ঈদ-স্মৃতি || সেদিনের ঈদ আজকের ঈদ || আহমেদ মনছুর

এবারের ঈদের তেমন কোন আবেদন নেই আমার কাছে। ঈদের দুই আনন্দ, ভালো খাবার আর নতুন কাপড়। এবার করোনার বছর হাজার হাজার মানুষ দুইবেলার ভাত জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে। রাস্তায় নামলেই অনাহারী মানুষের আর শিশুদের ভিক্ষার জন্য পাতা হাত দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত, মাঝে মাঝে এত ক্লান্তি লাগে, মনে হয় একটা লম্বা ঘুম দিই।
এখন বড় হয়ে গেছি, ঈদের আনন্দ নিয়ে মাতামাতির মাত্রাও কমে গেছে, এখন আনন্দ লাগে ছেলেদের মুখে হাসি দেখলে, মা, বাবা, বউ বাচ্চাদের নিয়ে দুই বেলা খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকাটাই এখন বড় আনন্দের, শৈশবের ঈদ আনন্দ লিখতে বসে অনেক পুরনো স্মৃতি মনের ক্যানভাসে ভাসছে, শৈশব স্মৃতি নিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা, ভুল ত্রুটি মার্জনীয়।
সবচেয়ে মজার ঈদের ড্রেস ছিলো আমাদের, বাবা বিদেশ থাকার সুবাধে আমরা দুই ভাই-ই একি রকমের থান কাপড় পেতাম জামা বানানোর জন্য, আমি ছোট হওয়াতে খুব একটা গায়ে মাখতাম না, বড়ভাই মায়ের সাথে এটা নিয়ে অনেক নাকঝারাঝারি করত।
আমাদের ছোটবেলায় এতো চাকচিক্য ছিলো না। এখনকার ভাষায় বলা যায় ‘সিম্পলের মধ্যে গরজিয়াস’ কাপড়েই আমাদের ঈদ সারতে হতো। কিন্তু অনেক না পাওয়ার মধ্যে এই পাওয়াটা আমার জন্য অনেক বেশি ছিলো। ঈদের দিন মনের কষ্ট মনে চেপে সকালে কোনরকমে বড় পুকুরে (মানে বাড়ীর একমাত্র বড় পুকুর) খুশবু সাবান গায়ে, মাথায় মেখে গোসল করে পাঞ্জাবি পরে মসজিদে যাওয়া ছিল প্রথম কাজ।
আমাদেরকে যেইরকম জামা কিনে দিত, সেইটা পরেই খুশি থাকতে হতো, নিজের পছন্দ অপছন্দ বলে কোন কিছুই ছিল না। একবার ভাই আর আব্বার সাথে সারা শহর ঘুরেও ওদেরকে জামা পছন্দ করাতে পারলাম না, পরে জেনেছিলাম আমি যেটা পছন্দ করি সেটা ওদের বাজেটের বাহিরে ছিল, পরে খালি হাতে ঘরে চলে আসলাম, ভাইয়া চাঁদ রাতে ইয়া মোটা একটা জলপাই কালারের পাঞ্জাবি এনেছিল, আমি পরিনি, অপমানে সকালে কিছুক্ষণ কেঁদেছিলাম, তবে সেই কান্না কাউকে দেখাইনি, সেই বছর পুরাতন পাঞ্জাবি পরেই ঈদ করেছিলাম।
পাড়ার সব ছেলেরা দলবেঁধে বেড়াতে বের হতাম, কারও কারও দামি জামাগুলো দেখে আমার কষ্ট বেড়ে যেত। আসলে এখন বুঝি এত দামি জামা কিনে কি লাভ? যে কাপড় বছর ঘুরতেই পুরাতন হয়ে যায়, তার পিছে অযথা টাকা খরচ করার মানে হয় না।
এরপর শুরু হতো ঘরে ঘরে গিয়ে মুরব্বিদের সালাম করা, এবং গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরতে যাওয়া। প্রতি ঘরেই লাচ্ছা সেমাই আর চুটকি রান্না করে রাখা হতো, বয়স আর সম্পর্ক বুঝে নাস্তা দেওয়া হত, এটা অবশ্য এখনো হয় অনেক বাড়ীতে, কাছের কেউ আসলে বিরানি, পায়েশ, আর দুরের কেউ হলে লাচ্ছা সেমাই অথবা বাংলা সেমাই দেওয়া হয়, এটা আমি অনেক ঘরেই এখনো দেখি, তবে আমাদের ঘরে কখনো নাস্তার এই তারতম্য দেখিনি।
এখন সেলামির যেয়াক্টা রমরমা প্রথা সমাজে চালু হয়েছে, তা আমাদের ছোটবেলায় ছিল না, কদাচিৎ দুয়েকজনে দুই এক টাকার কয়েকটি নোট ধরিয়ে দিত, এটা নিয়ে আমরা অনেক খুশি ছিলাম, তাছাড়া ঈদ উপলক্ষে আমরা মাটির ব্যাংকে টাকা জমাতাম, যেটা ঈদের দিন কিংবা আগের দিন ব্যাংক ভেঙে বের করে ঈদের দিন খরচ করতাম, ঈদের দিন সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার একটা বাজে অভ্যাস ছিল আমার, তখন হলের টিকেট ছিল ০৭ টাকা।
ঈদের স্মৃতি বলতে আমার এটুকুই। বড়বেলায় মানে এখন ঈদ আর আলাদা কোন আবেদন তৈরি করতে পারেনি। এখন আমার কাছে ঈদের দিন মানে ছেলেদের নতুন জামা পরিয়ে হাত ধরে মসজিদে যাওয়া, নামাজ শেষে ঘরে এসে সেমাই গিলে লম্বা একটা ঘুম দেওয়া। এমন একটি ঘুম, যেটা বহুদিন বাদে ঘুম ভাঙবে, উঠে দেখব দেশ থেকে করোনা নামক মহামারী চলে গেছে, ভিক্ষুক নামক কোন ব্যক্তির খোঁজ দেশে পাওয়া যাচ্ছে না, সকল বিত্তশালী ব্যক্তিবর্গের যাকাতের সুষ্ঠু ব্যবহারে সমাজ থেকে গরীব উধাও হয়ে গেছে, প্রতিটি শিশু ভরপেটে ঘুমাতে যাচ্ছে, ঘুম থেকে উঠে আবার খাবার পাবে এই নিশ্চয়তা নিয়ে।
মতামত
লোডিং...