ইমরান মাহফুজের সঙ্গে আলাপ : শিল্প ও শিল্পী || মোহাম্মদ আবু সাঈদ || আলাপ

[ইমরান মাহফুজ- প্রধান পরিচয় কবি, সম্পাদক হিসেবে আছেন বেশ ভালো অবস্থানে ; আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পরিষদ থেকে ‘আবুল মনসুর আহমদ গবেষণা পুরষ্কার’ পেয়েছেন ২০১৫ সালে। সম্পাদনা করেন কালের ধ্বনি। দু’টি কবিতার বই- ‘দীর্ঘস্থায়ী শোকসভা’ (ঐতিহ্য, ২০১৭) এবং ‘কায়দা করে বেঁচে থাকো’ (ঐতিহ্য, ২০২০) ; একক সম্পদনায়- আবুল মনসুর আহমদের প্রাসঙ্গিকতা: সাহিত্য সাংবাদিকতা রাজনীতি (আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পরিষদ, ২০১৯), জীবনশিল্পী আবুল মনসুর আহমদ (আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পরিষদ, ২০১৬), আজ ও আগামীকাল – সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নির্বািচিত সাক্ষাৎকার (ডেইলি স্টার বুকস, ২০২০), লালব্রিজ গণহত্যা (১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট)। 

কবি হিসেবে চর্চা করেন শিল্পের এবং সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন শিল্পীদের নিয়ে- এমন একজনের সাথে ‘শিল্প ও শিল্পী’ প্রসঙ্গে আলাপ করা নিঃসন্দেহে সুখের, তুষ্টির। আলাপচারিতায় আছি, মোহাম্মদ আবু সাঈদ। তিন পর্বের পরিকল্পনায় নেয়া তাঁর দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের এটি প্রথম পর্ব। খেয়াল রাখা আবশ্যক, কবির কথাগুলো ‘গাঢ়’(Bold) করে দেওয়া হয়েছে।]

 

 

সময় কিভাবে শিল্পকে আক্রান্ত করতে পারে?

আক্রান্ত ব্যাপারটা আপেক্ষিক; সময়কে শিল্পী যদি ধারণ করে তাহলে শিল্প আক্রান্ত হয়— অনুভবের বিষয়, অনুভূতির বিষয়। আমাদের সাম্প্রতিক সময়ে অনেক ঘটনা ঘটছে কিন্তু সবাইকে আক্রান্ত করছে না। আমাদের অধিকাংশ মানুষের অনুভূতিটা অনুভোঁতার মতো হয়ে গেছে। শিল্প তখনই আক্রান্ত হয় যখন শিল্পী আক্রান্ত হয়— এটা মুদ্রার এপিঠ ওপিঠের মতো। আপনি যদি বলেন, পত্রিকা ভালো নেই, তার মানে, সংবাদকর্মী ভালো নেই— বিষয়টা এরকম। শিল্পী যদি সংকটকে অনুভব না করে তাহলে শিল্পায়িত হয় না। 
আচ্ছা, সংকটের যে জায়গা— রাষ্ট্রের সংকট বা সমাজের সংকট— এই সংকট সাহিত্যে তুলে আনতে হবে এমন কোনো দায়বদ্ধতা আসলে আছে কি-না?
প্রথমত, দায়বদ্ধতা আছে ; দ্বিতীয়ত, দায়বদ্ধতা নাই। কেন নাই? এখানে দুটি বিষয়। এক. কোনো সাহিত্যিকের কাজ এই না যে, সাম্প্রতিক সময়ে যা যা ঘটছে সব তার লেখায় নিয়ে আসা ; এইটা সংবাদপত্রের কাজ, পুঁথিকারের কাজ, দিনলিপিকারের কাজ, নিরেট হালাল সাহিত্যিকের কাজ এই না যে, সারাদিন যা যা ঘটলো সব নিয়ে আসা। শিল্পীর কাজ হচ্ছে, সংকট কেন তৈরি হচ্ছে, কারণ প্রকরণ, ঘাত প্রতিঘাত বিশ্লেষণ করা। 

 

এইটা তো ফ্যাসিফাদের সময়; তো ফ্যাসিজমের যে ব্যাপার, মানে রাষ্ট্র যেভাবে সমাজকে, সাধারণকে ডমিন্যাট করতেছে এইটা একজন সাহিত্যিক চাইলে আনতে পারে বা তার দায় আছে কি-না… যে, একটা সময় আমাদেরকে গ্রাস করতেছে।
আপনি যদি একজন চিকিৎসকের কাছে যান, তার কাজ হচ্ছে প্রেসক্রাইব করা। তেমনি একজন সাহিত্যিক, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকারীর কাজ সংকটকে চিহ্নিত করে দেওয়া ; এটার অ্যাকশনে যাবে রাজনীতিবিদ, প্রশাসন, রাষ্ট্র। চিহ্নিত করা, দায় অনুভব করা আর দায়িত্ব নেয়া কিন্তু আলাদা। ফ্যাসিজম চলছে কি-না এই জায়গাটা একজন ইতিহাস-সচেতন দূরদর্শী মানুষ যেভাবে বুঝবেন সাধারণ মানুষ সেভাবে বুঝবেও না, তাদের বোঝার দরকার‌ও নাই। কারণ পৃথিবীর সকল দেশের সকল সময়ের একটা অংশ খেয়ে যায়, সয়ে যায়, দেখে যায়।‌
বোধ নাই?
বোধ নাই ঠিক তা না; তারা আসলে ভাবতে চায় না। দ্যাখেন সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের যে গণমানুষের যুদ্ধ— গণমানুষের যুদ্ধ বলা হয় না কিন্তু বলা উচিত— তখন তাদেরকে বুঝানো হয়েছে, তোমরা যদি যুদ্ধ করো তাহলে তোমরা ভাত খাইতে পারবা, তোমাদের ছেলেমেয়েরা চাকরি পাবে; অর্থাৎ তাদেরকে বোঝানো হয়েছে, স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। এখন স্বপ্ন কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে তা পরের আলাপ। আপনি বলছেন, বোধ নাই ; আসলে বোধ আছে কিন্তু তারা বুঝতে চায় না। ঐ যে, খাঁটায় না, খাঁটে না, নিজের মতো চলে। এখন ফ্যাসিজমের যে কথা বলা হচ্ছে, যে টার্ম ব্যবহার হচ্ছে, এটা আসলে সারা পৃথিবীতেই একটা আধিপত্য বিস্তার করেছে; পৃথিবীর অনেক মানুষ এখন হত্যার শিকার, গুমের শিকার, বিশ্বাসের কারণে এবং বিশ্বাসহীনতার কারণে। এখন আপনি যদি রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের মূল প্রকরণ বের করে থাকেন তাহলে দেখবেন, যারা বলার কথা তারা বলছে না, আর যারা বলছে তাদের কথা চূড়ায় গিয়ে পৌঁছছে না। একেকটা সময়ের একেকটা নিরীক্ষা থাকে; এই সময়ের নিরীক্ষাটা হচ্ছে, সয়ে যাওয়া, বলতে না পারা এবং বলতে না দেওয়া, খেলা দেখে যাওয়া। এই সময়টা আসলে পার করছি আমরা। 
এখানে একটা হতাশার জায়গা তৈরি হয় না?
এইজন্যই তো বলা আসলে, ‘দীর্ঘস্থায়ী শোক’ যে অর্থে আমি লিখেছিলাম। আপনি আজ যে কথাটা ২০২১ সালে করছেন, আমি সেই ব‌ইটা (দীর্ঘস্থায়ী শোকসভা) ২০১৫ সালে বের করার পরিকল্পনা করেছি। আজ থেকে ছয় সাত বছর আগেই আমি অনুভব করেছি, যে, আমাদের শোকসভা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, হবে। তবে, নিশ্চয়ই সমাধান‌ও হবে। 

 

শিল্পী মানেই কি সমাজের সাথে প্রতিশ্রুতিশীল? যে, আমি আমার শিল্পে সমাজকে নিয়ে আসবো। সাহিত্যবোদ্ধারা তো বলেন, সাহিত্য সমাজের আয়না।
সব আয়নায় কি মুখ দেখা যায়? 
সে যদি আয়নার সামনে দাঁড়ায় এবং আয়না পরিচ্ছন্ন থাকে তাহলে দেখা যাবে না কেন?
আয়না পরিচ্ছন্ন কিন্তু ঘর অন্ধকার। 
তাহলে দেখা যাবে না!
অর্থাৎ, সব আয়নায় মুখ দেখা যায় না। আচ্ছা, বুদ্ধদেব বসু বলছেন, শিল্পের জন্য শিল্প ; জসীম উদ্‌দীন বলছেন, জীবনের জন্য শিল্প— দেখুন, দু’জন‌ই শিল্পী, দু’জন‌ই আমাদের কালোত্তীর্ণ অগ্রজ কিন্তু দু’জনের চিন্তা আলাদা। সুতরাং, সাহিত্য, শিল্প, আর্ট, কালচারকে প্যাকেজ আকারে সংজ্ঞায়িত করে যিনি চলতে / চালাতে চান তার আত্মার হত্যা হয়। তো, আমি মনে করি না যে, দায় আছে। আমি সাহিত্য করতে আসছি, ধর্মপ্রচার করতে আসি নাই। সাহিত্য কোনো পবিত্র বিষয় নয় ; একেকজনের অনুভবে একেকরকম। এখন শিল্পের জন্য শিল্প না জীবনের জন্য শিল্প এখানে শিল্পীর চেহারা অনুসারে জীবন পরিবর্তন হবে ; যেটা আমি প্রায়শই বলি, যার চশমা যেমন তার পৃথিবী তেমন। আমার কাছে শিল্পটা, যার অনুভব যেমন তার শিল্পায়িত চিত্রায়ণ‌ও তেমন। 

 

 

আচ্ছা, আমরা তো বিভিন্ন সময় দেখি, সমাজটা ধরার জন্য সাহিত্যটা পড়া হয়। যেমন ১৯২০-২১’র দিকে খেলাফত-অসহযোগ আন্দোলন হ‌ইছিলো, তখন আসলে পত্রিকায় কি প্রকাশিত হ‌ইছিলো, সাহিত্যিকরা কি লিখছিলো ; ’৭১র সময়ে বা পরবর্তীতে যুদ্ধকে সাহিত্যিকরা কিভাবে কোন্ দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন— অর্থাৎ সময়ের খতিয়ান হিসেবে তো সাহিত্যকে দেখা হয়। এখন এখানে দেখা যাচ্ছে, বিষয় হিসেবে সমাজ সরাসরি সাহিত্যকে প্রভাবিত করতেছে ; কিন্তু সাহিত্য সমাজকে প্রভাবিত করতে পারে কি-না?
আপনার প্রসঙ্গটা ভালো, কিন্তু আপনি একটু গুলিয়ে ফেলছেন। আপনি বলছেন, ঐ সময়টা ধরার জন্য পত্রপত্রিকা, সাহিত্য দেখা হয়। সাহিত্য অনেক বড়ো একটা ক্যানভাস কিন্তু পত্রপত্রিকা আলাদা। পত্রপত্রিকার কাজ-ই হচ্ছে, গতকাল কি ঘটেছে তা বলা, বা সংকট সম্ভাবনা বলা, এর বাহিরে তো কিছু নাই। এবার আসেন সাহিত্যে, যে কলামিস্ট সে আরেকটু অ্যাডভান্স, আর কিছু না ; এবার গতকাল ঘটা ঘটনাকে নিয়ে আজ যদি কবিতা লেখা হয় তাহলে এটা কতটুকু কবিতা হবে আর কতটুকু প্রতিবেদন হবে?— দুইটা দুই আঙ্গিক। ইতিহাস যত পেছনে যায়, যত দূরে যায় তা তত নির্মম নির্মোহ হয়ে উঠে। আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে, ’৫২ সম্পর্কে জানতে তাজ‌উদ্দীনের ডায়রী যত উপজীব্য হয়েছে, একটা ভালো কবিতা তেমন উপজীব্য হয়নি; দিনলিপি, আত্মকথা ইতিহাস, সমাজ বোঝার জন্য যত উপজীব্য, সহায়ক একটা ভালো কবিতা এমন সহায়ক না। কবি কল্পনায় অনেক কিছু আনতে পারে, কবিকে কাক, কাককে কুকুর‌ও বানাতে পারে। নির্মোহতার জন্য এখন আপনাকে আলাদা করতে হবে, আপনি সময় ও সমাজ বুঝতে দিনলিপি দেখবেন না আত্মজীবনী দেখবেন না পঞ্জিকা দেখবেন— আলাদা ডেফিনেশন হিসেবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। 
যে, আমি কি চাই?
হ্যাঁ, কি চান এবং কার থেকে চান। পুঁথি যিনি পড়েন তিনি গতকালের ঘটনা দিয়ে পুঁথি বানাতে পারেন কিন্তু আমি দেখি না, একটা কবিতার জন্য গতকালের ঘটনাকে বাছাই করা হলো এবং সেটা ভালো কবিতা, সাহিত্য হয়ে গেছে। 
এটা খুবই রেয়ার। 

 

কুদরত-ই খোদা যিনি প্রাবন্ধিক, তিনি পিএইচডির বিষয় নিয়েছেন “ষাটের দশকের বাংলা কবিতায় জাতীয়তাবাদের প্রভাব”— এই যে একটা দশকে সমাজের চিন্তা কবিতায় ফুটে উঠছে, এইটা নিয়া গবেষনা হচ্ছে, তো সমাজের একটা ব্যাপার তো সাহিত্যে থাকে। তাই না?
দেখেন, একটা দশক কিন্তু বেশ বড়ো— দশ বছর। জাতীয়তাবাদ— এইটা কিন্তু ওই দশ বছরের আলাপ না, কিন্তু হয়তো তখন তুঙ্গে উঠেছে। এখন হুদা ভাইয়ের যে গবেষণা এখানে তো এমন না যে, ৬১ থেকে ৭০ পর্যন্ত‌ই কেবল কবিরা কবিতা লিখেছেন, এর আগে পরে তারা লিখেন নাই বা ব‌ই বের হয় নাই; ধরেন একজন কবি চল্লিশে থেকে লেখা শুরু করেছে, এবং যাপন করতে করতে তিনি ষাটে চলে এসেছেন। তখন তিনি অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা সব ঢেলে একটা লেখা লিখেছেন। 
না, এখানে ব্যাপার হলো, আমি যে জায়গায় বসে লিখছি— ধরেন পূর্ববঙ্গে লিখতেছি ষাটের দশকে, আমার সামনে ছেষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ঘটতেছে, আমার সামনে তো এগুলো ভাসতেছে। এখন আমি যত‌ই কল্পনাই আশ্রয় নেই শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার কাছেই তো আমাদের ফিরে আসতে হয়। এখন আমার সাহিত্যে তো ঐ ব্যাপারগুলা চলে আসবে। ব্যাপারটা স্বাভাবিক না?
আমার আলাপের জায়গাটা ভিন্ন। মানুষ যত‌ই বাস্তবতার কাছে ফিরে আসুক, সে কিন্তু শান্তি খোঁজে কল্পনায়। ধরেন, সারাদিন আপনি এতো এতো বীভৎস চিত্র দেখেছেন যে একেবারে বিচ্ছিরি লাগছে, কিন্তু রাতে যখন ঘুমে একটা ভালো স্বপ্ন দেখেন তখন কিন্তু ভাল্লাগে।
ঐটা তো আসলে স্বপ্ন‌ই…
জীবন তো একটা স্বপ্ন‌ই। 
আমরা তো সেখানে বাস করি না।
বাস করি না কিন্তু শান্তি খুঁজি তো সেখানে; সেখানে আমরা ফিরে যেতে চাই।
সেটাই; কিন্তু আল্টিমেটলি তো আমরা জীবনেই থাকি।
আল্টিমেটলি আপনি মাটি থেকে এসেছেন, মাটিতেই ফিরে যাবেন তাহলে খাটে কেন ঘুমাবেন? এরকম কি বলা যায়?
না।
কিন্তু আল্টিমেটের কথা চিন্তা করলে তো আপনার তো খাটে ঘুমানোর কথা না। কারণ আপনি মাটিতে ফিরে যাবেন। আমার কথা হচ্ছে, মানুষ যেখান থেকে আসুক আর যেখানেই যাক, মানুষ শান্তি খোঁজে কল্পনায়। ধরেন, একটা মানুষের সংসারের অবস্থা এতো খারাপ যে, সে কল্পনাও করতে পারছে না একটা সুখী সংসারের! আচ্ছা, আপনি কল্পনা করেন তো, কাল থেকে রাষ্ট্র আপনার সহায়ক হবে।
সম্ভব না।
কল্পনায়ও মানুষ ভালো থাকতে পারছে না। 
কল্পনাটাও এতো ক্ষতিগ্রস্ত?
হ্যাঁ, তার মানে কি দাঁড়ালো, আপনি বাস্তবের কাছে যে ফিরে আসবেন সেই পথ‌ও বন্ধ। রোহিঙ্গা কি চাইলেও তার বাস্তবে অর্থাৎ মাতৃভূমিতে যাইতে পারছে? সে এখন ভালো থাকবে কিভাবে? কল্পনায়, যে, আমার একটা দেশ ছিল। তার মানে, কল্পনা স্মৃতিজাদুঘর যেখানে মানুষ বিশ্রাম নেয়। 

 

 

এখন আমরা ঐ আলাপে আসি, একটা জনগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে যখন আপনি লিখবেন তখন সেই জনগোষ্ঠীর ভাষা, ভাবনা, চিন্তা চেতনা তো আপনার লেখায় চলে আসবেই, স্বাভাবিক। এখন সময়, সমাজ যেভাবে সাহিত্যকে আক্রান্ত করে বিষয় হিসেবে— নট শিল্প হিসেবে— এখন, সাহিত্য কি সমাজকে অতোটা প্রভাবিত করতে পারে কি-না?
সমাজ অনেক বড়ো এঙ্গেল; কিন্তু কিঞ্চিৎ পারে, একশোতে দশ পারে। ১৯০৫ এ বঙ্গভঙ্গ হলো আবার ১১তে রদ হলো, রদ হবার পর কলকাতায় ১৯১২ সালে একটা মুসলিম সোসাইটি তৈরি হলো, এটার পর ১৯২১ এ আমাদের রেঁনেসা একটা রূপরেখা পেলো, ১৯২৬ এ আবার ঢাকায় শুরু হয় বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন, শিখাগোষ্ঠীর প্রভাব আবার স‌ওগাতের উপর পড়ে, ২৯/৩১ এ কিন্তু আবার শিখাগোষ্ঠী বন্ধ‌ও হয়ে যাচ্ছে; কিন্তু রেশটা থেকে যাচ্ছে যার প্রভাব লাহোর প্রস্তাবে পড়ছে।
মানে একটা সমাজ, রাষ্ট্রের পরিকল্পনায় তাঁরা কাজ করতেছে…
হ্যাঁ। এবার দেখুন, সাতচল্লিশের দেশভাগের পর সাহিত্যিক মহল থেকেই মূলত প্রশ্ন ওঠেছে তুমুলভাবে— রাষ্ট্রভাষা কি হবে? এই প্রশ্নের জেরে আটচল্লিশে আমাদের মোহ ভাঙলো। 
এইখানে সাহিত্য দারুণ ভূমিকা রাখে।
হ্যাঁ, তখন তমুদ্দুন মজলিশ অসাধারণ ভূমিকা রাখে এবং একটা পুস্তিকাও বের করে; এই পুস্তিকা কিন্তু তৎকালীন পত্রপত্রিকায়, কলামিস্টদের, সচেতন জনসাধারণের চিন্তায় প্রভাব বিস্তার করে। আমি বলতে চাচ্ছি, সাহিত্য কখনো কখনো সমাজে বড়ো ভূমিকাও রাখে— টেন পার্সেন্ট থেকে ফিফটিতে পৌঁছে যায়। আপনাকে আমি দৃষ্টান্ত দেখালাম। কিন্তু এই সময়ে আমাদের সাহিত্য কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না। কারণ, আমরা লিখতেই পারছি না। তিনটা কারণ: এক. লিখতে পারছি না কারণ রাষ্ট্র সম্পর্কে নিজস্ব ভয় ; দুই. প্রযুক্তি এতো অবাধ হয়ে গেছে যে, সুস্থ জিনিস দেয়াতে চ্যালেঞ্জ ; তিন. আমরা যে সব জায়গা থেকে কথা বলবো সে সব জায়গাগুলাতে নিয়ন্ত্রক কোনো ব্যবসায়ী, প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রের‌ই কোনো কর্তাব্যক্তি, যার ফলে আমাদের জায়গাটা কম। তখন কথা বলেছে, তমদ্দুন মজলিশ; আর‌ও যারা কথা বলেছে চল্লিশ, পঞ্চাশের দশকে তাদের মোটামুটি একটা জায়গা ছিল, তারা বলতে পারতেন। তখন কাউকে ধরতে আসলে অভিযোগপত্র, ওয়ারেন্ট কপি লাগতো। আবুল মনসুর আহমদকে যখন অ্যারেস্ট করতে আসে তখন তিনি বলছেন, কাগজ দাও; কিন্তু কাগজ তখনো পৌঁছায় নাই, তখন সাড়ে তিন ঘণ্টা পুলিশ তাঁর বাসার গেটে বসেছিল, অর্থাৎ, কাগজ ছাড়া অ্যারেস্ট করা যায়নি। কিন্তু আপনাকে ধরতে কি এখন কাগজের দরকার হয়? তার মানে, সমাজের একটা পরিবর্তন হয়েছে। আপনি মুকুন্দদাসের নাম শুনে থাকবেন; তিনি এক জায়গায় গান গাইতে গেছেন, তো তিনি গায় গেয়ে ভালো মানুষ জমায়েত করে ফেলছেন— সেই মুহূর্তে পুলিশ তাঁকে ধরতে গেলো কিন্তু কাগজ দেখাতে পারে নাই; কাগজ পৌঁছতে পৌঁছতে তাঁর অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যায় এবং তাঁকে আর ধরতে পারে না। সোজা কথা, রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রশাসক কখনো শিল্প-সহায়ক ছিল না। আমরা যদি দেখি, মহাকাব্য লেখকদেরকে ঠিকঠাক সম্মানিটা পর্যন্ত দেওয়া হয় নাই। 
না, রাজকবি থাকে না?
রাজকবি কেন থাকে? আমার গল্প, গীত লেখার জন্য।
কিন্তু ওইটা যদি আল্টিমেটলি শিল্প সাহিত্য হ‌ইয়া উঠে তাহলে তো আমার কোনো সমস্যা নাই।
কিন্তু এইটা তো সহায়ক না। যেমন নজরুল লিখেছেন, হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছো মহান— তার মানে কি এইটা দারিদ্র্যের কবিতা? বিষয়টা এরকম না। আসলে শিল্পী তো একজন স্রষ্টা। 
এইখানে একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার আপনাকে বলি। একটা ব‌ই আছে, লেখকের নামটা মনে নাই, নামটা হলো ‘ভূগোলভেদে ভগবান পরিবর্তন হয়’। এইখানে ভগবান বলতে আপনি শান্তি বুঝতে পারেন, পরকাল বুঝতে পারেন বা এমন একটা উচ্চতার জায়গা যেখানে গেলে তাকে কষ্ট ছুঁইতে পারে না। এরকমই তো? যেমন ধরেন আমরা বলি, ঈশ্বর থাকেন ভদ্রপল্লিতে— এই ভদ্রপল্লি মানে শান্তির পল্লি। এখন যে লোক মরুভূমিতে আছে তার কাছে পানি হচ্ছে শান্তি, আবার যে অঞ্চলে সারাবছর বন্যা তার কাছে কি পানি শান্তি? 
পানিটাই তার কাল।
এই কিছুদিন আগে আমাদের তরুণরা দার্জিলিঙের মেঘ দেখার জন্য দেশের এইপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ছুটে বেরিয়েছে না?
হ্যাঁ।
মেঘ দেখা যাচ্ছে, দার্জিলিং দেখা যাচ্ছে…
কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে…
যেখানে বরফ পড়ছে, তার কাছে কি বরফটা শান্তি? 
না।
দেখছেন, ভূগোলভেদে শান্তিটা কোথায় গেলো? এইজন্য ভূগোলভেদে ভগবান পরিবর্তন হয়। আমাদের খোদাও পরিবর্তন হবে, হয়। 
শান্তি তো কোনো স্থিতিশীল ব্যাপার না।
না, আপেক্ষিক।

 

চলবে… 

মতামত
লোডিং...