ঈদ-স্মৃতি || রূপকথার ঈদ || নূর সাজ্জাদ

শিউলি ফুলের নির্মল কিছু স্মৃতি বহন করে চলে যেতাম পশ্চিমের মাঠে। উঁচু টিলার মতো জায়গাটিতে পশ্চিমমুখী হয়ে বসে থাকতাম টিলার ঝুরঝুরে বালির ওপর। কত আরামপ্রদ বালির সে বিছানা, হাতির দাঁতে তৈরি মোগলাই পাটির কথা মনে করিয়ে দেয়। একা কখনো ঈদের চাঁদ দেখতে যাইনি। দলবেঁধে পাড়ার রন্ধ্রে-রন্ধ্রে আতশবাজি ফোটাতে না পারলে মনে হতো ঈদ আসেইনি। চারপাশের মসজিদগুলোর শুভেচ্ছা ধ্বনিতে আকাশ ভারি হয়ে আসুক, পাড়ার মসজিদ থেকে ‘ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক’ ভেসে না আসলে মনেই হতো না, ঈদ এসেছে। আমাদের আতশবাজি ছিল জগতসেরা আতশবাজি। রিক্সার চাকার শিক দিয়ে যে আতশবাজি আমরা বানাতাম তা অত্যাধুনিক না হতে পারে, কিন্তু অনন্য।

কৈশোরে সেহরি খাওয়ার পূর্বে আপুরা পাঠিয়ে দিতো তুহিনদের বাড়ি। তাদের উঠোনে মাঝারি গোছের একটি শিউলি ফুলের গাছ ছিল। শিউলি ফুলে তাদের উঠোন, শিউলি ফুলের গন্ধে আশপাশ, গলি-ঘুপচি ঢাকা পড়তো। গাছের কয়েকটি ডাল ঝুলে থাকত রাস্তার পাশে। আমরা উঠোনে যাওয়ার সাহস পাইনি, রাস্তায় যা পেয়েছি কুড়িয়ে এনেছি। বছরের অন্য সময়ও শিউলি ফোটে থাকতে পারে, কিন্তু আমরা কেবল রমজানেই এ কাজের আঞ্জাম দিয়েছি। মাসজুড়ে আমাদের শিউলি ফুল কুড়িয়ে আনা, আপুদের মাসজুড়ে শিউলি ফুলের মালা গাঁথা রোমাঞ্চকর। এ রোমাঞ্চ বুকে জমা রেখে চোখ বুলিয়েছি আকাশের চেহারায়— শাওয়ালের চাঁদ কোথায়?

চাঁদ বললে মস্তিষ্কের ফ্রেমে শাওয়ালের চাঁদটা ঠিকঠাক আসে না। হেলাল বললেই দু চোখে স্পষ্ট ভাসে—ওটা আকাশে ঝুলে থাকা ঈষৎ বাঁকা, ঈষৎ চিকন হার, পূর্ণিমার রুপোর থালা নয়। যথেষ্ট নিমকহারাম হওয়া সত্ত্বেও বনি ঈসরায়েলের জন্য আসমানি তোহফা মান্না-সলওয়া নাজিল হতো, আমরা কী এমন ওয়াফাদারি দেখিয়েছি কে জানে, খোদা আমাদের দিয়েছেন আসমানি তোহফা— ঈদ। ওইটুকু চাঁদ তার জোছনার জাল বিছিয়ে যেন অফুরন্ত আসমানি আনন্দ নিয়েই নাজিল হতো পুরো পহেলা শাওয়াল জুড়ে। আমরা চাঁদরাত কাটিয়ে দিতাম নির্ঘুম। আমার ছোটো ভাই সানা উল্লাহ রঙিন কাগজ দিয়ে তারকা, ফুল, কত কি বানাতো। ছোটোবেলা থেকে ওসবে তার হাতেখড়ি। কাগজ দিয়ে তৈরি শাপলা, পাখি, ফুটবল, ঝুড়ি ছাড়া আর কিছুতে আমার হাতেখড়ি ছিল না। এক ঈদে বেশ বড়-সড় কয়েকটি কাগজ দিয়ে বেশ বড়-সড় কয়েকটি পাখি বানিয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছিলাম গেস্ট রুমে।

মেহমানদের অন্তরে যথেষ্ট কৌতুহল জাগিয়েছিল আমার ঐ নির্মাণশৈলী। অনেকে আবদারও করে বসেছিল, তাঁদেরও কিছু এ জাতের পাখি চাই। কাগজের পাখি আত্মীয়-স্বজনের এত নজর কাড়বে আমি কল্পনা করিনি। আমার ধারণায় তারা কেবল খাবার-দাবার, পোশাক পরিচ্ছদেই শৈল্পিক। কিন্তু না, তাদের দেখে আমি নিশ্চিত হয়েছি, মানুষ স্বভাবতই শৈল্পিক। শিল্প তাকে আকৃষ্ট করতে পারে বলেই মানব-সভ্যতা এত সুন্দর, এত রুচিসম্মত। খুনিও চায় কারুকার্যমণ্ডিত সুন্দর হাতিয়ার—অথচ তার দ্বারা কোনো মনোরঞ্জন করা হবে না, মানুষ খুন করা হবে। কাগজের দু’ধরনের পাখি আমি বানাতে পারতাম। দু’ধরনের পাখির ভেতর পেটঅলা পাখিটিকে আকর্ষণীয় দেখাতো। ওটার নির্মাণশৈলী এমন ছিল, কাগজ মোড়াতে-মোড়াতে আপনা-আপনি পাখির তলপেটে একটা ফুটো তৈরি হয়ে যেতো। ঠোঁট দিয়ে তার ভেতরে বাতাস করলেই পাখির পেট বেরিয়ে পড়তো।

অন্য পাখিটি এত খাস আদলের ছিল না। দুর্ভাগ্যক্রমে আকর্ষণীয় পাখিটির নির্মাণশৈলী আমার স্মৃতি থেকে সটকে পড়েছে। কাগজের এসব হস্তশিল্প আমি আমার গাঁয়ে অবস্থিত খ্রিস্টানদের একটি সেবা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশনের ট্রেনিং সেন্টারে বিনা খরচে শিখেছি। কোনো এক সুবচনা, সুদর্শনা মেম আমাদের খুব আদর-যত্ন করে এসব শেখাতেন। চাঁদরাত শুধু আমরা নির্ঘুম কাটিয়ে দিতাম, এমন নয়— পাড়া-পড়শির মৃদু শোরগোল শোনা যেত। তারা বোধয় আম্মুর মতো রাত জেগে চালের পিঠা বানাতো। রাত জেগে দেওয়া আপুদের হাতের লাল মেহেদি মনে করিয়ে দিতো নকশীকাঁথার কথা। বাড়ির একটি মাত্র জীর্ণ-শীর্ণ মেহেদি গাছ তাদের কম আকাঙ্খা পূরণ করেনি।

আমি যথেষ্ট চেষ্টা করেছি, স্মৃতির কিছু কামরার সন্ধান দিতে। অনেক কামরাই এখন পরিত্যক্ত। দীর্ঘদিন আসা-যাওয়া বন্ধ থাকায় তাদের দিশা আমি হারিয়ে ফেলেছি। এই এক বিপদ—দৈনন্দিনতার ঘন কুয়াশা কেটে অতীতে পা বাড়াতে গেলেই পথিক পথ হারায়। আমার জীবনে আদতে আশ্চর্যের কিছু ঘটেছে কি? এমন কোনো স্মৃতি আছে কি, যা কারো মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে? হতে পারে, নেই। চাঁদরাতের শেষ কিছু মুহূর্ত অনিচ্ছায়, অজান্তেই দু’চোখে ঘুম ভেঙে আসতো। ঘুম ভাঙতো জাফর মুয়াজ্জিনের সেই চেনা কণ্ঠের অপূর্ব ডাকে— ঈদ মোবারক! ঈদ মোবারক!

অসামান্য ক্ষমতা ছিল সে ডাকের। মনের ভেতর থেকে কেউ বলে ওঠত, আজ ঈদ! আজকের সারাটা দিন আনন্দের আস্বাদ গ্রহণ করার, শত্রুকে বুকে জড়িয়ে ধরার, ভ্রাতৃত্বের বন্যায় সমস্ত ঘৃণা আর বিদ্বেষকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার। অবশ্য একেবারে ছোটোবেলায় ভাবতাম, আজকের সারাটা দিন খাওয়ার এবং খাওয়ানোর, ঘোরা-ফেরার এবং সালামি নেওয়ার। এখন তখনকার ঈদ রূপকথা, আর ঈদের স্মৃতি রূপকথার গল্প।

মতামত
লোডিং...