ঈদ-স্মৃতি || শৈশবের ঈদ-স্মৃতি || আ.ন.ম সিরাজুম মুনির

ঈদ শব্দটা শোনামাত্রই মনের মাঝে আনন্দ লাগে। হৃদয়ে অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে। এ শব্দটা আনন্দের আলাদা মাত্রা বহন করে। যে মাত্রা অন্য কোনো শব্দে রয়েছে বলে আমার মনে হয় না। মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ আনন্দ হলো ঈদ উৎসব। ঈদ মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব হলেও জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে অনেকেই এ উৎসবে শামিল হয়।

 

ঈদ ছোট-বড় সবার কাছে সমান গুরুত্ব বহন করে। শৈশব, কৈশোর, যুব, বৃদ্ধ কোনো বয়সেই ঈদের খুশির আলাদা পার্থক্য থাকে না। সবার মনেই ঈদের আকর্ষণ কাজ করে। ঈদ মনকে দেয় আলাদা সতেজতা। ছোট-বড় সবাই যার যার অবস্থান থেকে ঈদকে হৃদয়ে গেঁথে নেয় এবং সকলের সাথে সমানতালে বিনোদনে শামিল হয়। তবে সবার জীবনই শৈশব দিয়ে শুরু। তাই শৈশবের ঈদ হৃদয়ে আলাদা জায়গা করে নেয়।

 

ঈদ আসে ঠিকই কিন্তু জীবন জটিলতায় এতটাই মগ্ন হয়ে গিয়েছি যে, কখন ঈদ এলো বা আনন্দ হলো কি হলো না, টেরই পাই না। শুধু এতটুকু জানি, ঈদের আনন্দ আর আগের মতো নেই। তাই ঈদের কথা মনে পড়লে এখনও নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হই। ছোটবেলায় ঈদের নতুন জামা আর জুতা লুকিয়ে রাখতাম। কেউ যেন দেখে না ফেলে। এ ছাড়া ঈদে কখন মেহমানরা বাসায় আসবে, কখন সালামি পাব এমন উত্তেজনায় বুঁদ হয়ে থাকতাম।

 

ছোটবেলায় বিপুল আনন্দ আর অন্য রকম ভালোলাগা নিয়ে উপস্থিত হতো পবিত্র ঈদুল ফিতর। এক সপ্তাহ আগ থেকেই ঈদের আমেজ বিরাজ করত আমাদের মাঝে। ঈদের আগের রাতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’ গানটি মনের গভীরে আনন্দের ঢেউ তুলত। ঈদের অনুষ্ঠানগুলোও দেখতে বেশ ভালো লাগত।

 

ঈদ আসলেই ঈদকার্ড ছিলো একটা এক্সট্রা  অর্ডিনারী বিনোদন। ঈদকার্ড ছাড়া তখন ঈদ মাটি-মাটি লাগতো। ঈদের দশ/পনের দিন আগেই স্কুলের বন্ধুদেরকে ঈদকার্ড দিতাম। বন্ধুরাও আমাকে দিতো। বাজারে কেনা ঈদকার্ডের চেয়ে নিজে বানানো ঈদকার্ডটাতেই বেশি বিনোদন পেতাম। বিশেষ করে ক্যালেন্ডারের পাতা কিংবা ভারি কাগজে জরি ও রং করে ঈদকার্ড বানাতাম।

 

আমরা ছিলাম মধ্যবিত্ত পরিবারের। ঈদের শপিংয়ের জন্য বাবাকে খুব জোর দিতাম। বাবার আয়-রোজগার খুব একটা যে বেশি ছিলো তাও না। ছোট বয়সে সেসব কি আর বুঝতাম! শপিংয়ে এক ঈদে জামা পেলে জুতো পেতাম না, কিংবা জুতো পেলে জামা পেতাম না। বাবা যে কোনো একটা কিনে দিতেন। এ কারণে মনটা বেশ খারাপ হতো। পাড়ার অন্য ছেলেমেয়েদের এতো-এতো জামা-কাপড় আর শপিং দেখে আফসোসের সীমা থাকতো না। নালিশের সুরে বাবাকে বলতাম। কী আর করা! স্বল্প জিনিস নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হতো। ঈদে যাই পেতাম, কাউকে দেখাতাম না। ভাবতাম অন্যদের দেখালে ঈদ পুরনো হয়ে যাবে। তাই যত্ন করে লুকিয়ে রেখে দিতাম।

 

ঈদের আগের দিন বাবার সাথে বাজারে যেতাম বাজার করতে। ঘুরে ঘুরে ঈদের বাজার করতেও বিপুল আনন্দ পেতাম।

 

ঈদের আগের রাতে চাঁদ দেখতে বেরোতাম। শহুরে রাস্তায় কখনো বা ইট-সিমেন্টের তৈরি দালানের ছাদে আবার কখনো বা আবদ্ধ ঘরের জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে/উঁকি দিয়ে গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকতাম চাঁদের অপেক্ষায়।

এখন তো সবাই ফেসবুকে চাঁদের তালাশ করে। ছোটবেলায় চাঁদ দেখার মাঝে যে কী আনন্দ ছিল, এখনকার ছেলেমেয়েদের বোঝানো যাবে না।

চাঁদ দেখামাত্রই খুশির মিছিল বের হতো। আমিও শরিক হতাম তাতে। দ্রিম দ্রিম শব্দে বাজিও ফোটানো হতো। তিন ভাই মিলে শহরের অলি-গলিতে বাজি ফুটাতাম।

 

রাতে ফুফাতো বোন হাতে মেহেদি লাগিয়ে দিতো। গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়তাম। সকালে মেহেদির ঘ্রাণে ঘুম ভাঙত। মনে হতো এটা যেন ঈদের ঘ্রাণ! ঝটপট উঠে বাবার সাথে ফজরের নামাজ পড়তে যেতাম। তখনকার ঈদ শীতের সময় হতো। নামাজ পড়ে কনকনে শীতের মধ্যে সুগন্ধি সাবান মেখে গোসল করতাম। গোসল শেষে নতুন জামা পরিধান করে বাবা-মাকে সালাম করতাম। মায়ের হাতের রান্না করা সেমাই, নুডুলস খেয়ে চলে যেতাম ঈদের নামাজ পড়তে। বাবার আঙ্গুল ধরে ঈদগাহের দিকে যেতাম।

 

ঈদের নামাজ শেষ করে সবার সাথে কোলাকুলি করতাম। ঈদে সালামি পাওয়ার জন্যে উদগ্রীব থাকতাম। তখন ৫ টাকা, ১০ টাকা, ২০ টাকা, ৫০ টাকা সালামির প্রচলন ছিলো। ঈদের নামাজ শেষ করে ঈদগাহেই বাবার কাছে সালামি চাইতাম। ঈদ সালামি নেয়ার জন্য চলে যেতাম দাদুর কাছে। দাদুকে সালাম করতাম। দাদু আগে থেকেই কড়কড়ে নতুন বিশ টাকার নোট রেডি করে রাখতেন। যাওয়ামাত্রই মাথায় আদরের হাত বুলিয়ে দিতেন নোটটা। একে একে বাড়ির চাচা, জেঠা, বড় ভাই, বড় বোন, এলাকার বড়দের কাছে সালামি চাইতাম। সবার থেকে পা ছুঁয়ে সালাম করে সালামি আদায় করতাম। সালামির টাকা মায়ের কাছে জমা রাখতাম।

 

ঈদগাহের আশপাশে খেলনা সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসত পাড়ার ছেলেরা। পাড়ার সব ছেলে-মেয়ে জড়ো হতো এখানটায়। বেশ হৈ-হুল্লোড় হতো। বাজি ফুটানো হতো। আনন্দ-উৎসব হতো। এরপর বাসায় এসে টিভিতে ঈদের অনুষ্ঠান দেখতে বসতাম। বিকেলে আমরা কয়েকজন অনেক দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ঘুরতে যেতাম। সীমাহীন আনন্দ আর হৈ-হুল্লোড়ে করে কেটে যেত বিকেলটা।

ঈদের পর বিনোদন হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানো ছিলো শৈশবের ঈদ বিনোদনের অংশ। সহপাঠীদের সাথে নানান জায়গায় ঘুরতে যেতাম। সন্ধ্যা নামতেই ফিরে আসতাম বাড়ি।

 

শৈশবের ঈদ-স্মৃতি লেখতে গেলে এর যেনো শেষ নেই। আমাদের জীবনে শৈশব আর কখনোই ফিরে আসবে না। এটা কালের বিবর্তনেরই অংশ। বর্তমানে যে যার অবস্থানে আছি সবার মাঝেই কমবেশি শৈশবের স্মৃতি রয়েছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মাঝে শৈশবের সেই স্মৃতিগুলো স্মৃতিচারণ করতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পুরোনো সংস্কৃতিকে হৃদয়ে লালন করে আগামীর অপসংস্কৃতি থেকে দূরে থাকতে পারবে। শৈশবের ঈদ-স্মৃতি খুব মনে পড়ে। এখন কেমন যেনো সব আনন্দেই ভাটার টান। আগের মতো করে আর আনন্দ হয় না ঈদে। বাস্তবতার চাপে সবই যেনো হারিয়ে যাচ্ছে। মনে হয় বড্ড ভালো ছিলো আমাদের ছোটবেলা! এখন আর ছোটবেলার মতো আবেগ নেই। সবকিছুই মনে হয় যান্ত্রিক, আবেগহীন ও অনুভূতিশূন্য।

 

মতামত
লোডিং...