান্ত অনুভূতি, তবে চোখে দেখা সে দৃশ্যের কাছে আমার ভাবনার গভীরতা নিমিষেই হার মেনেছে। দু’বছর আগে প্রথমবার যখন মক্কা-মদিনায় গিয়েছিলাম, সেখানকার সবকিছু দেখে তখন খুব বিস্মিত হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম প্রথমবার বলেই বোধহয় এমন হচ্ছে আমার। কিন্তু না, দু’বছর পরেও আমার বিস্ময় একটুও কমেনি বরং বেড়েছে অনেকগুণ। আমার শ্বশুর বাবা, শাশুড়ি মা, অনু আর আমি এই চারজনে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে আরব দেশে এসেছি, ১৩ এপ্রিল, ২০১৬ তারিখে। দশ দিনের কর্মসূচি, উদ্দেশ্য এবাদাত করা আর মাঝে মাঝে পবিত্র জায়গাগুলোতে ঘুরে বেড়ানো। যাত্রার শুরু থেকেই বেশ মজার সময় কাটছে আমাদের। এর আগে বাবা-মাকে সাথে নিয়ে এভাবে দেশের বাইরে যাবার সুযোগ হয়নি কখনও। মা-বাবাও সময়টা বেশ আনন্দেই পার করছেন। উনাদের যাতে হাঁটাহাঁটির কষ্টটা কম হয়, এজন্য আমরা Makkah Hilton Tower এ উঠেছি। এই হোটেলটা একেবারে মসজিদের সীমানা ঘেষে গড়ে উঠেছে। ১৩ এপ্রিল রাত সাড়ে এগারোটায় রওনা হয়েছি বাংলাদেশ বিমানে। বিমান যথাসময়ে অর্থাৎ স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ছয়টায় অবতরণ করেছে ঠিকই কিন্তু বিপত্তি বেঁধেছে অন্যখানে। আমাদের ব্যাগগুলোকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর সৌদি বিমান বন্দরের অভিযোগ কেন্দ্রে গিয়ে অভিযোগ করা হলো। জানা গেলো যে, ট্যাগ খুলে যাবার কারণে কিছু ব্যাগ অন্য বিমান বন্দরে চলে গেছে, আমাদেরটাও তার মধ্যে থাকতে পারে। শুরু হলো অনাকাঙ্খ্ষিত অপেক্ষা। সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা করে পার হতে লাগলো সময়গুলো। সময় তার নির্দিষ্ট গতিতে পার হয়ে গেলেও আমাদের কাছে মনে হচ্ছে যেন কিছুতেই আর সময় যাচ্ছে না, মনের মধ্যে ঘড়ির কাটা যেন থমকে আছে। সবাই যখন বিরক্তির শেষসীমায় অবস্থান করছে তখন খবর এলো, অভিযোগকারীদের পঁচিশটি ব্যাগ ফেরত এসেছে, তার মধ্যে আপনাদেরটাও থাকতে পারে। ততক্ষণে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা কেটে গেছে, ক্ষুধাও চরম আকার ধারণ করেছে। রুটি আর কলা দিয়ে কোনোমতে সকালের নাস্তা শেষ করা হলো। হঠাৎ দেখলাম, বেশ খানিকটা দূরে বেল্টের ওপর আমাদের ব্যাগগুলো যেন পূর্নিমার চাঁদের মতো জ্বলজ্বল করছে! ততক্ষণে আমাদের জন্য ভাড়া করা নির্ধারিত গাড়িটি এসে দেরী দেখে ফিরে গেছে। অন্য একটা গাড়ি ভাড়া করে আমরা মক্কায় আমাদের হোটেলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। পড়িমরি করে হোটেলে ব্যাগ রেখে প্রায় ছুটে গিয়ে বায়তুল্লাহর সামনের রাস্তায় জামাতের সাথে জোহরের নামাজ আদায় করি। প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যেই বাবা-মাকে সাথে নিয়ে আসরবাদ তাওয়াফ শেষ করি। মাগরিবের নামাজ পড়ে সায়ী করে চুল কেটে ওমরাহ পালন শেষ করে রুমে ফিরে আসি। কাবা শরীফ সংলগ্ন মসজিদের বর্ধনের কাজ চলছে। তাই অনেক গেট বন্ধ রাখা হয়েছে, এ কারণে সবখানেই প্রচণ্ড ভিড়। এরমধ্যেও সব বেলাতেই আমরা মসজিদের ভেতরে নামাজ পড়ার চেষ্টা করেছি। তাওয়াফ করেছি, কাবাঘরকে ছুঁয়ে মনের সব আবেগ মিশিয়ে স্রষ্টার কাছে আকুতি জানিয়েছি, অভিযোগ করেছি, করুণা চেয়েছি তাঁর কাছে যিনি তার এই অধম বান্দাকে দাওয়াত দিয়ে মেহমানের সম্মান দিয়েছেন। তিনি শ্রেষ্ঠ, তিনি মহান, তিনি ক্ষমাশীল! তাঁর কাছে বলা যায় নিজের অপারগতার সকল কথা অকপটে, তাঁর কাছে চাওয়া যায় নির্দ্বিধায় সবকিছু। মনে প্রশান্তি হয়, তিনি যেন সেসব কথা শুনতে পেয়ে নিমিষেই পূরণ করে দেন মনের অপূর্ণ সাধ! হাজার হাজার মানুষ সারাক্ষণ তাওয়াফ করছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতি বেলায় এক জামাতে নামাজ পড়ছে, কি যে বিস্ময়কর ব্যাপার, দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়! রাতের আযানটা যেন খানখান করে দেয় রাতের নিরবতাকে। সেই উদাত্ত্ব আহবানকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা কাউকে দেননি। ইমাম সাহেব যখন নামাজ পড়াতে শুরু করেন, মনে হয় মনের সমস্ত আবেগ মিশিয়ে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য ভেঙে ভেঙে কি মধুর সুর ঢেলে দিচ্ছেন তাতে, প্রাণের সব আকুতি মসজিদের প্রতিটি দেয়ালে প্রতিধ্বনি তোলে বারবার, ভালোলাগা অনুভূতি শিহরণ তোলে দেহের প্রতিটি লোমকূপে। নামাজ পড়তে আসার এবং নামাজ শেষে ফিরে যাবার দৃশ্যটা দেখতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। যারা এটা কখনও দেখেনি, তাদেরকে কোনদিন সেটা ব্যাখ্যা করে বোঝানোর ক্ষমতা কোন শক্তিমান সাহিত্যিকের পক্ষেও অসম্ভব একটা ব্যাপার। এখানে প্রতিটি মুহুর্ত কাটে এবাদাতের মাধ্যমে। ঘর-সংসার, ইহলৌকিক কোনো বিষয়ই মাথায় আসার সুযোগ পায় না। সমস্ত দেহমনে কেবল তাঁরই নামের যিকির। এক ধরণের সুষম প্রতিযোগিতা চলে সবার মনের মাঝে, তাওয়াফ করার জন্য, কাবার সামনে প্রথম সারিতে নামাজ পড়ার জন্য, কখনওবা একটু বেশি দান সাদকার মাধ্যমে একটু বেশি নেকি অর্জনের জন্য। মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই, ধনী গরীব নির্বিশেষে সকল হাজী একই কাজে ছুটে বেড়াচ্ছে সারাদিনমান। অথচ দেশে থাকলে নামাজের সময়টা বের করতেও অনেক সময় আমাদের কাছে দুরূহ মনে হয়। মনে পড়ে, পবিত্র কোরআনের একটা আয়াতে পড়েছিলাম: “কাবা শরীফের বিশেষ মর্যাদা হচ্ছে, যে এখানে প্রবেশ করবে সে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থানেই নিরাপদ হয়ে যাবে।” (সুরা আলে ইমরান, ৯৭) তাই কি এই ঘরের জন্য এতো মায়া? কেন বিদায় দিতে অন্তর কেঁপে ওঠে বারবার? নিজের অজান্তেই চোখ ভেঙে বেরিয়ে আসে জলের অনন্তধারা! করুণাময়ের কাছে মিনতি করি, এই অভাগাকে তোমার দয়া থেকে বিতাড়িত করোনা, প্রভু! মনের মধ্যে অব্যক্ত বেদনা চেপে বিদায় নিয়ে আসি, আবার কি দেখা হবে কোনোদিন কাবার সাথে? (চলবে)

১২/১২/২০২০

মতামত
লোডিং...