ঈদ-উল-ফিতর || মোহাম্মদ ওয়াজেদ || আলী প্রবন্ধ

 

ঈদ-উল-ফিতর অর্থ ফেতরার আনন্দ, দান ও গ্রহণের উৎসব। কিন্তু এই ঈদ-উল-ফিতবের সকল অর্থ, সকল ধ্বনি, সকল ব্যঞ্জন ব্যাপিয়া বিরাজ করিতেছে সংযম, শুদ্ধি ও পবিত্রতার বাণী। মুসলমান পূর্ণ একটি মাস ধরিয়া আল্লার আদেশ অবনত মস্তকে পালন করিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছে- স্বকীয় উচ্ছৃঙ্খল চিত্তবৃত্তি ও ইন্দ্রিয়সমূহকে কঠোর সংযমের অগ্নিতে জ্বালাইয়া শুদ্ধ ও পবিত্র করিয়া লইতে প্রাণপণ করিয়াছে। সারাটি বৎসর ধরিয়া ভোগ-বিলাসের মোহাবেশে সে একেবারে উন্মত্তের মত ছুটিয়া চলিয়াছে, খোদাকে ভুলিয়া, খোদার দান আত্মাকে বিস্মৃত হইয়া ও তাহার কল্যাণ ইঙ্গিতের দিকে অন্ধ চক্ষু ফিরাইয়া কিন্তু অন্ততঃ একটি মাস সে আল্লার আদেশ শিরে ধারণ করিয়া ভোগ-বিলাসের শয়তানকে- প্রলোভন প্ররোচনার পাপকে বন্দি করিয়া রাখিতে পারিয়াছে! এই সাধনার আনন্দে, এই মুক্তি প্রচেষ্টার সান্ত্বনায় আজ ঈদের দিনে মুসলমানের হৃদয় ভরপুর হইয়া উঠিয়াছে, তাহার কমজোর দেল খুশি জোশে তাজা হইয়াছে।

 

সত্যই ঈদ-উল-ফিতর ইসলামের সেবক-সাধকগণের অতি আনন্দের দিন। সত্য বটে, আজ মুসলমানের মুখে, খোদার শুভাশীর্বাদবাহী রমজানের উদ্দেশে ‘আলবিদা’র করুণ সংগীত গীত হইবে- তাহার সাধনার সময় উত্তীর্ণ হইয়াছে দেখিয়া সাফল্য-অসাফল্যেও আশা-আকাক্সক্ষায় তাহার হৃদয় বিষাদ-ব্যথায় কাতর হইবে; কিন্তু তথাপি পূর্ণ একটি মাস ধরিয়া যে যে অবিচ্ছিন্নভাবে খোদার মহাবাণী অন্তরে বহন করিতে পারিয়াছে, তাহার পাপ পঙ্কিল জীবনের কয়েকটি দিনও যে সংযম-সাধন-চেষ্টায় গুজরান করিতে পারিয়াছে, ইহারই আনন্দে হৃদয় তাহার বিহবল হইয়া পড়িতেছে, সকল ভুলিয়া, সকল ত্যাজিয়া সে আজ আল্লাহর নামে শির নোয়াইতেছে!

 

ঈদ-উল-ফিতরে আত্মিক আনন্দের ‘রূহানী জৌলুসের’ সহিত ইসলামী সামাজিক জীবনের একটি আনন্দময় মূর্ত প্রকাশও রহিয়াছে ‘ইন্নামাল মুমিনুনা ইখওয়াতুন’- বিশ্বাসীরা পরস্পরের ভ্রাতা। ইহাই ইসলামের বাণী- মুসলমানের সামাজিক জীবনের ইহাই মূল মন্ত্র। কিন্তু এই বাণী কি কেবল মুখের উক্তি মাত্র? ব্যবহারিক জীবনের সহিত ইহার সম্পর্ক কোনখানে? রমজান ও ঈদ-উল-ফিতর তাহাই স্পষ্টভাবে আমাদিগকে দেখাইয়া দেয়। প্রত্যেক অবস্থাপন্ন মুসলমানকে এই সময় স্বকীয় ধন-সম্পত্তির চল্লিশ ভাগের এক ভাগ তাহার দীন দুঃখী মুসলমান ভ্রাতাদিগকে দান করিতে হয়। ইহা ছাড়া শুধু ঈদের দিনের আনন্দ প্রতি গৃহে অবাধে সম্পন্ন হইবার উদ্দেশে ঐ দিন পরিবারভুক্ত প্রতিজনের পক্ষ হইতে ন্যূনাধিক আড়াই সের পরিমিত চাউল, গম কিম্বা আটা দরিদ্র প্রতিবেশীগণের মধ্যে বিতরণ করিতে হয়। যে মুসলমান ধর্মবিধি মানিয়া চলে, কোরান-হাদিসের বাণী শিরোধার্য করিয়া জীবন ধন্য মনে করে, তাহাকে এ নিয়ম মানিতেই হইবে। অন্যথায় খোদার লানত তাহার শিরে নিপতিত হইবে।

 

বস্তুতঃ ইসলামের ভ্রাতৃত্ববাদ- মোমেনের সহিত মোমেনের ভাইয়ের সম্পর্ক, সহোদরের সম্বন্ধ কত বড় সত্য, তাহা রমজানের ঈদ হইতেই উপলব্ধি হয়। মুসলমানকে মাত্র মুখে বলিলে চলিবে না যে, অপর মুসলমান আমার ভাই। কার্যতঃ, হাতে-কলমে তাহাকে প্রমাণ দিতে হইবে যে, মুখে সে যাহা বলিতেছে অন্তরেও সে তাহা বিশ্বাস করে এবং সেই বিশ্বাসের অনুবর্তী হইয়া কাজ করে। এই জন্য অবস্থাশালী মুসলমান মাত্রকেই ধন-সম্পত্তির চল্লিশের এক অংশ প্রতি বৎসর তাহার দুঃখী ভাইয়ের দুঃখ দুর্দশা মোচনের জন্য বিতরণ করিতে হয় এবং তারপর খাস ঈদের দিনে অনাহারের যন্ত্রণার হাত হইতে তাহার দরিদ্র ভ্রাতাভগিনীগণকে অন্ততঃ সাময়িকভাবেও মুক্তি দিবার জন্য মুসলমানকে চাউলাদি বিতরণ করিতে যায়।

 

ফলতঃ ইসলাম ব্যতীত জগতের অন্য কোনো ধর্মে ভ্রাতৃত্ববাদের এমন সুন্দর বিকাশ দৃষ্টিগোচর হয় না। খ্রিষ্টান খ্রিষ্টানের ভাই বটে; কিন্তু দীন দুঃখী খ্রিষ্টানের দুঃখ মোচনার্থে অর্থদান করিতে সে ধর্মতঃ বাধ্য নহে; ইহুদি, হিন্দু, বৌদ্ধ প্রভৃতি অন্য সকল ধর্ম সম্প্রদায়ের সম্বন্ধেও এই কথা সত্য। তাঁহাদের সকলেরই ধর্মগ্রন্থে দানের মহিমা কীর্তিত হইয়াছে, সন্দেহ নাই; কিন্তু ইসলাম যেমন কর্মজীবনের মধ্য দিয়া তাহার শিক্ষা ও উপদেশগুলি প্রতিপালিত হইবার কঠোর ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছে, এমন আর কোনো ধর্মই করে নাই। তাই মুসলমানের ভ্রাতৃত্ববাদ কেবল মৌখিক উক্তি মাত্র পর্যবসিত না হইয়া তাহার সামাজিক জীবনকে শান্তিময়, মধুময় করিয়া তুলিয়াছে। ধনী মুসলমান দরিদ্র মুসলমানদের প্রতি মাত্র মৌখিক সহানুভূতি দেখাইয়া আপনার কর্তব্য শেষ করিতে পারে না। স্বকীয় ধনের একাংশ দান করিয়া তাহাকে কার্যতঃ সহানুভূতি প্রতিপন্ন করিতে হয়। পবিত্র কোরআন মজিদের বহু স্থানে এজন্য বিশ্বাসী মাত্রকেই বিশেষ তাকিদ দেওয়া হইয়াছে। জাকাত দাও, হে মুসলমান জাকাত দাও- তোমার অভাবগ্রস্ত ভাইয়ের অভাব সম্পূর্ণ কর। ইহাই কোরআনের আদেশ। ভঙ্গ করিলে মুসলমানের ধর্মজীবনের সত্যতা নষ্ট হয়।

 

এইভাবে রমজানের বিদায়োৎসবের দিনে ইসলামের যে ভ্রাতৃত্ববাদ সুন্দর ও মনোহররূপে ফুটিয়া উঠে, প্রত্যেক মুসলমানকে তাহার সার্বজনীন ও সনাতন শিক্ষা সকল সময়ের জন্য হৃদয়ে ধারণ করিতে হইবে এবং তাহা কার্যে পরিণত করিয়া ইসলাম-নিষ্ঠায়- খোদা রসুলের প্রতি তাহার ভক্তির প্রমাণ প্রদর্শন করিতে হইবে। আজ মুসলমান সমাজে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বেও একান্তই অভাব। ভাইকে ভাই হিংসা করিয়া পাশবিক তৃপ্তি লাভ করিতেছে। একজন মুসলমান বিপন্ন ও অত্যাচারিত হইলে অন্য সকল মুসলমানের মন আর পূর্বের ন্যায় সহানুভূতি ও সমবেদনার কম্পনে দুলিয়া উঠে না। দরিদ্র মুসলমানের দুঃখ বেদনায়, ইসলামের উন্নতির জন্য আর মুসলমান হজরত আবু বকরের আদর্শে ‘ফি সবিলিল্লাহ’ সর্বস্ব বিলাইয়া দিতে প্রস্তুত নহে। দলাদল দ্বেষাদ্বেষিতে আজ যে পঙ্গু ও অক্ষম। যদি ইহার প্রতিকার করিতে চাও, তবে আজ হইতে ভাই মুসলমান, খোদাকে সাক্ষী রাখিয়া প্রতিজ্ঞা কর, তোমায় ভাইয়ের সাহায্যের জন্য তোমার সর্বস্ব দান করিতে প্রস্তুত হইবে, ঐক্য ও সাম্যের মন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া দরিদ্রতম মুসলমানের বেদনাকে তুমি নিজের বেদনা বলিয়া গ্রহণ করিবে। তাহা যদি না কর তবে তোমার মুসলিম জীবনের এক কানাকড়িরও মূল্য থাকিবে না।

 

(মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী রচনাবলী ৩য় খণ্ড : আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি, ২০১৩, ১০৭-৮ পৃষ্ঠা থেকে সংগৃহীত।)

মতামত
লোডিং...