ঈদ-স্মৃতি || যদি পারতাম আবারো ফিরে যেতাম || ইসরাত জাহান নীলা

 

ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। ঈদ মানে নতুন চাওয়া-পাওয়ার অভিলাষ। কিছু কিছু কথা অব্যক্ত, অপ্রকাশিত থেকে যায়। থেকে যায় মনের কুটিরে। জমা হয়ে থাকে স্মৃতির পাতায়। তেমনি অব্যক্ত অনুভূতি হিসেবে স্মৃতির পাতায় জমে আছে ছোটবেলায় কাটানো ঈদের আনন্দঘন মুহূর্ত।

 

রমজানের আগমনেই আমাদের কোমল মনে যেন ঈদ আনন্দের রেশ ছড়িয়ে পড়তো। দিন যায় রাত আসে। এমনই দিন কাটাতে কাটাতে এসে যায় ঈদের জামা কেনার আনন্দ। ঈদের জামা কিনতাম। অনেকেই জামা দেখতে আসতো। কিন্তু ঈদের আগে ঈদের জামা অন্যদের দেখানো নিয়ে ছিল ভিন্ন এক হিংসুটে ভাব। মনে হতো এমন ডিজাইনের জামা যেন শুধু আমার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। ছোট হলেও ‘দেখাবো না’ কথাটি বলতে পারার অপরাগতার কারণে সবাইকে দেখাতাম। তবে বলে দিতাম, এমন জামা যেনো না কেনে!

 

রমজানের শেষের দশক যেন কাটতোই না। অপেক্ষার প্রহর শেষে নতুন চাঁদ এসে দেখা দেয়। চাঁদ দেখার আনন্দই ছিল দারুণ। টিভি অন করে একবার হলেও শুনে নিতাম জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের খুবই সুপরিচিত ও সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ঈদ সংগীত “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”- এটি শুনতেই অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করতো।

 

অতঃপর মন তাড়া দিতো মেহেদির দিকে। হাতকে রাঙিয়ে দিতাম মেহেদির লাল রঙে। নানা সাজে সাজতো দু’টি হাত। আম্মু বানাতো হরেক রকমের মজার মজার নাস্তা। আর আম্মুর হাতের নাস্তা তো সবসময় সেরা। এভাবেই আনন্দের সাথে কেটে যেতো রাত। থাকতাম সকালের অপেক্ষায়।

 

অবশেষে এসে যেতো কাঙ্ক্ষিত সেই ভোর। নতুন জামা পড়ে সালামি নেওয়ার দিন। আব্বু সকালে চলে যেতেন ঈদগাহে। বোনেরা মিলেমিশে বাবা আসার অপেক্ষা করাতাম। আব্বু ঈদগাহ হতে এলে শুরুতে আব্বু-আম্মুকে সালাম করতাম। সালাম শেষে তাদের সামনে সালামির আশায় ঘুরঘুর করার সময়টা ছিল অসাধারণ। সালামি পেয়ে মুচকি হেসে চলে যেতাম।

 

আর মামাদের কাছে আদর-আবদার একটু বেশিই। যেহেতু আমি ভাগ্য করে ৭ মামা পেয়েছি বলে আদরটাও একটু বেশি। তাদের কাছ থেকে পাওয়া সালামি কত হবে তার হিসেবটাও করে নিতাম আগেই। তার মধ্যে একটা মামার কাছ থেকে সালামি পাওয়ার গল্প ছিল খুবই ভিন্ন। মামা বলতেন, “টাকা পেতে চাও তো চলে এসো আমার সাথে।” এরপরই এক ঝাঁক পাখির মতো ভাই-বোনেরা ছুটে চলতাম মামার পেছন পেছন।

 

সালামি নিয়ে আদরের ছোট বোনের সাথে খুঁনসুটিও ছিল আনন্দময়। ঘরের ছোট মেয়ে হিসেবে তার আদরটা একটু বেশি ছিলো। ফুফী, মামা তাকে একটু বেশিই সালামি দিতো। আর তখন তার কাছ থেকে ভাগ নিয়ে তাকে কাঁদিয়ে দেওয়ার মজাই ছিল আলাদা। আবার মাঝেমধ্যে আমার সালামির অংক শতক বা হাজার থেকে ২০-৩০ টাকা কম থাকতো। বড় আপুকে রাজি করিয়ে তার থেকে সেই ২০-৩০ টাকা নিয়ে নিতাম। এভাবে সকল বাচ্চামির বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে ঈদ আনন্দ বয়ে যেতো।

 

বরাবরই আব্বু আমার প্রিয় সঙ্গী। আর ঈদ এনে দিতো আমার আব্বুর সাথে ঘুরে বেড়ানোর সবচেয়ে বড় সুযোগ। ঈদে ৩-৪ দিন ঘুরে বেড়াতাম। বেড়াতে যাওয়া হতো ফুফীর বাড়ি থেকে শুরু করে সব আত্মীয়দের বাড়িতে। সাথে তো হরেক রকমের খাওয়া-দাওয়া থাকতোই। তবে তখন বেড়ানোর চেয়ে সালামির লোভটা ছিল বেশি। ঘরে বসে যাদের সালামি পেয়ে যেতাম তাদের বাসায় যেতে চাইতাম পরে। এসব কারণে কেউ আবার আমাকে লোভী ভাববেন না।

 

আসলে তখনকার সময়ে সালামি নিয়ে বোনদের সাথে খুঁনসুটি, বারবার সালামি গুনে দেখা, কিংবা জামা নিয়ে করা সেই পাগলামী এখন এক গুচ্ছ স্মৃতি হয়ে মনের মনিকোঠায় জমা হয়ে আছে। যদি পারতাম আবারো ফিরে যেতাম সেসব আনন্দঘন মুহূর্তে। আবারো মেতে উঠতাম সেই আনন্দে।

 

মতামত
লোডিং...