ঈদ-স্মৃতি || ঈদ স্মৃতিকথা || আরিফ রায়হান অপু

 

“চাঁদ মামা আজ বড্ড একা, বড় হয়েছি আমি”

জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় কোনটি। এই প্রশ্নের জবাব সম্ভবত একবাক্যে বলে দেয়া যায়- শৈশব। শৈশব মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ও বলা যায়। কিন্তু মানুষ ধীরে ধীরে বড় হয়। শৈশব হারিয়ে যায় জীবনের বাঁকে, তখন বহুদিন পর কোন এক সন্ধ্যায় অথবা জ্যোৎন্সা রাতে তারার সাথে কথা বলার সময় মনে পড়ে যায়, একটা সুন্দর সময় ছিল। যার নাম শৈশব। ছিল না দায়িত্ব কর্তব্যের টানাটানি, ছিল না সেই বড় হবার কোন উচ্চ আশা। শুধু ছিল জীবনকে নতুনভাবে দেখা। হাসি আনন্দ আর গান নিয়েই দিন চলে যেত।

 

শৈশবের স্মৃতিতে ঈদের স্মৃতি সবচেয়ে মধুর স্মৃতিগুলোর একটি। ঈদ মানে নতুন জামা জুতা আর স্কুল বন্ধের আনন্দ। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তখন স্কুল বন্ধ মানেই পড়া নেই শুধু খেলাধুলা করে সময় কাটানো। সে এক অপরিসীম আনন্দ। তবে আমার স্মৃতিতে ঈদের ব্যাপারটি একটু ভিন্ন। কারণ সবাই ঈদ নিয়ে আগ্রহে থাকত নতুন জামা জুতা পাবে বলে। কিন্তু আমার কাছে এসবের কোন আগ্রহ ছিল না। আমি তখন ভাবতাম ঘুরে বেড়ার কথা। কোথায় কোথায় ঘুরতে যাব সেসব ভেবে বের করতাম। আমার ঈদ স্মৃতিতে শহর গ্রাম দু’টোই আছে।

 

ঈদে নতুন জামা জুতা পরতেই হবে এমন বায়না কখনও করিনি। জানি না কেন, তবে কিনে দিতেই হবে অথবা ঈদে নতুন জামা কাপড় পরতেই হবে এটা আমার কখনও হয়নি। কারণ আমার কাছে মনে হত অনেক মানুষ তো নতুন জামা কাপড় পরতে পারবে না। তাছাড়া এত জামা কাপড় দিয়ে কি হবে! নতুন জামা কাপড় পরতেই হবে এটাতে তো কোন বাধ্যবাধকতা নেই। পুরাতন জামা কাপড় দিয়েও ঈদ করা যায়।

 

শীতের ঈদ আপনারা পেয়েছেন কিনা জানি না। আমি পেয়েছি। তখন বয়স কত এটা মনে নেই। রমজানে শীতের একটা আমেজ ছিল। একটা ঠাণ্ডা আবহওয়া ছিল, ধীরে ধীরে বিকেল হতেই সূর্য হারিয়ে যেতো, মাঠের ঘাসে হালকা শিশির জমে যেতো। খালি পায়ে সেই শিশির ভেজা ঘাসে দৌঁড়েছি। ইফতারের আগে সবার বাসায় ইফতার দিয়ে আসা হত। এও এক আনন্দের, সবাই মিলে রমজানের পবিত্রতা ভাগ করে নেয়া। পাড়া প্রতিবেশী সব বন্ধুদের বাসায় ইফতার দেয়া হতো। সেই অনুভূতি এখন বোঝান সম্ভব নয়, তখনকার সময়টাই যেন আলাদা ছিল। আবার সেহরির সময় দল বেধে ঘুরে বেড়ানোর কথা তো ভুলেই গিয়েছি। মনে বলে তেলের টিনের কৌটা এক পাশে ছোট ছোট ফুটো করে আর এক পাশ কেটে ভিতরে মোমবাতি দিয়ে অন্ধকারে হাটতাম। সেহরির জন্য লোকজনকে ডেকে তুলতাম। আবার মসজিদে সবাই মিলে ইফতার করতাম। সেই ইফতারে এত জমকালো আয়োজন না থাকলেও দারুণ লাগতো।

 

শব-ই-কদরের রাতে সারারাত মসজিদে থাকতাম। কে কত বেশি নফল নামাজ পরতে পারে। সেটার তো রীতিমতো প্রতিযোগীতা হতো। মসজিদের ছাদে বসে গল্প করাও চলত। এই তো কয়েক বছর আগেও আমরা সবাই এক সাথে শব-ই-কদরের রাতে ছিলাম। আমরা মসজিদ থেকে মসজিদ ঘুরে বেড়াতাম। সব মসজিদে যেয়ে যেয়ে নামায পরতাম। দল বেধে সব কর্মকাণ্ড করে বেড়াতাম।

 

ঈদের আগের সময়টা বেশি মনে পড়ে। আমরা বন্ধুরা মিলে কার্ডের দোকান ঘুরতাম। এখনও মনে পরে আমরাও কার্ডের দোকান দিয়েছিলাম। মজার ছিল, যে আমাদের কাছে টাকা পয়সা ছিল না। তাও ব্যবসা করব এতে উৎসাহ কম ছিল না। আবার এইদিকে ঈদের আগে বন্ধুদের বাসায় ঈদ কার্ড নিয়ে হাজির হতাম। অনেকগুলো কার্ড জমেছিল।

 

এখন স্মৃতি হাতরে যদিও সেগুলো কোথায় আছে জানি না। কালের পরিক্রমায় সব হারিয়ে গিয়েছে। বলা ভাল জীবনের পরিবর্তন এসেছে। এখন আর সেই সময় নেই। সময় পেরিয়েছে সহস্র পথ, বাঁক নিয়েছে কত শত! তবুও মন ফিরে পেতে চায় সেই শৈশব যেটা হারিয়েছে বহু আগে। ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়, নয়ত সবাই তার মত করে কালের পরিক্রমা করে আসত। ফিরে পেতে চাইত সেই সময়। কিন্তু সময় নিষ্ঠুর এটাই পৃথিবীর নিয়ম।

 

এবার বলি ঈদের দিনের কাজ কি ছিল। খুব ভোরে উঠে আগে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে পাঞ্জাবি পরে তৈরি হওয়া। এরপর বাবার হাত ধরে ঈদগাহ মাঠে যাওয়া নামাজ কোলাকুলি সবকিছুই নিয়ম মেনে হতো। ঈদগাহে ছোট মেলা হতো। কত কিছু পাওয়া যেতো আজ তা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। একপ্রকার টিনের বন্ধুক ছিল বারুদ দিয়ে ফাটাতে হতো, আবার ছোট ছোট রকেট ছিল যার আবার নাম ছিল লাদেন বোমা। যদিও তখন লাদেন কে আমি জানতাম না। কিন্তু এটা ফাটাতে ভাল লাগত। ভেতরে বারুদ দিয়ে আকাশের দিকে ছুড়ে মারতাম এরপর নিচে পরে ঠাস শব্দে ফেটে যেতো। এসব পাওয়া যেতো, কেনার বায়নাও থাকত। বাবা কিনে দিতেন।

 

এরপর বাসায় এসে বন্ধুদের বাসায় যাওয়া আর খাওয়া তো অনেক হতো। সবাই মিলে এর ওর বাড়ি বেড়িয়ে আসা হতো। কখনো আসেপাশেই ঘুরতে যেতাম। তখন তো একা একা বাসে চড়ার অভিজ্ঞতা ছিল না। তবে সপ্তম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় একটা স্মৃতি আছে সেটা হচ্ছে সবার কাছ থেকে লুকিয়ে আমি আর আবার এক বড় ভাইয়া ছিল সে সহ আরও দুজন মিলে হলে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। ওটাই ছিল আমার প্রথম একা একা দেখা সিনেমা। এর আগে আমি কখনও সিনেমা হলে একা একা দেখতে যাইনি। এরপর তো কতশত বার গিয়েছি। সিনেমার নামটাও মনে হচ্ছে, সেটা ছিল মান্নার সিনেমা। সিনেমার নাম ছিল ‘বাস্তব’। নায়িকা ছিল পূর্নিমা। তখন সিনেমার সম্পর্কে এত ধারণা ছিল না বলে ভালই লেগেছিল। তবে বাসায় আসতে আসতে রাত হয়েছিল এজন্য কিছুটা বকা খেয়েছিলাম। তবে মজা হয়েছিল।

 

আবার গ্রামে চলে গেলে সেই ঈদের আনন্দ অন্যরকম হতো। সেখানে খালাতো ভাই বোন মামা মামী আত্মীয় স্বজন সবার সাথে দেখা হতো। যদিও আমাদের গ্রাম এত উন্নত ছিল না। তাও অনেক বাড়ি ঘুরতে যেতাম। এছাড়া সকালের নামাজের পর কোলাকুলি থেকে শুরু করে পায়েস খাওয়া সবকিছু এখনও মনে পরে।

 

ঈদের গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সেলামী। শৈশবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস। এখন তো দশ টাকা কিছু মনে হয় না। অথচ তখন দশ টাকা দিয়ে আমরা কত কিছু করতে পারতাম সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কে কত টাকা সেলামী পেলো সেটার হিসেবে হতো। সেগুলো আবার আম্মার কাছে জমা থাকত। এখনও সেগুলো পাইনি। যদিও আম্মার কাছ থেকে কত নিয়েছি সেটার হিসেব তো আলাদা। মামা খালা ফুফা ফুফু নানা নানী সবার কাছ থেকে সেলামী পাওয়ার জন্য যুদ্ধ করতে হতো। কে বেশি দেয় কাকে কত টাকা দিল এসব নিয়েও নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগীতা হতো। কে আগে সেলাম করবে।

মনে পরে একবার এক মামা বিদঘুটে গন্ধযুক্ত একটা মোজা পায়ে পরেছিলেন যাতে কেউ সালাম করতে না পারে। আমি এত চালাক নই তবুও নাক বন্ধ করে সালাম করেছিলাম। এরপর দশ মিনিট ধরে সাবান দিয়ে হাত ধুয়েছি।

 

এখন তো সেলামী দিতে হয়। এটা সময়ের আবর্তন বলা হয়। এখন ছোটেদের সেলামী দেয়ার বয়স হয়ে গিয়েছে। এখন ঈদের প্রতি আর সেই আনন্দ ফিরে আসে না। এখন দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নিয়ে ঈদ পালন করতে হয়। তখন আর এখন সময়ের কত পার্থক্য। সময়ের স্রোতে কত কিছু ফেলে এসেছি সেই সুদূর অতীতে। এখন বর্তমানে সেসব ভাবতে গেলেও কত ভাবনা চলে আসে। তখন ছিল না এত যান্ত্রিকতা, ছিল না এত ভেদাভেদ ; শুধু ছিল নির্মল এক আনন্দ। যা শুধু তারাই অনুভব করতে পারবে যারা সেই সময়টা অনুভব করেছে। তবুও সময়ের সাথে পরিবর্তন আসবে আর সেটা মেনে নিয়েই জীবন চালাতে হবে।

 

আহা কতই না সুন্দর ছিল সেসব দিন যখন আমরা কিছুই বুঝতাম না। শৈশব এত প্যাচ ছিল না। যান্ত্রিকতা ছিল না। যেটা ছিল সেটা একদম খাঁটি একটা সময়। ছিল আনন্দের উচ্ছ্বাসের। ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।

 

মতামত
লোডিং...