বাঙালী মুসলিম মানসে তুর্কী বিপ্লবের প্রভাব

প্রথম ভাগ

ঠিক কত সনে পণ্ডিতপ্রবর, ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক এ প্রবন্ধ রচনা করেছেন তা আমাদের অজানা; কিন্তু নিশ্চিতভাবে জানি, পাকিস্তান আমলেই রচিত, অর্থাৎ বাংলাদেশ যখন স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে মুক্তধারা থেকে প্রকাশিত মনীষা মঞ্জুষা [তৃতীয় খণ্ড] -তে সংকলিত হয়েছে। বাঙালি-মুসলমানের তুর্কী-প্রীতি মোটেও নতুন নয়; হাল-আমলে তা টিভি সিরিজ, বইপত্রের কল্যাণে আরও বহুগুন গাঢ় হয়েছে। সবমিলিয়ে প্রবন্ধটি এখনো যথেষ্ট গুরুত্ববহ- বিষয়, রচনাশৈলী এবং উপকরণের দিক থেকে। মুহম্মদ এনামুল হক রচনাবলী (পঞ্চম খণ্ড) : মনসুর মুসা সম্পাদিত, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৭ থেকে প্রবন্ধটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো- দুই ভাগে বিভক্ত করে। বানান, যতিচিহ্ন সব অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ভূমিকা হিসেবে সংযোজিত হলো প্রফেসর মনসুর মুসার এককলাম কালাম, যা তার সম্পাদনায় প্রকাশিত মুহম্মদ এনামুল হক রচনাবলী (চতুর্থ খণ্ড) : বাংলা একাডেমী, ১৯৯৭ গ্রন্থের ভূমিকা থেকে নেওয়া। উক্ত রচনাবলীর প্রকাশনা কর্তৃপক্ষ হিসেবে বাংলা একাডেমির নিকট আমরা ঋণী।  

 

ভূমিকা

প্রবন্ধটি এদেশের সমাজ ও সাহিত্যে তুর্কী বিপ্লবের প্রভাব মূল্যায়নের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা। বাংলাদেশের সমাজ-জীবনে, বিশেষ করে নজরুলের সাহিত্যসাধনার মাধ্যমে মুসলিম সমাজ-জীবনে যে অভূতপূর্ব জাগরণের সৃষ্টি করেছিল তার একটি ঐতিহাসিক মূল্যায়ন এই প্রবন্ধ। শিক্ষা, সাহিত্যসাধনা, রাজনৈতিক অধিকারবোধ, কুসংস্কার বিবর্জন, নারীর অধিকারের স্বীকৃতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রবন্ধটির মূল্যায়ন তাৎপর্যপূর্ণ। নজরুল তাঁর জীবনসাধনায় ও সাহিত্য সাধনায় তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছিলেন (১) পরাধীনতা থেকে স্বাধীনতা অর্জন (২) মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে আত্মপ্রত্যয় সৃষ্টি (৩) হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রসার ঘটানো। মুহম্মদ এনামুল হক এই প্রবন্ধে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে আত্মপ্রত্যয় সৃষ্টির পেছনে কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে সংঘটিত তুর্কী বিপ্লবের ভূমিকা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেন। 

– প্রফেসর মনসুর মুসা, ফুলার রোড, ২০ জুন, ১৯৯৫

 

মূল প্রবন্ধ

১৯২৩ সালের ২৯ শে অক্টোবর প্রেসিডেন্ট মুস্তফা কামালের নেতৃত্বে “তুরস্ক প্রজাতন্ত্র” ঘোষিত হয় এবং আঙ্কারা তুরস্কের রাজধানী মনোনীত হয়। অচিরেই তাঁর জাতীয়বাদী শ্লোগান, “তুরস্ক তুর্কীদের”, জনসাধারণের মূলনীতি হয়ে দাঁড়ায়। তুর্কী জনসাধারণ আধুনিক অর্থে একটি জাতিতে পরিণত হয়।

পর বৎসর, ১৯২৪ সালের ৩রা মার্চ, মুসলমানদের সুপ্রাচীন ধর্মীয় রাজনৈতিক খিলাফৎ প্রতিষ্ঠানটির বিলোপ সাধন করে খলিফাকে পদচ্যুত ও নির্বাসিত করা হয়। ধর্মীয় বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রী পদটিও বাতিল করে দেওয়া হয়। “ওয়াকফ” বা ধর্মীয় কাজে উৎসর্গিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং এগুলো ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা বিভাগের আওতাভুক্ত করে নেওয়া হয়।

তারপরে যে সমস্ত ধর্মীয় বিচারালয়ে তখন পর্যন্ত শরীয়ৎ মোতাবেক বিচারকার্য চলছিল, তার বিলোপ সাধন করা হল। এই সিদ্ধান্তকে সাংস্কৃতিক সংস্কারের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। মুসলমানেরা এ সব সংস্কারকে সহজভাবে গ্রহণ করে নিতে পারেনি এবং তার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ কুর্দীস্তানে বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল। এই বিদ্রোহ দরবেশদের ধর্ম সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল। অবশ্য শীঘ্রই তা যথোপযুক্তভাবে দমন করা হয়।

কুর্দ বিদ্রোহের পর পরই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের দ্বিতীয় পর্ব আরম্ভ হল। কর্মে ও চিন্তায় তুরস্ক প্রজাতন্ত্রকে একটি সম্পূর্ণ আধুনিক এবং সুসভ্য রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রবল ইচ্ছা এই সময় কামালকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সুতরাং পীরের সমাধিগুলোকে সাধারণের উপাসনার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করে দিয়ে এবং দেশ থেকে তাবীজ লেখকদেরকে বিতাড়িত করে এক সরকারী নির্দেশ জারী করা হল। পোশাক সম্বন্ধীয় সংস্কারের প্রথমে আসে যাদু এবং ভোজবাজী ব্যবসায়ীদের পরিধেয় পোশাকাদির উপর নিষেধাজ্ঞা জারী। প্রায় একই সঙ্গে প্রচলিত গোঁড়ামি ও প্রাচীনতার প্রতীকরূপী ফেজ টুপীর ব্যবহারও নিষিদ্ধ করে দেওয়া হল। এবং তার পরিবর্তে হ্যাট পরার রীতি প্রবর্তন করা হল।

তারপর ১৯২৬ সালে নূতন বেসামরিক আইন (civil code) জারী করা হল। প্রসঙ্গত, এই আইন ব্যবস্থাই তুরস্কের নারীদের মুক্তির পথ সুগম করে দেয়। এতে বহু বিবাহ প্রথা এবং স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার রীতি নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয় এবং নারীকেও চাকুরি ও রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ করার সুযোগ দেওয়া হয়। ১৯৩১ সালে তাঁদেরকে মিউনিসিপ্যালিটির নির্বাচনে ভোট দানের অধিকারও দেওয়া হল এবং ১৯৩৪ সালে তাঁরা পালামেন্ট নির্বাচনে ভোট দানের অধিকারও লাভ করলেন।

১৯২৮ সালের ৩রা নভেম্বর তারিখে তুরস্কের আর একটি বিরাট সাংস্কৃতিক সংস্কার প্রবর্তিত হল। কামাল আরবী বর্ণমালার পরিবর্তে ল্যাটিন বর্ণমালার প্রচলন করলেন। এই সংস্কারের ফলে তুর্কী মানস অতীতের সাংস্কৃতিক বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করে। এইভাবে মুস্তফা কামাল তুরস্কে এক নতুন সাহিত্যের গোড়াপত্তন করেন। এই নবজাত সাহিত্যকে সর্বতোভাবে তুর্কী সাহিত্য বলা যেতে পারে। তুর্কী ভাষাকে রোমানীকরণের পর পরই দু’টি প্রতিষ্ঠান সংস্থাপিত হয়। প্রথমটির নাম “তুরস্ক ইতিহাস পরিষৎ” ; ইহা ১৯৩১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয়টির নাম “তুরস্ক ভাষা পরিষৎ” এবং এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩২ সালে। প্রথম প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল প্রত্নতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, মুদ্ৰাতত্ত্ব ইত্যাদি নানা বিষয়ক গবেষণার মাধ্যমে ইতিহাস চর্চা এবং সত্যিকারভাবে তুর্কী জাতীয়তাবাদী ইতিহাস রচনা। দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য ছিল তুর্কী ভাষাকেও ফার্সী ভাষার প্রভাবমুক্ত করা।

যা কিছু সেমিটিক বা আরবীয় তার মূলোৎপাটন করার জন্যে ১৯৩৪ সালে আর এক অভিযান শুরু করা হয়। ভাষা ও সমাজে প্রচলিত রীতিনীতি এবং সরকারী কর্মচারীদের খেতাব ও পদবি থেকে সেমীয় প্রভাব দূরীভূত এবং তার পরিবর্তে তুর্কী শব্দের প্রচলন করা হয়। কামাল নিজেই তাঁর আরবী নাম “মুস্তফা” এবং আরবী উপাধি পরিত্যাগ করেন এবং তার পরিবর্তে “আতাতুর্ক”, অর্থাৎ তুর্কী জাতির পিতা, এই নাম ধারণ করেন।

১৯৩৫ সালে আতাতুর্ক ইউরোপীয় রীতিনীতি ও আচার ব্যবহারের সাথে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টির প্রয়াস পান। সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে ‘বল’ নৃত্যের প্রচলন করা হয় এবং শুক্রবার মসজিদে সঙ্গীতধ্বনি শ্রুত হতে থাকে। সমগ্র দেশে ইউরোপীয় পঞ্জিকা অনুসরণ করে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়। রবিবার ছুটির দিন ও শনিবার সপ্তাহ শেষের দিন বলে ধার্য করা হয়। ইতিপূর্বে তুরস্কবাসীদের কোন গোত্রগত নাম ছিল না। এখন থেকে বিশেষ নির্দেশ জারী করে তাদেরকে গোত্রগত নাম ঠিক করে নিতে বলা হল। ফলে, ইসমেত তার বিজিত স্থানটির নামানুসারে নিজের নাম রাখেন ‘ইউনোনু’, সেলাল রাখেন ‘বায়ার’, ফেতহি রাখেন ওকায়ার’, কামালের পালক কন্যা সাবিহা রাখেন ‘গোকসেন’ ইত্যাদি, ইত্যাদি। একই সঙ্গে ‘পাশা’, ‘আফন্দী’, ‘বে’, ‘হানিম’ এই সমস্ত পুরাতন পদবি, যা তুরস্কবাসীদের নামে ব্যবহৃত হত, সে সবই সরকারী নির্দেশক্রমে তুলে দেওয়া হল এবং তার পরিবর্তে ‘বে’ এবং ‘বায়ান’ অর্থাৎ মিষ্টার ও ‘মিসেস’, এই শব্দ দুটি নামের পূর্বে ব্যবহারের প্রচলন করা হল।

আতাতুর্কের জীবনের শেষ তিন বৎসরে (১৯৩৬-১৯৩৮) দেখা যায় যে তিনি তাঁর প্রবর্তিত সাংস্কৃতিক সংস্কারগুলোকে স্বাভাবিক, দ্রুত এবং দৃঢ়ভাবে প্রসার লাভ করার সুযোগ দিয়েছিলেন যাতে করে এগুলি দেশে চিরস্থায়ী হতে পারে। তাঁর আশা বাস্তবে রূপায়িত হয়েছে। এবং ১৯২৩ সাল থেকে ১৯৩৮ সাল, মাত্র এই ১৫ বৎসরের সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে সমগ্র তুরস্ক দেশে এক যুগান্তকারী মহাবিপ্লব এসেছে।

 

দুই

আধুনিক তুরস্ক সৃষ্টির মূল কথা কামাল নিম্নলিখিত ভাষায় বর্ণনা করেছিলেন : “পর্বতের ভৃগু দেশে অবস্থিত একটি জরাজীর্ণ দেশ ; শত্রুর সাথে তার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ; বছরের পর বছর অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম ; অতপর এক নতুন দেশ, এক নতুন সমাজ ব্যবস্থা, এক নতুন রাষ্ট্র গঠন করতে গিয়ে অবিশ্রান্ত বিপ্লব ঘটিয়ে দেশে ও বিদেশে সম্মান অর্জন ; সংক্ষেপে এটাই হল তুরস্কের সাধারণ বিপ্লবের রূপ”।

তুরস্কের এই “সাধারণ বিপ্লবের” সঙ্গে বিজড়িত ছিল তার রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বিপ্লব। রাজনৈতিক বিপ্লব জন্ম দিয়েছে তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের ; এটি পূর্ববর্তী তুরস্ক সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় সংজ্ঞা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। এই রাজনৈতিক বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে যে সাংস্কৃতিক বিপ্লব সাধিত হয়েছে তা তুরস্ককে পরিণত করেছে নতুন সমাজ ব্যবস্থা সম্বলিত এক নবীন জাতিতে।

শুধু বাঙালী মুসলমানেরা কেন, গোটা পাক-ভারত উপমহাদেশের মুসলমানরাও কোন দিন তুর্কীদেরকে বিদেশী বলে মনে করেনি ; বরং একই ধর্ম বিশ্বাস এবং আচারানুষ্ঠান অনুসারী ভাই বলে মনে করেছে। নিজেদেরকে তুরান বা তুর্কীস্তান থেকে আগত বলে মনে করেন এমন অনেক বাঙালী মুসলমানও তুর্কীদেরকে তাদের জ্ঞাতি বলে বিশ্বাস করেন।

সেই সময়ে বাঙালী মুসলমান বিদেশীয় রাষ্ট্রের শাসনে থেকেও তাদের তুর্কী ভাইদের আশা আকাঙ্ক্ষায় উদ্দীপ্ত হয়েছে এবং নিজেদের স্বাধীনতা সংগ্রামে তুর্কী ভাইদের আর্থিক ও নৈতিক সমর্থনের স্বপ্ন দেখেছে। কাজেই বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন খৃষ্টান শক্তি বর্গের কুচক্রে তুর্কী জাতি ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে প্রায় লুপ্ত হতে যাচ্ছিল তখন তাদের দুঃখ এবং মনোপীড়ার অবধি ছিল না। কিন্তু, বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদ শেষ হতে না হতেই যখন আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুর্কী জাতির পুনর্জাগরণ সূচিত হল তখন অতি স্বাভাবিক ভাবেই মুসলমানদের আনন্দের সীমা রইল না। ১৯২২ খৃষ্টাব্দে স্মার্নায় গ্রীকদের বিরুদ্ধে আতাতুর্কের চূড়ান্ত বিজয় সংবাদের আনন্দ তারা তাদের প্রিয় সৈনিক কবি নজরুল ইসলামের কণ্ঠে শুনতে পেল :

“ঐ ক্ষেপেছে পাগলী মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,

অসুরপুরে শোর উঠেছে জোর-সে সামাল সামাল তাই।

কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!

হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই।

 

তিন

এখন কামাল আতাতুর্কের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিস্তৃতি ও বহির্বিশ্বে তার প্রতিক্রিয়ার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাক।

তুরস্কে তিনি যে সংস্কার সাধন করেছেন, তা ছিল অত্যন্ত দুঃসাহসিক, মৌলিক এবং বৈপ্লবিক। কেবল মাত্র মুষ্টিমেয় লোকই তা সহানুভূতির সাথে গ্রহণ করতে পেরেছিল। বিশ্বের মুসলমানদের পুরাতনের প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি এবং তার সাথে ধর্মহানির একটা ভ্রান্ত ভীতি ছিল বলে তাদের মনে এই সমস্ত সংস্কার কঠিন আঘাত হানল।

তাঁদের নিকট কামাল এবং তাঁর জাতীয়তাবাদী দলের এহেন কার্যকলাপ ধর্ম বিরুদ্ধ বলে মনে হলো। তাদের ধর্মানুভূতি জাগ্রত হওয়ার ফলে মুসলমানদের মনে তুর্কীদের এসব অধর্মীয় সংস্কারের বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভের সৃষ্টি হল। বিশেষ করে পাক-ভারত উপমহাদেশীয় মুসলমানদের মনে কামালের এরূপ কার্যকলাপ অসন্তোষ মিশ্রিত এক বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি করল, কারণ তারা এতদিন খৃষ্টান জগতের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে তাদের স্বধর্মী তুর্কী জনগণের সাফল্যকে খোদার দান হিসাবেই সাগ্রহে লক্ষ্য করে আসছিল। এই মনোভাবের প্রত্যক্ষ ফল হিসাবে আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের (মওলানামোহাম্মদ আলী ও মওলানা শওকৎ আলী) নেতৃত্বে পরিচালিত “খিলাফত আন্দোলন” নামে একটি প্রবল ধর্মীয় রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল। পাক-ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে একটা প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করাই এই আন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। বাংলা দেশে মওলানা মুনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০) ও মওলানা আকরম খানের (জন্ম ১৮৭৭) নেতৃত্বে এই খিলাফত আন্দোলন পরিচালিত হয়। এরা উভয়েই লেখক এবং সাংবাদিক। কিন্তু মাত্র কয়েক বৎসরের মধ্যেই এ আন্দোলনের বেগ মন্দীভূত হয়ে এল কারণ আস্তে আস্তে মুসলমানদের নিকট এ কথা পরিষ্কার হয়ে গেল যে পার্থিব ক্ষমতাচ্যুত খলিফা খৃষ্টান জগতের পোপের নামান্তর বই আর কিছু নয়। এ অবস্থা মুসলমানদের মোটেই কাম্য ছিল না।

যখন পাক-ভারত উপমহাদেশীয় মুসলমানদের মনে এ ধারণার উন্মেষ ঘটল তখন বর্তমান পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা নগরীর বুকে ১৯২৬ সালের জানুয়ারীতে একজন প্রখ্যাত সাহিত্য-চিন্তাবিদ জনাব কাজী আবদুল ওদুদ একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। ঢাকার “মুসলিম সাহিত্য পরিষদ” নামক একটি সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে কাজী সাহেব যে প্রবন্ধ পাঠ করে শুনিয়েছিলেন তার শিরোনাম ছিল “মুস্তফা কামাল সম্পর্কে কয়েকটি কথা”। এই প্রবন্ধে তিনি মুস্তফা কামালের ধর্মীয় সংস্কারের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিলেন। পাণ্ডিত্যপূর্ণ তথ্যের অবতারণা করে লেখক মুস্তফা কামালকে সৃজনশীল দৃষ্টি ও অসাধারণ প্রজ্ঞাসম্পন্ন সংস্কারক হিসাবে অভিনন্দিত করেন। উপসংহারে লেখক আশা প্রকাশ করেন যে তাঁর দেশবাসী এখন সম্ভবত মুস্তফা কামালের হানা আঘাত ভুলে যেতে সমর্থ হবেন এবং নিজেদেরকে কর্মে প্রবৃত্ত করতে পারবেন। আমার বক্তব্য প্রমাণ করার জন্যে আমি নিম্নে লেখকের প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি, যার থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যাবে যে মুস্তফা কামালের ধর্মীয় সংস্কার বাঙালী মুসলমানের সাহিত্যের প্রকৃতি ও আঙ্গিক গঠনের বেলায়ও এক বিরাট অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল।

“সত্যের আঘাত বড় প্রচণ্ড। মুসলমানের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন গতানুগতিকতাকে ধূলিস্যাৎ করে দিয়ে, নব-সৃষ্টির প্রয়োজন ও সম্ভাবনা দেখিয়ে, মুসলমান সমাজের বুকে কামাল যে সত্যকার আঘাত দিয়েছেন, আশা করা যায়, এই আঘাতেই আমাদের শতাব্দীর মোহ নিদ্রার অবসান হবে। ধর্মে, কর্মে, জাতীয়তায়, সাহিত্যে, সমস্ত ব্যাপারেই আমাদের ভিতরে স্থান পেয়েছে যে জড়তা, দৃষ্টিহীনতা, মনে আশা জাগছে, যেমন করেই হোক, এইবার তার অবসান আসন্ন হয়ে এসেছে। কামালের প্রদত্ত এই আঘাতের বেদনাতেই হয়তো আমরা উপলব্ধি করতে পারবো, – সত্যকার ধর্মজীবন কি, জীবনের সঙ্গে শাস্ত্রের সত্যকার সম্বন্ধ কি। হয়তো আরও উপলব্ধি করতে পারবো, জীবন-সমস্যার চরম সমাধান কোন কালেই হয়ে যায় নাই ; নতুন করে সে সমস্ত বিষয়ে সচেতন হওয়া আর তার মীমাংসা করতে চেষ্টা করা, – এই-ই জীবন। আর, এই বেদনাময়, আনন্দময়, উপলব্ধির বহুরঙ্গিমচ্ছটায় অনুরঞ্জিত হবে আমাদের যে আত্মপ্রকাশ চেষ্টা, তার থেকে উৎসারিত হবে আমাদের সত্যকার সাহিত্য।”

প্রবন্ধের দ্বিতীয় ভাগ পড়ুন:

বাঙালী মুসলিম মানসে তুর্কী বিপ্লবের প্রভাব

মতামত
লোডিং...