কদম ফুলের মহরত (পহেলা কিস্তি)

কদম ফুলের মহরত একটি সিরিজ-কোঠা, যেখানে মোট ষোলোটি জানালা খুলেছেন মেহেদি আশরাফ। তাঁর এই কাব্য-কসরতকে আমরা স্বাগত জানাই। ওস্তাদের পিছু-পিছু এখানে-ওখানে ঘুরে গেয়ে বেড়ানো দুখু মিঞাকে দেখে কেউ কি ভেবেছিলো যে, এই-ই ভবিষ্যতে দখল করবে বাঙালি-মুসলমানের মধ্য থেকে শ্রেষ্ঠতম সাহিত্যিকের মুকুট! স্মরণ করি, নজরুল-বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞগণ নজরুলের গড়ে উঠার পেছনে ঐ ‘এখানে-ওখানে ঘুরে গেয়ে বেড়ানো’র কালটাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেন। যাকগে, প্রতি কিস্তিতে চারটি করে কবিতা- মোট চার কিস্তিতে এই ভোজনপর্ব খতমের পরিকল্পনা আমাদের।

 

১. 
জল যমুনার শরীরে জাগে মায়া
পথ ভোলে দূরবাসী আঁধারের লোক
অভিশাপে মুছে ফেলে ধুপের ছায়া
কলহ পাথর ভরা নিশিন্দার অভিযোগ,
গালিচার সংসারে থাকে কার বনিবানা?
একচোখা মন হয় অপেরাতে আনমনা

প্রলোভন জেগে ওঠে প্রত্নতত্ত্বের শহরে—
গাছের দুঃখ যত লুকায় পাতার শরীরে
বুকপাথরে আগুনপাখি নিত্য যে পোষে—
রাতের এনাটমি কি বিরূপ সময়ের কথন?
ভালোবাসা এই —সে ভাবে অবশেষে,
মাটিও তেমনই জানায় ঝরা পাতারে নিমন্ত্রণ।

২.
জামানতে ভুলে যায় গাঙের প্রহরী
চালাঘরে থাকে শুধু এজমালি বৃষ্টির শব্দ
সুহৃদে উদ্যত যত—পাপের পালঙ্কসারি
নীরবে ভাসছে স্রোত তার বয়ান স্তব্ধ
হৃদয়-রক্ত-জলে সে গাছের শিকড় ভেজে
পৌষ-পার্বণ লুকায় দুঃখী নিমফুলের খোঁজে

বায়স্কোপের ইতিহাস তবু থাকে অবনত
তখনো সে ছিল সাদা কুয়াশার মতো
শিশির ভোরে দুঃখ ঝড়ে বুনো কলমীর গায়ে
কড়ই পাতায় ভাঙা চাঁদ, লেখা রাত্রির নাম
তিলবুননে প্রেমের কথা মুছে যাক সে নায়ে
বরেন্দ্র বিভুই সাক্ষী, পদ্মপত্রই তালাকের খাম।

৩.
নোনাজলে সমুদ্রের গভীরতা অনির্ণেয় নাম
অতলে আকাঙ্ক্ষা ডোবায় তবু সাধক তার গায়
মেঘতো জানে না মানুষের পত্রলিপির পরিণাম
পেঁপেফুলে সাদা রং থাকে শুধু তার পরিভাষায়
রঙিলা কাতানে এসে দুয়ারে দাঁড়ায় কইতরী
হলফের অক্ষরে ঝড়ে ভাঙা প্রেমের লহরী

ঝরা ফুলে প্রেমগীত সুগন্ধ ছড়ায়
ব্যবধানে কাষ্ঠের ফুল কেউ না কুড়ায়
মাছের মতন যে মাঝি বুঝেছে জলের নাচন
সে আর ফেরে না বায়োমেট্রিক সুখের যুগলে
আত্মহত্যা চিরকাল বিরূপ সময়ের কথন,
কস্তুরি আকাশ পেখমে সে থাকে অপর ভুগলে।

৪.
চালাঘরে অপরূপ বৃষ্টির যে আওয়াজ
সামিয়ানার সুখে তবু চতুর্মাত্রিক থাকে
কেশের কাহনে গাছে পড়ে আয়ুর্বেদিক ভাঁজ
ঋতুর চক্রে ঘুরে কাশবন বেদনার বাঁকে
যে তারা আলো দেয় সে শুধুই হাসে?
লেফাফার বাইরে সারারাত তার কান্না ভাসে

জোরে জহরতে পাখিরে খাঁচায় বান্ধা যায়
শীকলে আওয়াজ দিয়া তারে কে পোষ মানায়?
জল তার শরীরে আনে পলাশের কেয়ারা
মহুয়ার বনে হাঁটা চাতক—সে হারায় পথ
বধুর সমুদ্রে যাওয়ার সংগীতে এতই তাড়া—
সে ভুলেছে উঠান বাওয়া কদম ফুলের মহরত।

মতামত
লোডিং...