একুশের প্রেক্ষাপট : গণতন্ত্রের জন্যই গণতন্ত্রের প্রথাভাঙ্গা

অমর একুশে ২০২১ উদযাপন উপলক্ষে পুনঃপ্রকাশিত

আমার মনে হয় একুশের ঘটনাবলী শুধু ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার এবং এস্টাবলিশমেন্ট বিরোধিতার ইতিহাসই নয়, এর চরিত্রে রয়েছে প্রথা ভাঙ্গার বিচক্ষণ বলিষ্ঠতা। যে-প্রথা স্থবিরতার প্রতীক, যে-প্রথা জাতীয় স্বার্থ বা জাতীয়তার অগ্রগতির পথে বাধা কিংবা আধুনিকতায় মুক্তির পথে সহায়ক নয়, সে প্রথা ভাঙ্গতে পারার অর্থ প্রগতি, প্রগতির পথে পদক্ষেপ। একুশের ভাষা আন্দোলন এক বিশেষ মুহূর্তে সে ধরনের প্রথাই ভেঙ্গেছে। গণতন্ত্রের স্বার্থে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্বার্থেই তাকে নিয়মতান্ত্রিক রীতি ভাঙ্গতে হয়েছে।

আমরা জানি, একুশে ফেব্রুয়ারির পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি নস্যাৎ করার উদ্দেশ্যে বিশে ফেব্রুয়ারি জারি করা হয় ১৪৪ ধারার নিষেধাজ্ঞা, যা সৃষ্টি করে আন্দোলনগত সংকট। আর সেই সংকট সমাধানের জন্য সে রাতে বসে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক। মৌলানা ভাসানির অনুপস্থিতিতে আবুল হাশিম সাহেব সেখানে সভাপতি। সে বৈঠকে অধিকাংশ বিরোধীদলীয় প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। তাদের অনেকেই সে রাতের উত্তপ্ত আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। আলোচনার প্রধান বিষয়, নতুন পরিস্থিতিতে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে একুশের কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ সঙ্গত হবে কিনা?

এ সম্পর্কে দলীয় রাজনীতির মতামত ছিল স্পষ্ট। সামনে নির্বাচন। তাই ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে সরকারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘাতে যাওয়ার মতো হঠকারী পদক্ষেপ নির্বাচন-সংক্রান্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করে দিতে পারে। তাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বার্থে আপাতত জঙ্গীবিরোধিতার পথ পরিহার করে সরকারের সঙ্গে আপোষ-সমঝোতার নীতি গ্রহণই বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে হাশিম সাহেব, কামরুদ্দিন সাহেব, খয়রাত হোসেন প্রমুখ। রাজনীতিক সবাই এই বক্তব্যের উপরই গুরুত্ব আরোপ করছিলেন।

কিন্তু ছাত্র-যুব প্রতিনিধিদের চিন্তা ও বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের ভাষায় : ‘আগামীকাল ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার চেষ্টা না হলে ভাষা আন্দোলন নিয়ে আর এক কদমও এগুনো যাবে না। বাংলা ভাষায় অধিকার আদায়ের আন্দোলন একেবারে পিছিয়ে পড়বে। ছাত্রসমাজের দাবি, কাল ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে পুরো কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাওয়া, এর কোনো বিকল্প নেই। তাতে যা ঘটার ঘটবে।’

ছাত্র-যুব নেতাদের কথাগুলো ভালো ঠেকেনি রাজনীতিকদের কাছে, রীতিমতো হঠকারী বক্তব্য মনে হয়েছে। রাত তখন কম হয় নি। উত্তপ্ত তর্কবিতর্কে বিরক্ত হয়ে অনেকেই চলে গেছেন। কিংবা চলে গেছেন সিদ্ধান্তের দায় এড়াতে। তবু উপস্থিত রাজনীতিকগণ এ বিষয়ে গণতন্ত্র-সম্মত পথে সিদ্ধান্ত নিতে চাইলেন। তারাই সংখ্যায় বেশি। তাই ১১-৩ ভোটে তাদের শান্তিপূর্ণ পথের জয় ঘোষণা করা হলো। ছাত্র-যুব প্রতিনিধিদের ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার দাবি সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে নাকচ হয়ে গেল।

গণতন্ত্রের রীতিনীতি মাফিক সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতই মেনে নেওয়ার কথা। কিন্তু উপস্থিত তিনজন ছাত্র-যুব প্রতিনিধি সেই গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অস্বীকার করেন। কারণ, এর ফলে ভাষার লড়াই, গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রাম ধরে রাখা যাবে না। পরদিন ছাত্রসমাজ অই তিনজনের সংখ্যালঘু সিদ্ধান্তের পক্ষেই সোচ্চার হয়ে ওঠে। ভেসে যায় বিশে ফেব্রুয়ারি রাতের সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত। এই ঘটনাটিকে কি আমরা গণতন্ত্রের প্রতি অসম্মান বা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বরখেলাপ বিবেচনা করবো? রাজনীতিকরা কিন্তু তাই মনে করেছিলেন, এবং সেদিন উচ্চ কণ্ঠে সে কথা বলেছিলেনও। নিয়মতান্ত্রিক বিচারে হয়তো তাই।

কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রথা সব সময় নিহিত সত্যের প্রতিফলন ঘটায় না। বিশেষ করে যখন কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ সেখানে কাজ করে কিংবা সত্যের অনুধাবনে মননশীলতার অভাব ঘটে। বৃহত্তর স্বার্থ বা জাতিগত স্বার্থের খাতিরে রাজনীতি ক্ষেত্রে কখনও কখনও গণতন্ত্রের, তথাকথিত সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত বর্জন করতে হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থেই।

গণতান্ত্রিক প্রথার এহেন দুর্বলতার কথা একেবারে যে আলোচিত হয় নি তাও নয়। একুশে ফেব্রুয়ারি প্রথাভাঙ্গার এই একটি ঘটনার মধ্য দিয়েই তা ঐতিহাসিক তাৎপর্য অর্জন করেছিল। সত্যই যদি একুশে ফেব্রুয়ারিতে আগের দিনকার গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা না হতো, তাহলে আর যাই হোক ছাত্রযুব-জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হতো না, পুলিশের পক্ষেও গুলি চালনার কোনো প্রয়োজন ঘটতো না, তৈরি হতো না বাইশে ফেব্রুয়ারি থেকে গণআন্দোলনের উত্তাল প্রেক্ষাপট। আর তা না হলে একুশে ফেব্রুয়ারি একটি সাদামাটা দিন হিসেবে ক্যালেন্ডারের পাতায় চিহ্নিত হয়ে থাকতো, জাতীয় জীবনের পাতায় লাল অক্ষরে তার ঠাই হতো না। এক কথায়, একুশে ফেব্রুয়ারি ‘মহান একুশে’ হয়ে উঠার সুযোগ পেত না।

আর সে ক্ষেত্রে সাতাশে জানুয়ারির পর থেকে ক্রমশ সংগঠিত হয়ে-ওঠা ভাষা আন্দোলনের চরিত্র বদলে যেতো, এস্টাবলিশমেন্ট বিরোধী আন্দোলনের এবং গণতান্ত্রিক দাবি আদায়ের প্রেরণা হয়ে ওঠা তার পক্ষে সম্ভব হতো না, তৈরি হতো না শহীদ মিনার, যা এখন জাতীয় জীবনের দিকনির্দেশক এবং সব ধরনের প্রতিবাদী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রেরণা ও উৎস। আর সেই ক্ষেত্রে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তো না সারা দেশে, হয়তো সহজ হতো না চুয়ান্ন সালে যুক্তফ্রন্টের গণতান্ত্রিক বিজয়, পিছিয়ে যেতে পারতো স্বাধিকার আন্দোলনের সংগ্রামী সূচনার কালবিন্দু।

 

এতসব ঐতিহাসিক ঘটনার সম্ভাবনা এবং এর ভবিষ্যৎ প্রক্রিয়া নির্ভর করছিল ঐ একটি ঘটনার উপর, অই সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত নাকচ করে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের উপর। এর অর্থ একুশের আন্দোলন যে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রামের সূচনা ঘটিয়েছিল তার পেছনে ছিল গণতান্ত্রিক প্রথাভাঙ্গার ঘটনা। গণতন্ত্রের স্বার্থে জনগণের স্বার্থেই তথাকথিত গণতান্ত্রিক প্রথাভাঙ্গার ঘটনা। গণতন্ত্রের স্বার্থে জনগণের স্বার্থেই তথাকথিত রীতি ভেঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল। জাতীয় জীবনে মাঝে মধ্যে এ ধরনের প্রয়োজন দেখা দেয়, ডাক পড়ে প্রথা ভেঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার, এবং তখন সেই ডাকে সাড়া না দিতে পারাটা হয় মস্ত ভুল, রীতিনীতির দোহাই পেড়ে পেছন ফেরাটা হয়ে ওঠে অনুচিত, অদূরদর্শিতার কাজ। শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বরাজনীতির দিকে তাকালেও বৃহত্তর জনস্বার্থে গণতান্ত্রিক রীতি বা প্রথা ভাঙ্গার প্রয়োজন দেখতে পাই।

 

জনগণ গণতান্ত্রিক শক্তির উৎস। এই সত্য জেনেও অনেক সময় ভেবে দেখা দরকার পড়ে, যে দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ অশিক্ষা এবং নানা ধরনের সংস্কারের অন্ধকারে বাধা পড়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক চেতনার প্রকৃত প্রতিফলন কতটা সম্ভব, এবং গণতন্ত্রের ব্যবহার কতখানি সফল হতে পারে। রাজনীতির কূটকৌশলে জনগণকে ভুল বুঝাতে পারা বড় একটা কঠিন কাজ নয়। এমন সব ক্ষেত্রে অর্থের জোরে বা ধর্মান্ধতার স্লোগানেও অনেক সময় জনমত গড়ে তুলতে দেখা যায়। তখন গণতন্ত্রের বোধ, গণতন্ত্রের প্রকাশও অপশক্তির পক্ষে যেতে পারে। এমনি করেই জনগণকে অন্ধপথে টেনে নিয়ে বিশ্বে ফ্যাসিবাদী শক্তির অভ্যুত্থান ঘটতে দেখা গেছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের ভুলভ্রান্তি, ব্যর্থতা থেকে মৌলবাদী শক্তিকে জনসমর্থন আদায় এবং শক্তি সঞ্চয় করতে দেখা গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঐসব অন্ধশক্তি গণতন্ত্রী বা সমাজতন্ত্রীদের ভুল রাজনীতির ফসল হিসেবে উঠে এসেছে। তাদের রাজনৈতিক কৌশল, কমনীতি ও কর্মপন্থার ভুল তখন গণতন্ত্রের সর্বনাশের পথ খুলে দেয়। উদাহরণ হিসেবে ইরানের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ধর্মীয় মৌলবাদের ক্ষমতা দখলের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা যায়। তেমনি গণতন্ত্রের দ্বিধা সংশয় দ্বন্দ্ব থেকে ইন্দোনেশিয়ায় স্বৈরতন্ত্রের উত্থানও চোখ খুলে দেবার মতো ঘটনা। এখানে গণতান্ত্রিক রীতিনীতির সহিষ্ণু হিসাব-নিকাশ স্বৈরতন্ত্রের বিজয় নিশ্চিত করেছে বলা যায়। এবং সমাজতন্ত্রী ও তাদের। সহযোগীদের রক্তের বন্যায় দেশ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি আলজিরিয়াতে মৌলবাদের নির্বাচনী বিজয় উল্লিখিত কার্যকারণের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আলজিরিয়ায় জাতীয় মুক্তি ফন্ট একদা ফরাসি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষ করে দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল। সোস্যাল ডেমোক্র্যাট চরিত্রের ঐ রাজনৈতিক দল নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির মাধ্যমে দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিরও সূচনা করেছিল। পরে ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, দলীয় সংকীর্ণতা, অন্তর্দলীয় কলহ, দুর্নীতি এবং আরো নানা কারণে সমাজ ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছে হতাশাজনক পরিস্থিতি। সেই সঙ্গে বর্ধমান বেকারত্ব ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সমস্যা। এই অবস্থার সুযোগ নিয়েছে উঠতি ধর্মীয় মৌলবাদ। অর্থনৈতিক আশ্বাস এবং ধর্মীয় আশ্রয়ের বাণী নিয়ে মসজিদগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক প্রচারের কেন্দ্রস্থল হিসেবে উঠে এসেছে, এমন কি নির্বাচনেও জয়ী হয়েছে মৌলবাদী রাজনৈতিক শক্তি ‘ইসলামি স্যালভেসান ফ্রন্ট’, যাকে অগণতান্ত্রিক রীতিতে নাকচ করে দিয়েছে আলজিরিয়ার ক্ষমতাসীন দল, অবশ্য সামরিক শক্তির সহায়তা নিয়ে। আলজিরিয়ার পরিস্থিতি বিশ্বের শক্তিমান দেশগুলোকে নীতিগত দিক থেকে কঠিন সমস্যায় ফেলে দিয়েছে। তারা না-পারছে গণতান্ত্রিক নির্বাচন বাতিল করে দেওয়া শাসকগোষ্ঠীকে সমর্থন করতে, না পারছে জানের দুশমন ইরানি মৌলবাদের নতুন দোসরদের জন্য গণতন্ত্রের পক্ষে সোচ্চার হতে। গণতন্ত্রের রীতিনীতি হয়ে উঠেছে তাদের গলার কাটা। আলজিরীয় রাজনীতির এই নীতিগত সমস্যা একুশের গণতান্ত্রিক প্রথাভাঙ্গার প্রয়োজনের কথাই মনে পড়িয়ে দেয়। গণতন্ত্রের নীতিভঙ্গ গণতন্ত্রীদের কাম্য হতে পারে না ঠিকই, কিন্তু এর চেয়েও অবাঞ্ছিত কট্টর মৌলবাদী শাসন যা গণতন্ত্রের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় ধর্মীয় স্বৈরশাসন। ইরানে, ইন্দোনেশিয়ায় এদের হত্যাযজ্ঞ এবং

রক্তস্নানের স্মৃতি গণতন্ত্রীদের ভুলে যাওয়ার কথা নয়। মধ্যযুগীয় মোল্লাতান্ত্রিক আইন প্রবর্তন, নারী স্বাধীনতা ও সর্বজনীন বাকস্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকার বিনাশ করেই মৌলবাদী শাসন কায়েম হয়ে থাকে। তাই স্বৈরতন্ত্রের অনাচারের বিরুদ্ধে অনেক সময় গণতন্ত্রের প্রথা ভেঙ্গেই গণতন্ত্রের ভিত শক্ত করতে হয়।

যে রাজনীতি গণতন্ত্রের রীতিনীতি মেনে চলে, একমাত্র তার সঙ্গেই গণতন্ত্রের নিয়মতান্ত্রিক বা পদ্ধতিগত আচরণ যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু সে আচরণ চলে না ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরতন্ত্রী শাসনের সঙ্গে, এমন কি ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির সঙ্গেও চলে না। কারণ, তাদের চরিত্রে রয়েছে স্বৈরতান্ত্রিক ও একনায়কী নির্মমতা।

রাজনৈতিক স্বার্থের টানে তারা প্রতিপক্ষের রক্তস্নানেও অস্বস্তিবোধ করে না। এ সম্পর্কে অতীত ও বর্তমান ঘিরে আমাদের চোখের সামনে রয়েছে বহুসংখ্যক উদাহরণ। তাই এ ধরনের অশুভ শক্তি বা স্বৈরাচারী শক্তির মোকাবিলায় গণতন্ত্রের রীতি তাৎক্ষণিকভাবে ভাঙ্গা অন্যায় আচার নয়। গণতান্ত্রিক রীতিনীতির ব্যবহারিক তাৎপর্য বিচার করে, এর কল্যাণী সম্ভাবনা ওজন করে নিয়ে তবেই গণতান্ত্রিক আচরণের মানদণ্ড নির্ধারণ করা উচিত। অন্যথায় প্রথার জন্য প্রথারক্ষা দেশের বা সমাজের জন্য কোনো প্রকার কল্যাণ বয়ে আনে না। সে দিক থেকে দেখতে গেলে ভারতীয় গণতন্ত্রও স্রেফ প্রথার প্রয়োজনে প্রথার মর্যাদা রাখতে গিয়ে গোটা দেশটাকেই শুধু নয়, গণতন্ত্রকেও হুমকির সম্মুখীন করে তুলেছে। সম্প্রতি অযোধ্যার এবং এর সংশ্লিষ্ট ঘটনা তাই প্রমাণ করে। ভারতীয় গণতন্ত্র তার নিয়মতান্ত্রিক ঐতিহ্য ভেঙ্গে সেখানকার মৌলবাদী সংগঠন নিষিদ্ধ করতে পারলে এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারলে সাম্প্রতিক অঘটন এবং রক্তক্ষয় ঘটতো বলে মনে হয় না। দেশের ভবিষ্যৎ সংহতি এবং সাংবিধানিক মূলনীতি হুমকির সম্মুখীন হতো না। এখানেই বিশেষ ক্ষণে গণতন্ত্রের প্রথাভাঙ্গার রাজনৈতিক, সামাজিক গুরুত্ব।

 

আমাদের দেশে একুশে-পরবর্তী রাজনীতি, এমন কি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঐ প্রথাভাঙ্গার বিষয়টি যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক।

যে রাজনৈতিক শক্তি গণতন্ত্রের চারিত্রে আস্থাবান না হয়ে স্বৈরতন্ত্রী চরিত্রের ধারক হয়ে ওঠে, সেই বিশেষ ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের খাতিরেই গণতান্ত্রিক আচরণ অযৌক্তিক ও অসঙ্গত হয়ে ওঠে।

আমরা দেখেছি এ দেশে নানা কৌশলে গণতন্ত্রের পথ বিপর্যস্ত করে দিয়ে স্বৈরতন্ত্রী শাসনের উত্থান ঘটতে। ভবিষ্যতেও যে ঘটবে না এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই, বিশেষ করে ধর্মান্ধ মৌলবাদী রাজনীতির ক্ষেত্রে। একাত্তরে যে পশুশক্তি সামরিক শাসনের সহায়তায় এদেশে চরম বর্বরতার প্রকাশ ঘটিয়েছে, বর্তমানে গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতার নামে সে সম্পর্কে সতর্কতার অভাব ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অনুশোচনার কারণ হতে পারে। তাই তেমন সব ক্ষেত্রে প্রথাভাঙ্গা গণতন্ত্রের ঐতিহ্যই আমাদের অনুসরণ করতে হবে, যে-ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছে বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, তার রাজনীতি-সচেতন ছাত্রযুবগোষ্ঠী। এরা প্রথা ভেঙ্গেই গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করতে চেয়েছে, শক্তিশালী গণতন্ত্রের ভিত গড়ে তুলতে চেয়েছে।

একুশের সেই প্রথাভাঙ্গার ঐতিহ্য আমাদের আরো শিক্ষা দিয়েছে এবং সেইসঙ্গে এমন সত্যও বুঝিয়ে দিতে পেরেছে যে, গণতন্ত্রের পথ কখনোই আপোষবাদিতার নয়, এবং গণতন্ত্রের নামে আপোষবাদিতার নীতি গণতন্ত্রের ক্ষতিই করে থাকে, তাকে অবশেষ লক্ষ্যে পৌঁছতে দেয় না। তাই বৃহত্তর রাজনীতির ক্ষেত্রেও একুশের এই প্রথাভাঙ্গার রীতি দেশে সুস্থ গণতন্ত্রের বিকাশ ও বিস্তারে সহায়তা করতে পারে। এখানেই প্রথাভাঙ্গার ব্যবহারিক তাৎপর্য।

 

(ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও কিছু জিজ্ঞাসা : আহমদ রফিক, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৮, ৭-১১ পৃষ্ঠা থেকে সংগৃহীত— কর্তৃপক্ষের নিকট আমরা ঋণী।)

 

মতামত
লোডিং...