মহাকবি ইকবালের ‘শিকওয়া’র জওয়াব

১৯০৯ সালে মহাকবি ইকবাল ‘শিকওয়া’ (নালিশ) নামে যে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন— পরবর্তীতে উপমহাদেশের মুসলিম সমাজের সর্বোচ্চ আদরপ্রাপ্ত— এর বিচার করে কাব্যেই জওয়াব লিখেছেন কবি আমিনুল ইসলাম চৌধুরী। বাঙালি কাব্যসমাজে তো নয়ই, বাঙালি-মুসলিম কাব্যপিপাসুদের মজলিশেও কবি অবহেলার চূড়ান্তে বিধায় তাঁর এমন আলিশান একটি কাজ কঙ্কালের দশায় হাজির। কিন্তু মুসলমানদের ভয়ানক রকমের পতনে ইকবালের উত্থাপিত নালিশনামার হাজতে তরুণ বাঙালি-মুসলমানদের ভাবনা-চিন্তা কেমন ছিল তার প্রেক্ষিতে এ কাব্যগ্রন্থ গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই।— তার-উপর একজন তরুণ বাঙালি কবি কাব্যে সাজিয়েছেন পুরো জওয়াব— ‘আশ্চর্য্য!’ আজকের সময়, সমাজ ও পরিস্থিতি বিচেনায় সে-সময়কালের (যখন কাব্য রচিত হয়েছিল) খুবেকটা তফাত নেই বিধায় আজও সমানভাবে উপযোগী। সবদিক বিবেচনা করে সাহিত্য সওগাত এ কাব্যটি দুই পর্বে প্রকাশ করবে— ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’র ভুমিকাসহ। আমিনুল ইসলাম চৌধুরী : নির্বাচিত রচনা সংগ্রহ, বাংলা একাডেমী : ঢাকা, ১৯৮২ থেকে কাব্য ও ভূমিকা সংগৃহীত; এই সুবাদে বাংলা একাডেমির নিকট আমরা ঋণী।

 

ভূমিকা

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্

“মহাকবি ইকবাল সমাজের পতিত দশা দেখে, ব্যথিত হয়ে তাঁর বিখ্যাত ‘শিকওয়াহ্’ (নালিশ) লিখেছিলেন। তরুণ কবি আমিনুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর জওয়াব লিখেছেন। আশ্চর্য্য! মহাকবির স্বরচিত ‘জওয়াবের’ সাথে এর ভাবগত চমৎকার মিল রয়েছে। কবি আমাকে বলেছেন ‘আমি জওয়াব লিখবার সময় ইকবালের জওয়াবের শুধু নাম শুনেছি, এক লাইনও পড়িনি’ এতে বুঝতে পারি যে মহাকবির বুকে মুসলিম সমাজের জন্য যে দরদ বেজেছিল, এই তরুণ কবির বুকেও সেই দরদ বেজেছে।”  

 

জওয়াব

 

পঞ্চনদের কুঞ্জতলে একটি অধির বুলবুলি,

শূণ্য ডালের চুড়ায় বসি উঠল আকূল সুর তুলি।

স্তব্ধ নিশির বক্ষ ভেদি, তার ‘শেকোয়ার’ তীক্ষ্ম-তীর,

খোদার সুদূর আরশ পানে হাজার হাজার করছে ভীড়।

*

“শোন খোদ শাহান্ শাহ— এই কি তোমার ন্যায্যকাম,

তোমার নামের রদকারীরা পান করে সব বিজয় জাম।

তোমার নামাজ আবাদ করি, সমাজ গড়ে বিশ্বমাঝ,

তাদের শিরে গজব তোমার—এ প্রতিদান বিশ্বরাজ?”

*

“এ দুনিয়ার শান্তি লাগি—করছি মোরা জেহাদ, জয়,

নাস্তিকতার মূলোচ্ছেদি—মোনাফেকীর করছি ক্ষয়।

মোরাই জ্বালাই বিশ্ব-কাবায় তোমার নামের লাল মশাল—

আজকে ডুবি অন্ধকারে—বেদীল তুমি—নাই খেয়াল।”

*

ঝিকমিকি ঐ তারার দলে কি সুর যেন যায় দুলি,

নিশীথ পবন গুম হয়ে তাই শুনছে যে সুর কান তুলি।

ছায়াপথের ওপার হতে কাদের রাখা যায় কাঁপি,

চলছে যে সুর উল্কা সম দূর আকাশের কুল ছাপি।

*

মেঘের জটায় দোল খেয়ে যায় সে সুরেরি অগ্নিকুল,

ছিটকে পড়ে ফুলকি তাহার–শিউরে উঠে জল, অচল।

তীব্র তাহার গন্ধ ধূঁয়ায় ঝরছে গলি আকাশ তল,

অগ্নি ধারায় অন্ধ যেন, কাঁপছে আমার অক্ষিদল।

ঝলকে উঠে সে ধূম হতে দীপ্ত অরুণ স্থির্ জ্যোতি,

ছন্দে তাহার অগ্নি ফোটে—চক্ষু দু’টি জ্বল্ মোতি।

‘ভ্রান্ত, মূঢ়—দেখ চেয়ে ঐ নীলাম্বরের দূর্ পথে,

লক্ষ, কোটি হীরা-মণি নিত্য ঝলে নিজ্ ব্রতে।’

*

দীপ্ত আলোকে ‘বোরাক’ পরে সূৰ্য্য আসে সব ঘরে,

চন্দ্ৰমারি মধুর হাসি সব বেদনা নেয় হরে।

চ্যুত কখন কক্ষ হতে—স্নান হয় কি তার গরিমা—

আপন পথে নিত্য হাসে ছড়াই খোদার মহিমা।

*

মাখলুকাতের সৃষ্টি সেরা তারা মানুষ—মোসলমান,

ফেরেস্তারা উচ্চে তব “মরতোবাতো” করছে দান!

“মনোনীত ধর্ম” তোমার—“খলিফা” তাঁর পৃথ্বি পর,

অগ্নি মরুর গুহা হতে দেয় ছড়িয়ে বিশ্ব ভর।

*

তোমার হাতে দান করিল “জুলফিকারের” তীক্ষ্ণধার

তোমার অশ্ব বল্গা ধরি ‘হিসপানিতে’ করল পার।

“জামশেদেরি জাঁকাল প্রাসাদ” তোমাদেরে করল দান

হিন্দুকুশের চূড়া ভেদি—সিন্ধু জল করলে পান।

*

যুক্ত করে তোমাদেরে—দুই সাগরের মোহনায়

তোমার পণ্য জাহাজ বোঝাই সাত সাগরে দোল যে খায়।

গঙ্গাতীরের শস্য শ্যামল, ‘শিরাজেরি’ রক্ত গুল,

তোমাদেরি তপ্ত চোখের দূর করিল দুঃখ ভুল ।

*

‘রুমের’ চূড়া গুড়া করি গড়ল তোমার ঘর আবাস,

‘পিরানিজের’ বক্ষ ভেদি ‘ফ্রাঙ্ক’ দেশেরে করলো খাস।

‘ভলগা’ নীলের জোয়ার ধারা তোমাদেরে দেয় সালাম,

ভ্রান্তি তোমার দূর করল ‘ইউনানেরি’ পূর্ণ জাম।

তোমাদেরি শূন্য ঘরে পূর্ণ করে নিখিল হুর,

ঠিকরে পড়ে নয়ন হতে প্রাণ রাঙানো মধুর সুর।

বইছে সদা তোদের তরে ‘কওছরেরি’ মধুর জল,

পূর্ণ নিটোল হুরপরী সব—আঁখি তাদের নীলোৎপল।

*

“নিশ্চয় খোদা করেনাক নষ্ট কাহার পূণ্যফল,

হস্ত তাহার সৃষ্টি করে তাহার ধ্বংস হলাহল।”

শুনছ ‘ছামুদ’, ‘ফেরাউনের’ অত্যাচারের মহোৎসব,

হকের কাজি নাজেল করেন, ন্যায় বিচারের স্থির গজব।

*

শুনছ খোদা লুটে কোথা মৌমাছিদের মউ-উৎসব?

অলস কালো পিপীলিকায় দেয় শীতেতে ভোজ্য সব?

শুনছ পাখী ‘হুমায়’ কখন খোদা করেন ম্লান পেচক?

শুনছ কোথা পায়রাদেরে দেয় না তাহার ন্যায্য হক্?

*

আজকে তোমার হৃদয় পাথর শস্য বিহীন সব ফাঁকি,

বন কাঁটাতে কাঁদছে গোলাপ—পড়ছে ঝরে ম্লান আঁখি!

তোমার তাজি অশ্বরা যে সাঁতরে গেল সিন্ধু পার,

গোলামিরি বোঝা বহি আজকে কেন গাধা সার?

*

আজ তোমাদের জুলফিকারে নেই কো কেন ঝিকমিকি?

তোমার মোতি ঝুটা বলে ধরার হাটে নেই বিকি!

তোমার সে তাজ ম্লান হল আজ অধীনতার তেল মাখি—

শূন্য জীবন বেলায় তোমার ঢেউরা কেন দেয় ফাঁকি?

*

কার দোষেতে খানফু কুলে হল তাদের লক্ষ গোর?

‘আলজিরিয়া’ ‘মরক্কোতে’, সুদানে নেই মাটি তোর?

‘সমরকন্দ’, ‘খিবায়’ কেন নিভলো শিখা জ্ঞান-বাতি?

কার দোষেতে তুর্কিস্তানের ঘনাই এল কাল রাতি!

‘মামুদেরি’ গজনী কেন আজ হুতুমের খেলাঘর,

আঁধার কেন এল নামি ‘আল-বেরুণীর’ দেশের পর।

কার নেজাতে খোদারি শের ‘খয়বর’ জয়ী বীর আলী,

মাটির পরে পড়ল লুটাই—বখতে জাতির দেই কালি।

*

বাগদাদেরি বাগে কেন আর গাহে না বুলবুলি,

‘যোবেদারি’ গোলাপেরা চাহে না আজ চোখ তুলি?

হালাক্ হল হাজার মোমেন ক্রূর ‘হালাকুর’ তেগ তলে,

কার দোষেতে বল মোরে বাগদাদেতে আগ্ জ্বলে!

*

বলতে কি খোদার দোষে ‘ফেলেস্তিনে’ ঘর হারা,

সিন্ধুচলা জাহাজ হারাই পানসী বেয়ে পাস ভাড়া?

কার দোষেতে দিল্লী চূড়ায় নিভলো আজাদ প্রাণ-মশাল,

সোনার ‘গৌড়ে’ ঘিরল গহন—হিসে কোথায় সাপ ভয়াল!

*

সৃষ্টি বাগের শ্রেষ্ঠ কুসুম—এই মানুষের কমল দল,

‘আপন’ রুহুর সূর্য্যালোকে গড়ল আজাদ ঝলমল।

বল্ খোদারি কোন্ কালামে সনদ দিল গোলামীর,

কুর্নিশিবে দম্ভী রাজায় নত করি উচ্চ শির!

*

‘তৈমুরলঙ্গের’ নাঙ্গা অসি তাও কি খোদার নাম তরে,

সমরকন্দের গুহা হতে গঙ্গা বধি খুন ঝরে।

খোদার লাগি জয় করিতে ‘নাদির’ এল দিল্লীতে,

লক্ষ এতিম, মুসলমানের ছোরা বসায় তিল্লীতে।

*

খোদারি নাম প্রচারিতে ‘জেয়াদ’ এল কারবালায়,

‘নাস্তিকতার মূলোচ্ছেদে’ ‘সিফিনেতে’ তীর চালায়!

এ দুনিয়ার শান্তি লাগি ‘মাজরাহাতে’ যুঝলে সব,

ভাইয়ের খুনে খেললি হোলি—খুন খারাবির মহোৎসব?

চলবে…

 

মতামত
লোডিং...