ঈদ-স্মৃতি || তিন দফা ঈদ উদযাপন চলতো আমার || আবু মুহাম্মদ মুশফিক ইলাহী

 

রমজানের চাঁদ উঠলেই আমাদের দুই ভাইয়ের মাঝে ঈদ আলাপ শুরু হতো। কবে গ্রামের বাড়ি যাবো? রোজা কি ২৯টা হবে নাকি ৩০টা? এসব আলাপ শুরু হতো একদম প্রথম রমজান থেকেই। সেই ছোট থেকেই রমজান আসার আগে ঈদের বাজার শেষ করে ফেলতাম। আব্বু আম্মু বলেন, রমজান ইবাদতের সময়, মার্কেটে ঘুরবার নয়। যেহেতু রমজানের আগেই শপিং শেষ হয়ে যেত, বন্ধুদের সবার আগে ঈদের জামাও কেনা হয়ে যেত আমার। মাদ্রাসার বন্ধুদের এসে বলতাম, আমি জামা কিনেছি। কোন রঙয়ের কিনেছি সেটাও বলতাম। আমার মতো হুবহু জামা আরো বহুজনের হতেই পারে এটা মেনে নিতে আমার আপত্তি ছিলো না কখনো। তবে প্রতিবার ঈদে আমার মতো জামা পরিচিতদের কারো কাছেই দেখতাম না।

 

রমজান মাস অর্ধেক গেলে দুই ভাইয়ের আলোচনা আরো বেড়ে যেতো। দুপুরে আমরা একসাথে বসে বসে শুধু ঈদ নিয়েই নানা আলাপ জুড়ে দিতাম। দেখতে দেখতে চলে আসতো লায়লাতুল কদর। কদর শেষে রওয়ানা দিতাম গ্রামে। একই উপজেলাতেই গ্রামের বাড়ি। তাই ঈদ যাত্রা খুব সহজ ছিলো। গাড়িতে উঠতেই কিছু সময় পরে বাড়ির দেখা পেতাম।

 

আমাদের পরিবারে চার সন্তান। আমার মেজ জেঠার এক ছেলে, এক মেয়ে। আর আমরা দু’ভাই। ৪ জনের ঈদ একসাথেই কাটতো। বাড়িতে গেলেই জেঠাতো ভাই আবদার জুড়ে দিতো সে আমাদের ঈদের জামা দেখবে। কিন্তু সে আবার নিজেরটা দেখাবে না। ঈদের আগে দেখালে যে পুরোনো হয়ে যাবে। এসব মজাদার পাগলামি চলতো। বাড়ি যাওয়া মানেই বড় মাঠে ক্রিকেট খেলা। ঈদের আগের দিন ক্রিকেটেই চলে যেত।

 

শেষ রোজার ইফতার হচ্ছে। এমন সময় চাঁদ দেখে বাচ্চাদের হট্টগোল শুরু হতো। আতশবাজি হতো। গ্রামের পথঘাট চিনি না বলেই সে আনন্দে একাকার হওয়ার সুযোগ ছিলো না। তখন থেকেই ঈদের চাঁদ উঠতেই বিটিভি দেখাই লাগতো। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মন মাতানো কালজয়ী সংগীত ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ না শুনলে তো ঈদ ঈদের মতো হলোই না। অন্তত কয়েকবার শোনা হতো।

 

আম্মুরা সবাই মিলে বিভিন্ন পিঠা বানাতে বসতো। আর আমরা বসে বসে ঈদে কোন টিভিতে কোন আয়োজন আছে তা দেখতাম। অবশ্যই আমি রমজানে পত্রিকা থেকেই কিছু আয়োজনের সময় আর চ্যানেলের নাম টুকে নিতাম। ক্রিকেটারদের নিয়ে আয়োজন, ইত্যাদি এবং আরো কিছু ঈদ অনুষ্ঠান টুকে নিতাম ছোট্ট একটা কাগজে। এভাবেই রাত আসতো। মনে মনে কত আনন্দ। রাত শেষ হলেই ঈদ।

 

ঈদের সকালে তাড়াতাড়ি ডেকে দেওয়া হতো। দূর থেকে অনেকেই আসতো ফিতরা সংগ্রহে। আব্বুরা ফিতরা দেওয়ার সময় কত টাকা দিলো সে হিসেব করতাম। আর আব্বুরা মসজিদে গেলে বাকি টাকা হতে নিজেরাই ফিতরা দিতাম। আর আব্বু আসলে জানাতাম। ঈদের সকালের এই বিশেষ সময় মনে পড়ে খুব।

 

বাড়িতে কেউ একজন ঈদগাহ হতে এলেই আমাদের ঈদ শুরু হয়ে যেতো। দাদুকে সালাম করে মা আর মেজ জেঠিকে সালাম করতাম। আর সালামীও গুনে নিতাম সাথেসাথেই। বাবা আর জেঠারা দাদার কবর জিয়ারত করেই ঘরে ফিরতো বলে কিছুটা দেরি হতো। এই সুযোগে মায়ের মোবাইল হতে বন্ধুদের মোবাইলে ঈদের শুভেচ্ছা বার্তা পাঠাতাম। দাদু আর নানু বাড়িতে নেটওয়ার্কে যে কী সমস্যা ছিলো! বাবা আসলেই ঘরের পরিবেশ পালটে যেত। সালাম আর সেলামী এই দুয়ের হিসাবের পর হাল্কা ঝগড়াও হতো। পরিবারের একমাত্র মেয়ে হিসেবে জেঠাতো বোনকে সালামি বেশি দিতো। এই নিয়ে আমাদের তিন ভাইয়ের সে কি রাগ! এমনটা প্রতিবছরই চলতো। এরপরে আব্বুর হাত ধরে চার ভাই-বোন বের হতাম। পুরো বাড়ি ঘুরতাম। খাওয়া-দাওয়া আর ঈদ সেলামী। ঘুরাফেরা শেষে দুপুরেই বাড়ি ফিরতাম। বাকি সময় অপেক্ষা চলতো, কে বাড়িতে আসবে বেড়াবে। কারণ সালাম করলেই যে মিলে যাবে রঙিন নোট। কিন্তু সালামি দেওয়ার সময় নিতে চাইতাম না। এমন ভাব করতাম যেন সালামি পেয়ে আমি প্রচুর লজ্জা পেয়েছি। বলা যায়, ভং ধরতাম।

 

সন্ধ্যা বেলায় বাড়ির জেঠিমারা আর আম্মু মিলে দাদুদের সাথে দেখা করতে যেতো। বাড়ির মুরুব্বিদের সালাম করে আসতো সবাই। সে সময় আসা মেহমানদের দেওয়া সালামি আলাদা করে রাখতাম। আম্মু আসলে দেখানোর জন্য। আম্মুর কাছেই সব ঈদ সালামি জমা রাখতাম। ঈদ শেষে আম্মু টাকাগুলো আর দিতো না। ছেলে টাকা পেলে নষ্ট হয়ে যাবে, এটাই আম্মুর থিওরি। তখন অনেক রাগ হতো। যদিও পরের বছর আবারো আম্মুর কাছেই জমা রাখতাম টাকা। ঈদের পরের কয়দিন মূলত ‘ইত্যাদি’ সহ অন্যান্য টিভি আয়োজন দেখেই কাটতো। তবে এক্ষেত্রে হানিফ সংকেত-এর ‘ইত্যাদি’ সবচেয়ে প্রিয় ছিলো আমাদের।

 

বাড়িতে ঈদ আমেজ ফুরাতে না ফুরাতে আমাদের মনে আবারো আরেক ঈদের আমেজ শুরু হতো। কারণ এবার আমরা ঢাকা যেতে হবে। আমার একমাত্র মামা, মামী আর নানু ঢাকা থাকেন মামার চাকুরির সুবাদে। আম্মুর খালাতো ভাইয়েরাও ঢাকাতেই থাকেন। আবার মামার বন্ধুরাও আমাদেরকে নিজেদের ভাগ্নের মতো আদর করেন। তাই, ঈদের সবচেয়ে বড় সালামী জমা থাকতো ঢাকাতেই। আর খাওয়া-দাওয়ার জন্য আমার নানুর বাসা সবসময়ই সেরা। আমাদের পেলে নানু আর মামীও যেন ছোট হয়ে যান। নানুর রান্নার উপর রান্না, আর মামীর সাথে লুডু খেলতে বসে হাল্কা চুরি করে খেলা শেষে সেটা আবার স্বীকার করার মজাটা আজীবন মনে রাখার মতো। প্রতিবারই ঢাকা থেকে ফেরার সময় আম্মু আর নানুর কান্না কিংবা মামা মামীর মলিন চেহরা ক্ষাণিকটা হলেও কষ্ট দিতো।

 

মাদ্রাসা খোলার পর প্রথমদিন ঈদের জামা পড়েই যেতাম। শিক্ষকদের সালাম করে দোয়া নেওয়া, আর বন্ধুদের সাথে বুকে বুক মেলানোর আনন্দের সাথে কিছুর তুলনা হয় না। ক্লাসের ফাঁকে কে কত সালামি পেলো, কার জামা কোথা থেকে কিনলো এসব নিয়েই আড্ডা জমতো। ঈদের সালামির টাকা দিয়ে বন্ধুদের নাস্তা করাতো অনেকেই। গ্রামের বাড়ি, নানুর বাসা আর মাদ্রাসা। এভাবে তিন দফা ঈদ উদযাপন চলতো আমার।

 

সবার চোখে এখন আমি যথেষ্ট বড় হয়েছি। প্রাথমিক, মাধ্যমিক পেরিয়েছি। সালামি নেওয়ার বদলে দিতে হয় এখন। আগের সেই আমেজেও পড়েছে ভাটা। যান্ত্রিক দুনিয়াতে ঈদের সকাল শুরু হয় ফেইসবুকের পাতা স্ক্রলিং এর মাধ্যমে। এখন আর আগের সেই আনন্দ নেই। বাচ্চা বয়সের মধুর ঝগড়াও আর করা হয় না। যদি সুযোগ হতো, বাল্যকালের সেই সোনালী সময়ে আবারো ফিরে যেতাম। আমার মতো পৃথিবীর বহু মানুষের চাওয়াটা এমনই!

 

মতামত
লোডিং...