স্মৃতিবিলাস (নবম পর্ব) || জিনাতুননেছা জিনাত

বিশ্বায়নের এই যুগে যেখানে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের অনেকে বিদেশি সংস্কৃতি নিয়ে মেতে থাকে, সেখানে এসব কোনোকিছুই আমাকে প্রভাবিত করে না। সাধারণ জীবন-যাপন আমার ভালো লাগে। আমার সামাজিক সত্ত্বা-বিকাশে গণমাধ্যম হিসাবে সংবাদপত্রের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। অবসরে পড়তে ভালো লাগে, লিখতে পছন্দ করি, এই অভ্যাসগুলো হয়েছে সংবাদপত্রের বদৌলতে।

প্রত্যেকের জীবনে ধর্মীয় বিষয়ের একটা প্রভাব থাকে। নামাজ-কালাম ছাড়াও সত্য বলা, বিপদে মানুষকে সহায়তা করা, অন্যের দুঃখে ব্যথিত হওয়া প্রভৃতি নৈতিক শিক্ষাগুলো আব্বার কাছ থেকেই শিখেছি। অনেক ছোটবেলায় ঘুমের আগে আব্বা ছোট ছোট দোয়া-কালামগুলো মুখেমুখে পড়াতেন। সেগুলোর মধ্যে আয়তাল কুরসী, দরূদ শরীফ, খাওয়ার দোয়া, পোশাক পরিধানের দোয়া এগুলোর কথা মনে আছে। নিয়মিত নামাজ পড়া, কোরআন তেলাওয়াত করা এবং রমজানের রোজা রাখার বিষয়ে বিভিন্নভাবে গল্পের ছলে বোঝাতেন। ফজরের নামাজের জন্য আমাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়ে আব্বা মসজিদে চলে যেতেন, আমরা একটা ঘর থেকে উঠে চোখ ডলতে ডলতে অন্য ঘরে গিয়ে আবার ঘুমিয়ে যেতাম। আব্বা মসজিদ থেকে ফিরে দ্বিতীয় দফায় আবার তাড়া দিলে পড়িমরি করতে করতে কোনমতে ওজু করে নামাজ পড়ে নিতাম।

 

রোজা রাখা শুরু করেছি সম্ভবত ৭-৮ বছর বয়সেই। আমার এইচএসসি পরীক্ষার সময়ে জৈষ্ঠ্যের প্রচণ্ড খরা চলছিল, তখন রমজান মাস। একদিনে দুটো পরীক্ষা, মা একটু ভয়ে ভয়ে আব্বাকে অনুনয় করে বলছিলেন, এত পড়াশুনার চাপ, একটা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দেবে মেয়েটি, এখন রোজাগুলো একটু ভেঙে ভেঙে রাখলে হয় না, অনেক দুর্বল হয়ে গেছে। আব্বা খুব স্বাভাবিকভাবে বলেছিলেন, রোজা কখনও পরীক্ষার ক্ষতি করতে পারে না, তাছাড়া দুনিয়ার পরীক্ষার অজুহাতে পরকালের পরীক্ষাটা খারাপ করা কি উচিত?

 

এত সুন্দর করে সাহাবীদের গল্পগুলো বলতেন, আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। মায়ের মুখের দিকে তাকালে যে কবুল হজের সওয়াব পাওয়া যায়, এই হাদিসটি প্রায়ই বলতেন। হালাল রিজিক প্রসঙ্গে হারাম খাওয়ার ভয়াবহতা বর্ণনা করতেন বেশি, “এই মনে করো, হারাম অর্থ যদি কোনভাবে চলে আসে, সেটা দিয়ে কোন খাবার খাওয়া হয়, তাহলে একবিন্দু হলেও রক্ত তৈরী হবে শরীরে। তারপর সেই রক্ত মিশে যাবে শরীরের অন্য রক্তের সাথে। তখন কি হালাল বা হারাম রুজি আলাদা করা যাবে? শরীরের পুরো রক্তই তখন হারাম হয়ে যাবে।”

 

আমানতের বিষয়েও অনেক গল্প বলতেন। “প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর শত্রুরা পর্যন্ত প্রচণ্ড বিশ্বাস করতেন। বিভিন্ন জিনিস রেখে যেতেন। নবীজি সেগুলো নির্ধারিত সময়ে ফেরত দিতেন; শুধু তাই নয়, মনে করো পাঁচশ টাকা কেউ রেখে গেছে, সেটা কোন কাজে খরচ করে আবার তাকে ফেরত দেওয়া নয়, বরং যে কয়টি নোট সে রেখেছে ঠিক সেইগুলোই তাকে ফেরত দিতেন।”

 

কি অদ্ভুতভাবে আমরাও মেনে নিতাম আব্বার সিদ্ধান্তগুলো। তিনি নিজে ধর্মপ্রিয় মানুষ ছিলেন, তবে গোঁড়া নন। আমাদের মাঝেও সঞ্চারিত করেছেন সেই অনুভূতিগুলো। আমাদের বাসার সামনে রাস্তার ঠিক ওপাশে নারকেল গাছে চারপাশ ঘেরা বড় একটা পুকুর ছিল। পুকুরের চারদিকের পাড়সহ বিশাল একটা জায়গা ছিল আমাদের। পুকুরের মাছ এবং পাশের গাছগুলোর দেখাশোনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল গনি মিয়াকে। একদিন দুপুরে মেজ আপা কলেজ থেকে ফেরার সময় দেখতে পেলেন, কে যেন নারকেল গাছে বসে আছে। আপা হাঁপাতে হাঁপাতে বাসায় ঢুকে আব্বার হাত ধরে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি চলেন, আজ চোর-কে হাতেনাতে ধরা যাবে।’ আব্বার সাথে আমরাও গেলাম। আব্বা ঠিকই চোর-কে চিনতে পেরেছিলেন। তিনি স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন, “গনি মিয়া নারকেল পাড়ছো নাকি? আমার বাসায়ও নারকেল দরকার। তাহলে তুমি কয়েকটা নিও, আর বাকিগুলো বাসায় পৌঁছে দিও, কেমন?”

‘জি স্যার! জি স্যার…’ গনি মিয়া ভীত কণ্ঠে বলেছিল।

বেশ কিছুদিন পর আমরা জানতে পেরেছিলাম, গনি মিয়া কিভাবে যেন অন্য এক উকিলের সহায়তায় জায়গাটা নিজের নামে জাল দলিল করে নিয়েছে। এই খবরে আব্বা খুব ব্যথিত হলেন! তবু তিনি আমাদেরকে ডেকে বললেন, “দিয়ে ধন বুঝে মন, কেড়ে নিতে কতক্ষণ? তোমরা কোন চিন্তা করো না, পরকালে ঐটুকুই আমাদের থাকবে।” সেদিন অনুভব করেছিলাম, সকলের মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাস থাকা খুব জরুরী, তাহলে সমাজ সংসারের নানারকম জটিলতা থেকে সহজে বাঁচা যায়। সৎ, আদর্শ, পঙ্কিলতামুক্ত জীবন যাপনের জন্য ধর্মীয় অনুশাসনের সত্যিই কোন বিকল্প নেই।

 

কিছুদিন থানা পুলিশ করার পর আব্বা ঐ জায়গাটার বিষয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন! এর মাঝে ঢুকে পড়েছিল আরেক ঠিকাদার, পুকুরের যে পাশে তার বাড়ি ছিল, এমনিতেই সেদিকের কিছু অংশ দখল করে রেখেছিল সে। আরও অনেক বছর পর সেঝো আপা আইনজীবি হবার পর পুনরায় ঐ জায়গার কেসটি উত্থাপন করেছিলেন। আব্বা যদিও ঝামেলায় যেতে রাজি ছিলেন না, শেষমেশ নামমাত্র মূল্যে ঐ ঠিকাদার সম্পূর্ণ জায়গাটি নিজের নামে দলিল করে নেন।

 

সামাজিক বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠানও সামাজিক সত্ত্বা বিকাশের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু মনে পড়ে না। আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণেই হয়ত সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ বা পারিবারিকভাবে জন্মদিন, বন্ধুদের সাথে পার্টি এসব আমাদের বাড়িতে হত না। তবে মাঝে-মাঝে বিশেষ কোন কারণে মিলাদ দেয়া হত, নানাভাই, দাদাভাইয়ের কথা স্মরণ করে দোয়া করা হত, কোরআন খতম, এতিমদের খাওয়ানো ইত্যাদি। সামাজিক অনুষ্ঠান বলতে দুই ঈদ-ই ছিল প্রধান। আশেপাশের বন্ধুদের বাড়িতে যাওয়া-আসা হত, এটাই অনেক আনন্দের বিষয় ছিল।

 

যদিও আমার সামাজিক সত্ত্বা বিকাশে বিভিন্ন বাহনের কথা বলছিলাম, তবুও প্রায় সবক্ষেত্রে আব্বার কথা চলে এসেছে। কারণ তাঁর হাত ধরেই মূলত সবকিছু শিখেছি। আব্বার পেশা জীবন, পারিবারিক জীবন সবই ছিল নিতান্ত সাধারণ, তাই হয়ত আমারও সাধারণ জীবন যাপন ভালো লাগে, সেভাবেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি। বাবা-মাকে ছেড়ে অনেক দূরে এসে সংসার করছি, আর এখন তো তাঁরা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন, তবুও যে কোন কাজের ক্ষেত্রে তাঁদের আদর্শের কথাই প্রথমে মনে পড়ে। যে কোন কাজ শুরুর আগে ফোন করে কেবল দোয়া চেয়েছি, তাতেই নিশ্চিন্ত নির্ভরতা কাজ করেছে মনের ভেতর। দূরে কোথাও যাবার আগে শুধু বলেছি, যাচ্ছি। ব্যস! মনে হয়েছে তাঁদের দোয়ায় নিরাপদে পৌঁছতে পারবো।

 

এখন আমার নিজের একটা পরিচয় আছে, মানুষ গড়ার এক নিভৃতচারী সেবক। নিজের অজান্তে মাঝে-মাঝে মনে হয়, সুযোগ পেলে হয়ত আরও ভালো কিছু করতে পারতাম। আমার সহপাঠীদের অনেকেই পেশা জীবনে ভালো অবস্থানে আছে। নূপুর শিশু বিশেষজ্ঞ, নেওয়াজ বিখ্যাত প্রকৌশলী হিসাবে আমেরিকার ভার্জিনিয়াতে আছে, কামরুল সিলেট প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়র শিক্ষক, জামিনূর নৌবাহিনী কলেজের শিক্ষক, তুহিন নিজেই একটা শিল্প প্রতিষ্ঠান চালায়, আন্না ক্যালিফোর্নিয়ায় ভালো চাকরি করছে, পলিন নিউইয়র্কে…

 

একটা শিশুর সামাজিকীকরণ প্রথমত তার পরিবার থেকেই শুরু হয়। এরপর সেটা নির্ভর করে বিদ্যালয়, সমবয়সী দল, গণমাধ্যম, সামাজিক আচার অনুষ্ঠান প্রভৃতি ক্ষেত্রের উপর। শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের ক্ষেত্রে পরিবারের আয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আমার ছেলেবেলায় আর্থিক অস্বচ্ছলতা বা দুঃখ-দৈনতা ছিল বটে কিন্তু তারমধ্যেও অনেক কিছু শিখেছি যেটা এখন সেই অর্থে অভাব না থাকলেও আর সেভাবে সম্ভব হয় না। জীবনের নিগূঢ় শিক্ষা থেকে যেটা অনুভব করেছি, মানবশিশুর সামাজিক সত্ত্বা বিকাশের জন্য তার ভেতর অবশ্যই মজবুত একটা ভিত্তি তৈরী করে দিতে হবে পরিবার থেকে, তবেই সে নিজের জন্য, সমাজের জন্য, দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনতে পারবে।

১৮/০৪/২০২১

(চলবে)

মতামত
লোডিং...