ঈদ-স্মৃতি || দুই রকমের ঈদ || জুবায়ের ইবনে কামাল

 

 

আমার পেছনে ফেলে আসা ভালো ঈদের স্মৃতিগুলো দু’ভাগে ভাগ করা যায়। এক হচ্ছে শহরের ঈদ, আর অন্যটা গ্রামের। গ্রামের ঈদটা আগে বলি। শৈশবের গ্রামের ঈদগুলো ছিল খুবই আনন্দের। চাঁদ রাত থেকে শুরু করে ঈদের পরদিন পর্যন্ত আমাদের আনন্দ থাকত ভরপুর। খুশীর মুহূর্তটা শুরু হতো চাঁদ দেখার পরপরই। গ্রামে তখন যোগাযোগ ব্যাবস্থা এতো ভালো ছিলো না। তাই প্রতিবেশী ফুফু-খালাদের চাঁদ উঠার খবর দেয়ার গুরুদায়িত্ব আমরা পালন করতাম। মানে দৌঁড়ে দৌঁড়ে আশেপাশের বাড়িগুলোতে গিয়ে চাঁদ ওঠার খবর দিতাম। চাঁদ উঠেছে নিশ্চিত হওয়ার পর সব ছেলে-মেয়েরা একসাথে হতাম। সবাই আলাদা আলাদা কাজ ভাগ করে নিতাম। কেউ কচু গাছসহ অন্যান্য গাছের নল কাটত, কেউ কেউ আবার খেজুর পাতার বাঁশি বানাতো। গাছের ফাপা নলগুলোতে কাগজ আর পলিথিন ঢুকিয়ে নলের মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দিতাম। তারপর খেজুর পাতার বাশি বাজাতে বাজাতে  ‘চাঁদ উঠছে, ঈদ আইসে’ ছড়া কাটতে কাটতে এগিয়ে যেতাম। ওটাই আমার জীবনের প্রথম অরাজনৈতিক মিছিল। নলের আগুন যখন পলিথিনের কাছে আসতো, মাঝে মাঝে আওয়াজ হতো। এতে আমাদের খুশী যেন বহুগুনে বেড়ে যেতো। আগুন যদিও বেশীক্ষণ জ্বলতো না। কিন্তু যতক্ষণ জ্বলতো ততক্ষণে নিজেদেরকে রাজা-মহারাজা মনে হতো। আমার দাদা উঠোনের কোনে থাকা মাচায় বসে বসে বলতেন, ‘জোরে চিল্লা! আজকে কিছু কমু না’।

 

আর শহুরে ঈদটা ওত ঝলমলে না হলেও আনন্দটা অন্যরকম ছিলো। এখানে সালামির টাকা পাওয়াটা মুখ্য হয়ে উঠতো। সকাল সকাল আব্বুর এক বন্ধু (যাকে আমরা শামীম আঙ্কেল নামে চিনতাম) আসতেন, যাকে ঈদের সকাল ছাড়া কোনদিন দেখিনি। আমার জীবনে দেখা অন্যতম একজন কৃপন ব্যক্তি। তিনি সম্ভবত বাসা থেকে পকেটে দুই টাকার নোট গুনে গুনে আলাদা করে রাখতেন। যেই আসতো, পকেট থেকে না দেখেই টাকা বের করে দিতেন। কিন্তু পরে মিলিয়ে দেখতাম সবারটা সমান। এছাড়াও কোলাকুলির ব্যাপারটা শহরে বেশি দেখতাম। নামাজ শেষে প্রথমেই ধাক্কা খেতাম, যখন দেখতাম কিছুদিন আগেই আব্বুর সাথে যাদের ঝগড়া ছিলো, তাদের সঙ্গে বাবা খুব হাসতে হাসতে মসজিদের মধ্যে কোলাকুলি করছে। একবার অবশ্য বাজি ধরেছিলাম, মসজিদের রাগী ইমাম সাহেবের সঙ্গে কে কোলাকুলি করতে পারে। বলাই বাহুল্য, বাজিটা সবাই জিতেছিলো।

 

এছাড়া আরেকটা ব্যাপার ছিলো অন্যদের বাসায় যাওয়া। এটা এতটাই নিয়মের মত ছিলো যে, সারাদিন পাশের ঘরে যেখানে খেলাধুলা করছি সেখানেও ভালো জামা-কাপড় পরে তবেই সালাম দিয়ে ঢুকতে হতো। শুরু হতো সেমাই চেখে দেখার অনন্য এক প্রতিযোগীতা। যেখানেই যাই না কেন, এক বাটি সেমাই সামনে দিয়ে বলতো ‘একটু খেয়ে যাও’। দুপুর নাগাদ বুঝতাম আমার পেট বোঝাই লাচ্ছা সেমাই। তবে শহরের ঈদগুলো কিছুটা টেলিভিশন নির্ভরও ছিলো। ঈদের সাতদিনব্যাপী নানা রকমের অনুষ্ঠান হতো। এখন বুঝি, বেশিরভাগই ছিলো অখাদ্য। কিন্তু টিভি থেকে অন্তত এটা জানতে পেরেছিলাম যে, ঈদের দ্বিতীয় দিন কিংবা ঈদের তৃতীয় দিন বলেও একটা ব্যাপার রয়েছে।

 

ইদানীং ভাবি যে জীবনের মাত্র কয়েকটা বছর কাটিয়েও কত অদ্ভুত সুন্দর ঈদগুলোই না হারিয়ে ফেলেছি। কোলাকুলি তো ভুলে গেছি করোনা আসার সাথে সাথেই। গ্রামে গিয়ে ঈদ করার মত টান নেই। শুধু একটা বিষয় কিছুটা পাল্টেছে। দাদা আর মাচায় বসেন না; একদম শুয়ে গেছেন। কবরে।

 

এই ঈদটা আমার দাদাকে ছাড়া প্রথম ঈদ। ঈদ মোবারক।

 

মতামত
লোডিং...