বৈশ্বিক ভ্যাক্সিন-রাজনীতি ও আমাদের করণীয়

 

প্রায় দেড় বছর হতে চললো, পৃথিবীতে কোভিড-১৯ ভাইরাসের আগ্রাসন চলমান। চীনের উহান অঞ্চল এই ভাইরাসটির উৎপত্তিস্থল হলেও ইতোমধ্যেই এটি পৃথিবীর প্রায় সবকটি দেশে নিজের বংশবৃদ্ধিকরণ বেশ জোরালোভাবে চালিয়ে গেছে। এই মহামারি পৃথিবীর অনেক হিসেব-নিকেশ পাল্টে দিয়েছে। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা বৈদেশিক সবকিছুরই পরিবেশ ও প্রতিবেশের সরল ঘড়ির কাঁটা বদলে দিয়েছে আকস্মিকভাবে। কেনাকাটা, শিক্ষাদীক্ষা কিংবা বিনোদন সবই হয়ে উঠেছে অনলাইন-নির্ভর।

 

বদলেছে মানুষের সাথে মানুষের স্বাভাবিক মিথস্ক্রিয়ার ধরণ। ছোঁয়াছে রোগ বলে বহুমুখী পরীক্ষার সম্মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে চিরায়ত রক্তের সম্পর্ককেও। ফলে এদেশে যেমন আমরা দেখেছি, অসুস্থ মাকে জঙ্গলে ফেলে চলে গেছে পেটের সন্তানেরা, কিংবা স্বামীর লাশকে ভয়ে ছুঁয়ে দেখছে না প্রিয়তমা স্ত্রী। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও দেখা গেছে, সংক্রমিত হবার ভয়ে কন্যাকে তার অসুস্থ বাবার মুখে পানি পর্যন্ত তুলে দিতে দিচ্ছেন না স্বয়ং মা, যার খানিক পরেই মৃত্যুবরণ করেন হতভাগ্য ব্যক্তিটি। স্পষ্টতই, এই দুঃসময়ে গভীর সংকটে পতিত হয়েছে মানবতা।

 

বিশেষজ্ঞরা তাদের গবেষণা থেকে নানা তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে দেখাচ্ছেন ও বিশ্ববাসীদের বলে বুঝাতে চাইছেন যে, করোনা পূর্ববর্তী ও করোনা পরবর্তী পৃথিবী কখনোই এক হবার নয়। ইতোমধ্যেই দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো ‘দ্য নিউ নরমাল’ নামক একটি টার্ম ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে। আমরা জানি যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) প্রজ্ঞাপন জারি করে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে কিভাবে প্রবল প্রতাপশালী এই ভাইরাসটি সংক্রমিত হয়ে থাকে মানুষ থেকে মানুষে৷ মূলত মানুষের সংস্পর্শ ও হাঁচি-কাশি থেকে এটি ছড়ায়- এজন্য কিছু নির্ধারিত ‘স্বাস্থ্যবিধি’ ও ‘সামাজিক দূরত্ব’ মেনে চলার জন্য জোর আহ্বান জানিয়েছে তারা। এমতাবস্থায় মানুষ পূর্বের মতো পরস্পরের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হবার পরে করমর্দন কিংবা কোলাকুলি করতে সংকোচ বোধ করছে, ভয় পাচ্ছে। কেউ স্বেচ্ছায়, আবার কেউ জরিমানার ভয়ে মাস্ক পরা ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না।

 

মহামারি বিশ্বব্যপী ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তোড়জোড় শুরু হয় এর টিকা তৈরি করার জন্য। পরাশক্তিগুলোকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে ক্ষুদ্র এই ভাইরাসটির টিকা তৈরী করতে। মহামারির প্রারম্ভে জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউএসএ এবং নোবেল বিজয়ী অনেক বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিবিদ, লেখক এবং কবি দাবি করেছিলেন যে করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে যেন ঘোলাটে রাজনীতি না হয়। মানবতার খাতিরে করোনার টিকাকে যাতে সহজলভ্য করা হয় এবং তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলো যেন সহজে টিকা সংগ্রহ করতে পারে। শুরুর দিকে আসন্ন মহামারির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে অনেক দেশ রাজি হলেও, টিকা উৎপাদন যখন শুরু হলো তখন বিশ্বনেতাদের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা যায়নি।

 

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়ার মতো পরাশক্তি দেশগুলো ও টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান শুরু করে দেয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। অনেক প্রতিষ্ঠান টিকার ফর্মুলা গোপন রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে গেছে, চালাচ্ছে। কিছুদিন আগেই বিল গেটসও বলেছেন, ফর্মুলা উন্মুক্ত করা হবে না অপব্যবহারের ভয়ে। এতে গরিব দেশগুলো টিকা না পাওয়ার আশঙ্কায় আছে। সমালোচনা হচ্ছে, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় বিল গেটসের মতো সর্বেসর্বা লোকেরা বিগ ফার্মার স্বার্থ দেখবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। যেকোনো সংকটকে নিজেদের মুনাফা লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য সদা প্রস্তুত থাকে তারা।

 

পৃথিবীর অনেকগুলো দেশ টিকা তৈরীতে কাজ করে যাচ্ছে শুরু থেকেই। তারপর হঠাৎ দেখা গেলো করোনার টিকা নিয়ে বিশ্ব দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ওষুধ কোম্পানিগুলো। অন্যদিকে রয়েছে চীন ও রাশিয়ার ওষুধ কোম্পানিগুলো। সবার আগে টিকার অনুমোদন দিয়েছে রাশিয়া। এ সংবাদ প্রকাশের পরপরই পশ্চিমা গণমাধ্যম ও তাদের অনুসারীরা রাশিয়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে এদেশের একশ্রেণির কতিপয় নির্বোধ লোক রাশিয়া ও পুতিনকে নিয়ে অহেতুক বিদ্রুপে মেতে উঠেছে পৃথিবীর এ চরম দুর্দিনেও। রাশিয়ার টিকা কতটা মানসম্পন্ন, প্রচলিত নিয়মকানুন মানা হয়েছে কি না, এসব নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়। অনেকে রাশিয়ার টিকাকে বাতিলও করে দিয়েছে। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে রাশিয়ান টিকা সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং দেখা যায় তাদের টিকার কার্যকারিতাই প্রকৃতপক্ষে সবচেয়ে বেশি।

 

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার এই যে, করোনা ভাইরাস মহামারির বিরুদ্ধে লড়াই করতে শুরু হওয়া ভ্যাকসিন অনুসন্ধান, এই শতাব্দীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং রাজনীতিমিশ্রিত বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টায় পরিণত হয়েছে। এখানে বিগ ফার্মাকে একা দোষ দেওয়া যায় না। কারণ প্রশাসনিক উদ্যোক্তা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির প্রধানেরা এই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানকে কূটনীতিক স্বার্থরক্ষার হাতিয়ারে রূপান্তরিত করেছে। নগ্নভাবে ধরা পড়েছে ওয়াশিংটনের রুশ ভ্যাক্সিনবিরোধী প্রোপাগাণ্ডা। এ যেন নব্য শীতল যুদ্ধ!

 

এদিকে নিজেরা উৎপাদন না করলেও ভ্যাকসিন রাজনীতিতে নিজেদের ঝানু খেলোয়াড় মনে করছে ভারত। ভারতের কয়েকটি ওষুধ কোম্পানি পুনে সিরাম ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডের টিকা আমদানির ঘোষণা দিয়েছিল বেশ কিছু মাস আগে। ভারত চেয়েছে, তার প্রতিবেশী দেশগুলো ভারতের মাধ্যমে টিকা কিনুক। এতে করে সে দক্ষিণ এশিয়ায় তার আধিপত্যবাদী প্রভাব বিস্তারের পথে আরেকটি মাইলফলক অর্জন করবে বলেই মনে প্রাণে বিশ্বাস করে। শুরুতে চীন বাংলাদেশে তার টিকার ট্রায়াল দিবে এরকম একটি ঘোষণা শোনা গেলেও বহুমুখী সমালোচনা কিংবা চক্রান্তে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। ঘুরেফিরে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশকে ভারত কব্জায় নেয় এবং কূটনৈতিক সফলতা অর্জন করে। বাংলাদেশ সরকার বেক্সিমকো ফার্মাসিকে ভারতের সিরামের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে টিকা আমদানি করার অনুমতি দেয়। যদিও তখন বাতাসে গুঞ্জন ভেসে বেড়াচ্ছিলো রাশিয়া থেকেই টিকা আমদানি করলে সবচেয়ে ভালো হতো।

 

প্রথম ধাপে, ভারত থেকে টিকা আমদানি করে দেশের করোনা রাগীদের শরীরে প্রয়োগ করা হয়। এই মামুলি টিকা দেওয়া নিয়ে দেশে শুরু হয় এলাহি কাণ্ড। দেশের মন্ত্রীমহোদয়রা ও সরকারি আমলা কামলারা যেন ভুলেই গিয়েছিলো ছবি তুলে ফেসবুক শত শত পোস্ট না করেও নির্বিঘ্নে টিকা নেওয়া যায়। টিকা উৎসব ভালোই চলছিলো। কিন্তু হঠাৎ এপ্রিলে ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এসে ভয়াবহ তাণ্ডব চালানো শুরু করে। হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে এবং অক্সিজেনের অভাবে দিল্লির রাস্তা-ঘাটে রোগীদের মরে পড়ে থাকতে দেখা যায়। শব পোড়ানোর জন্য দিল্লির শ্মশানে জায়গা পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছিলো না। এমতাবস্থায় ভারত সরকার টিকা রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। বেক্সিমকোকে দিয়ে কোটি টাকার চুক্তি করিয়ে মহাবিপাকে পড়ে বাংলাদেশ। শুরু হয় সরকারি কর্তাকর্তা ও বেক্সিমকোর হর্তাকর্তাদের ইঁদুর বিড়াল খেলা।

 

ভ্যাক্সিন জাতীয়করণের ফলশ্রুতিতে সব রাষ্ট্র আগে তার দেশের মানুষের টিকা নিশ্চিত করতে চাইছে স্বাভাবিকভাবেই। এদিকে গরিব দেশগুলোর ঠিকমতো টিকা পাওয়া অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তবে আশার খবর হচ্ছে, কিউবার ভ্যাকসিন নীতি। কিউবার স্বাস্থ্য খাত অনেক উন্নত। করোনার টিকা তারা নিজেরাই তৈরি করছে। তারা এখন ভ্যাক্সিন ট্রায়ালের তৃতীয় পর্যায়ে আছে। কিউবা বলেছে যে, তারা গরিব দেশগুলোকে করোনা টিকা দেবে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খরব অনুযায়ী কিউবা ইতোমধ্যে গরিব এবং উন্নয়নশীল কিছু দেশের কাছ থেকে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডোজের অর্ডার পেয়েছে।

 

বছর ছয়েক আগে পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় ধনী ব্যক্তি বিল গেটস, টেড টকে তার একটি বক্তব্যে মহামারির ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন। বিল গেটস কোনো হেলথ এক্সপার্ট নন। তার প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট বিশ্বজুড়ে কম্পিউটার ও সফটওয়্যার বেচে থাকে। কাকতালীয়ভাবে কোভিড-১৯ সম্পর্কে তার ভবিষ্যৎবাণী সত্যে পরিণত করেছে। ভ্যাক্সিনের ফর্মুলা উন্মুক্তকরণে অনিচ্ছুক বিল গেটস কিছুদিন আগে আরেকটি বক্তব্যে বলেছেন, সামনের দিনগুলোতে কোভিড-১৯ এর চেয়েও ভয়ানক ভাইরাস আগ্রাসন চালাতে পারে পৃথিবীতে। প্রাণ হারাতে পারে কোটি কোটি মানুষ! এ বক্তব্যের পর চটেছেন এক শ্রেণির প্রতিক্রিয়াশীল মানুষ। তাদের দাবি, আমেরিকার সবচেয়ে বেশি কৃষিজমির মালিক, আধুনিক জমিদার বিল গেটসই নতুন ব্যবসায়িক স্বার্থে চীনকে দিয়ে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছেন। অবশ্য বিল গেটস নিন্দুক ও কুৎসা রটনাকারীদের মাথামোটা উন্মাদ বলে অভিহিত করে তাদের এহেন অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

 

পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে ‘জ্যোতিষী’ বিল গেটসের আশঙ্কা সত্যিও হতে পারে। তাছাড়া ভ্যাক্সিন নিয়েও পরাশক্তি দেশগুলোর নোংরা রাজনীতি ও কুৎসিত কূটনীতি বাড়বে বৈ কমবে না। এটা বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য অশনিসংকেত। তারা ভ্যাক্সিন ও উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জামের জন্য সবসময় পরাশক্তি দেশগুলোর দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকে। তাই বাংলাদেশকে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। এ মাটির ছেলেমেয়েরা যথেষ্ট মেধাবী। অনেকেই নামিদামি বিদেশি প্রতিষ্ঠানে সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। সরকারের উচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতে অধিক অর্থ বরাদ্দ দেওয়া এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রণয়ন করে দ্রুত স্বনির্ভরতা অর্জন করা। যাতে ভ্যাক্সিন ও চিকিৎসা সরঞ্জামের জন্য কারো মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে না হয়।

মতামত
লোডিং...