ঈদ-স্মৃতি || শৈশবের ঈদ || জান্নাতুল আদন

‘ঈদ’ শব্দটি আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে ভিন্ন বললেই চলে। উঁচু-নিচু সকল বৈষম্যবাদ রেখে ইসলামের এই এক অমূল্যবান উপহার সকল মুসলিমবাসীর জন্য। দূরে রাখে সকল অমানবিকতা, বেড়ে উঠে আত্মীয়তার বন্ধন।
ঈদের এ দিনটার জন্য ছোট-বড় সকলেই প্রবল আগ্রহে এক খুঁশির আমেজ নিয়েই থাকে। আর ঈদের এই অপেক্ষা চলতে থাকে ঠিক মাহে রমজানের চাঁদ মোবারকের দেখা মিলবার পর থেকেই। এমন একটা রহমত, মাগফিরাত, নাজাতের মাস উপহার দিয়ে আল্লাহ সুবহান ওয়া তায়ালা ধন্য করেছে সকল মুসলিম ভাই-বোনকে। শুধু কি তাই, এই বরকতম মাহে রমজান মাসের পরেই এমন একটা দিন আমাদের মুসলিমজাতির জন্য জারি করেছেন যা দূর করে সাদা-কালো, গরিব-ধনাঢ্য। কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন-
আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন, হাত মিলাও হাতে,
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামের মুরিদ।
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।

 

প্রত্যেকেই তাঁর এই ঈদের দিনটা তাঁর নিজের পরিবারবর্গের সাথে পার করতে চাই। কিন্তু, নিয়তির কারণে-অকারণে তা হয়ে ওঠে না অনেকেরই। প্রতি বছর প্রতিটা মানুষের জীবন থেকে বিয়োগ হচ্ছে তাঁর প্রিয়জন বা কেউ প্রবাসী। এভাবে প্রত্যেকজনই এ আনন্দকে আলিঙ্গন করে নিচ্ছে এক বিয়োগের অধ্যায়ের সাথে।
মাহে রমজান শেষে সন্ধ্যায় বাড়ির সব ছেলে-মেয়েরাই ঈদের চাঁদ দেখার জন্য বের হয়ে পড়তাম ইফতার আর নামাজ শেষ করেই। শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখে আনন্দের ঢের সবদিকে। চারদিকে প্রতিধ্বনি হতে থাকতো “কালকে ঈদ, কালকে ঈদ” মনে কেমন জানি একটা প্রফুল্লতা আসতো। হাঁটতে হাঁটতে আমি আর আমার বোন মিফতা এক পাক ঘুরে আসতাম আমাদের বাড়ির ইস্কুল মাঠ থেকে। সে ইস্কুল মাঠে কত হৈ-চৈ বাড়ির বাচ্চা-কাচ্চাদের। তাদের হাসিতেই যেন ঈদের চাঁদের দেখা মিলে। ইস্কুল মাঠ থেকে একচক্কর দিয়ে এসেই বসে পড়তাম দু’বোন জরুরি সভায় সাথে আরো কয়েকজন। সভার আলোচনার বিষয় যে “কাল ঈদে কি করবো? কোথায় যাবো? কেন কাপড় পড়বো” ইত্যাদি ইত্যাদি। ঠিক তারপরই আমি আর মিফতা পিছু নিতাম আমাদের ভালোবাসার বড় দু’বোনের মেহেদী লাগানে প্রত্যাশায়। আর মেহেদী ছাড়া ঈদ ভাবাটাই দুষ্কর, বিশেষ করে মেয়েদের। যাই হোক, কাল ঈদ। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে সকাল সকাল উঠা লাগবে। সকালবেলায় চোখ কচলাই কচলাই ঘুম থেকে উঠা। এরপর সবার আগে আগে প্রস্তুত আমি আর মিফতা। তারপর আব্বু, ভাইয়ারা সকলেই একসাথে রওনা ঈদের নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে মসজিদের দিকে। অস্থিরতা আর ছুটাছুটি আমার মন যে কখন আসবে ঈদের নামাজ শেষ করে। আব্বু, ভাইয়ারা আসা মাত্রই ঘরের বড়জনদের কদমবুসি করে দাদির সাথে ঈদের নাস্তা খাওয়া। এরপর ফিতরার টাকা দেওয়া, ঘরে মেহমান আসা তার কিছুক্ষণ পরেই বের হয়ে যেতাম প্রতি বছরের ন্যায় “ঈদ বেড়ানো” যেটাকে বলি তারই উদ্দেশ্যে। বাড়ির মেঠো পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে সবার ঘরে যাওয়া। রাস্তাঘাটে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল আর রঙের ছড়াছড়ি।  আহা! বাড়ি বেড়িয়ে এসে বসে পড়তাম ঈদের সালামি গুনাতে। শৈশবের এই দিনগুলো ছিল অন্যরকম। যা বলে প্রকাশ করতে অক্ষম আমি।
আজ শৈশবের সে-সব দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায় যখন দেখি আমাদের ছোট ভাই-বোনেরা আমাদের ফেলে আসা শৈশবের সাথে মিশে যায়। আগের মতো আর সবাই একসাথে নেই; বড় দু’বোন তাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। আর গত ২০২০ সালে দাদির বিয়োগ নিয়েই আমাদের প্রত্যেকেরই এবারের ঈদ।
শেষ কথায় বলতে চাই, বেঁচে থাকুক সকলের প্রিয়জন, বেঁচে থাকুক সকলের শৈশবের স্মৃতি। মনের মধ্যে গাঁথা থাকুক, করে আসা সে ঈদ।
মতামত
লোডিং...