সিদ্দিকে আকবর (র.) : মহাকালের মহামহিম নবীপ্রেমিক

 

৫৭২ খ্রি.। দুবছর হলো মরুদুলাল দুনিয়ায় এলেন। পৃথিবীকে ঝলমলিয়ে, পবিত্র করে। মক্কার পূতভূমিতে এবার জন্মলাভ করলেন আরেক প্রথিতনামা মুখ আবু বকর (রা.)। নাম তাঁর আবদুল্লাহ, আবু বকর উপনাম। পরিচিত হলেন ‘সিদ্দিকে আকবর’ নামে। ‘সিদ্দিকে আকবর’ প্রসঙ্গ ঘটনা খানিকপর বলছি। পিতা ওসমান ইবনে আমের, কুনিয়াত আবু কোহাফা। মাতা সালমা, পরিচিত ছিলেন ‘উম্মুল খায়ের’ নামে।

 

পবিত্র মক্কা তখন ঘোর পাপাচারে লিপ্ত। সিদ্দিকে আকবর (রা.) জন্মগ্রহণ করেন এক অমুসলিম পরিবারে। অমুসলিম পরিবার মানে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাবতীয় জড়বস্তুর পূজা-উপসনা। এতদসত্ত্বেও, অমুসলিম পরিবারের সমুদয় নিন্দিত কার্যকলাপের প্রতি কেমন জানি একটা বিরোধভাব সর্বক্ষণ তাঁর মনে আনচান করতো। কোনো ব্যক্তি তাঁকে মদ্যপান, পূজা-অর্চনা, নির্লজ্জ জাতীয় কাজে আমন্ত্রণ জানালে তিনি বলতেন, “এ সকল কাজকে আমি নিজের জন্য অবমাননাকর মনে করি, সুতরাং তা আমার পক্ষে অসম্ভব”।

 

তিনি নবী করিম (দ.)’র নবুয়ত প্রকাশের অনেক আগেই বুঝেছিলেন, আল্লাহ পাক তাঁর স্বীয় বান্দাদের হিদায়তের জন্য অদূর ভবিষ্যতে কোরাইশ বংশ থেকে কোনো একজনকে নবুয়ত দান করবেন। এমনকি একদিন তিনি স্বপ্নে দেখেন, মক্কা নগরীতে এমন এক শশীর উদয় হচ্ছে, যাঁর মাধ্যমে সর্বত্র শান্তির বাণী ছড়িয়ে যাচ্ছে। অবশেষে জানতে পারলেন সেই শশীর মর্মার্থ। দেখতে পেলেন নিজ চোখে সেই প্রস্ফুটিত শশীর এক বাস্তবিক রূপ। পরক্ষণেই তিনি হাজির রসুলাল্লাহর (দ.) দরবারে। এতোদিন যাবৎ যাঁর প্রতিক্ষায় প্রহর কাটছে, ইনিই তিনি! নবীজি (দ.) তাঁকে দাওয়াত দিলেন। সাথে সাথেই দাখিল হলেন ইসলামের সুশীতল-মনোজ্ঞ  অন্দরে। দাখিল হলেন, কেননা, তাঁর হৃদয় এতদিন তো এমন কিছুই খুঁজছিল। এদিকেই তিনি ঝুঁকবেন, যিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তাঁর এ শুভক্ষণের কথা নবীজি এভাবে বলছেন, “যার কাছেই আমি ইসলামের দাওয়াত উত্থাপন করেছি, সে ইসলাম কবুল করার পূর্বেই কিঞ্চিৎ হলেও চিন্তাভাবনা করেছে। কিন্তু, আবু বকর তাঁদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা! তাঁকে ইসলামের প্রতি স্বাগত জানানোর সাথে সাথেই কোনো প্রকারের চিন্তা ছাড়াই তিনি তা গ্রহণ করেন”।

 

নবীপ্রেমে আবু বকর (র.) ছিলেন সর্বোৎকৃষ্ট। যিনি সর্বক্ষণ নবীজির সাথেই দিনাতিপাত করতেন, নবীজির যে-কোনো সমস্যা সমাধানে সঙ্গ দিতেন, প্রয়োজনে পাশে থাকতেন। অধিকন্তু নবীজি (দ.) আবু বকর রহ. কে বাল্যকাল থেকেই মনোনীত করেন অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে। মক্কায় মুকাররমায় নবীজির (দ.) নিকট কাছের সুহৃদ থাকলে তিনি ছিলেন একমাত্র আবু বকরই। নবীপ্রেম তাঁর নিকট কীরূপ ছিল জানতে হলে হিযরতের ঘটনা উল্লেখযোগ্য।

 

আম্বিয়া কেরামের জীবনে হিযরতের ঘটনা তাৎপর্যবহ। বিবিধ সমস্যার কারণে নবীগণ তাঁদের জন্মভূমি থেকে অন্যদেশে অবস্থান করেন। যেমন হযরত ইব্রাহিম (আ.) বাবেল ত্যাগ করে কেনান, ইউসুফ (আ.) কেনান ছেড়ে মিশরে হিযরত করেন। অনুরূপ নবী করিম (দ.) এর ক্ষেত্রেও।

নবুয়তের তেরতম বছর। নবীজির ইসলামের বাণী চতুর্দিকে জয়জয়কার! মুসলানদের সংখ্যা বাড়ছে দিনদিন। এদিকে কাফেররা ক্রোধে অগ্নিশর্মা। ইসলামকে মুছে দিতে হবে ধরাপৃষ্ঠ হতে। সকলে বদ্ধপরিকর। শুরু করেছে মুসলমানদের উপর অমানুষিক নির্যাতন। এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় নবীজি সিদ্ধান্ত নিলেন হিযরত করার। মানে মক্কা হতে মদিনায় প্রস্থান। অহির অপেক্ষায় নবীজি (দ.)। এদিকে আবু বকর (রা.)’র অনুরোধ তাকে যেন এই সফরের সঙ্গী। অনুরোধও কবুল। অহি আসলো হিযরতের। কালবিলম্ব না করে মদিনার পথে বেরিয়ে পড়লেন নবীজি (দ.) এবং আবু বকর (র.)। আহা! মদিনার পথে কেবল দুজন একসাথে । না, তাঁদের সাথে আল্লাহও আছেন। কত চমৎকার দৃশ্য। কামলিওয়ার সাথে সিদ্দিকে আকবর। কাকে বলে নবীপ্রেম? যাঁর চোখে নবীজি সবসময়, ক্ষণিকের জন্যেও আড়াল থাকেন না। নবীজিকে ছাড়া যাঁর হৃদয় সতত উৎকণ্ঠা সঞ্চার হয়। তিনিই সিদ্দিকে আকবর।

 

তাঁরা এখন যেতে যেতে পৌঁছলেন ‘সওর’ গুহায়। সিদ্দিকে আকবর (রা.) গুহা পরিষ্কার করে ছোটখাটো ছিদ্রগুলো নিজের চাদর ছিঁড়ে বন্ধ করে দিচ্ছেন। চাদর সংকুলান না হওয়ায় একটি ছিদ্র খোলা। কাফেরদের আক্রমণ হতে পারে। তাই ছিদ্রটি তাঁর পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা ঢেকে রাখলেন। সিদ্দিকে আকবরের অনুরোধে রসুল (দ.) তাঁর উরুতে শির রেখে খানিক বিশ্রাম নিচ্ছেন। ইত্যবসরে বৃদ্ধাঙ্গুলে ঢেকে রাখা ছিদ্রের ভেতর একটি শাপ আচমকা আবু বকর (র.) কে দংশন করে বসলো। তাঁর অসহ্য যন্ত্রনা। ব্যাথায় কাতর। তীব্রতর কষ্ট। নবীজির ঘুমে সমস্যা করা যাবে না। এমনকি একপর্যায়ে যন্ত্রনায় অতিষ্ঠ হয়ে চোখ বেয়ে নেমে আসে অশ্রুসজল! একটি বিন্দু নবীজির (দ.) চেহেরা মোবারক দিয়ে গড়িয়ে যায়। সুবহানাল্লাহ, একী দৃশ্যপট! আবু বকরের কী ধরনের নবীপ্রেম দেখুন। প্রতিমধ্যে নবীজি জাগ্রত হলেন। সিদ্দিকে আকবরকে ক্রন্দনাবস্থায় দেখে এর হেতু জানতে চাইলে, উক্ত ঘটনা খুলে বলেন। অতঃপর সিদ্দিকে আকবর (র.)’র পায়ের দংশিত স্থানে নবী করিম (দ.) নিজের থুথু মোবারক লাগিয়ে দিলে সাথে সাথেই লাভ করেন আরোগ্য। যেন কিছুই হয়নি।

 

উল্লিখিত কিছু সময় আল্লাহর কাছে এতই প্রিয় ছিল যে, তিনি স্বয়ং বলেন, “সে সময় দুজনের মধ্যে একজন ছিলেন তিনি, যখন তাঁরা উভয়ে (সওর) গুহায় কাটিয়েছিলেন, আর নবী করিম (দ.) তাঁর সঙ্গীকে বলেছিলেন, চিন্তিত হবেন না, আল্লাহ আমাদের সাথেই আছেন। অনন্তর আল্লাহ পাক তাঁর উপর সান্ত্বনা নাজিল করেন”। [আল-করআন; সুরা তাওবা: ৪০ নং আয়াত]

অন্যদিকে উমর (রহ.)-র জবানে পাকে, “যদি আমার সারা জীবনের নেক আমল আবু বকরের সেই কয়েক মুহূর্তের সমান হতো, তাহলে কতই না উত্তম হতো”!

প্রেম বলে কাকে? নবীপ্রেম কেমন হতে হয়। শিখিয়ে গেলেন আবু বকর আস-সিদ্দিক (রা.)। যে প্রেমে কখনো ছিলো না সামান্যতমও গরমিল। ছিলো নিখাঁদ, নিরেট। প্রেমের সংজ্ঞা এবং প্রেমের স্বাদ কত মধুর তা বুঝতে আমাদের প্রত্যেকের উচিত আবু বকর (রা.) কে জানা। শিক্ষা নেয়া তাঁর জীবনচরিত থেকে। অনুসরণ করা তাঁর প্রতিটি কাজকর্ম।

 

সহায়ক গ্রন্থ: বিশ্বনবী (স) ও জান্নাতী দশ সাহাবীর জীবনী : মাওলানা মুস্তাফিজুর রহমান।

মতামত
লোডিং...