ঈদ-স্মৃতি || পৃথিবী জয় করা “ঈদ আনন্দ” হারিয়ে খুঁজি! || সাফাত বিন ছানাউল্লাহ্

জাতীয় কবির অমর সেই গান-
“ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ”- মসজিদের মাইকে, টেলিভিশনের পর্দায়, কেউ খালি গলায় ধরেছে একটি মাত্র গান, একটি মাত্র সুর। বিদ্রোহী কবির সেই অনেক বছর আগের গানটি দুনিয়াময় সারা ফেলেছে যুগ যুগ ধরে। একটা সময় ছিল খুশির ঈদকে উৎযাপনের। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম-সাধনার দিন শেষে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই মেতে উটে বাধনহারা আনন্দে। এখন আর সেই দিন নেই, হারিয়ে গেছে স্বৃতির অতল গহীনে।  মানুষের মধ্য থেকে চলে গেছে- মায়া, মমতা, শ্রদ্ধা, স্নেহ আর বিশাল দায়িত্ববোধ। বিভিন্ন অনুষ্ঠান উৎযাপনের ক্ষেত্রেও এসেছে ভিন্নতা। এইবারের ঈদ বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক অনেক থমথমে ও নিস্তব্ধ। পৃথিবীব্যাপী মরণঘাতী “করোনা” পরিস্থিতিতে স্তব্ধ হয়ে আছে চারদিক। মাসের পর মাস সবাই বাড়িতে অবস্থান করে মানুষ একপ্রকার দিশেহারা। চাকরি ও ব্যাবসায় সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিপর্যয়ে দুনিয়া। তাই আনন্দ অনেকের বিষাদে পরিণত হচ্ছে দিনদিন। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ লাশ দেখতে হচ্ছে অনেককে।
২০২০ সালের পর ২০২১ সালেও ধরণীর বুকে বিষ ঢেলে দিয়ে তাণ্ডবলীলা চালাচ্ছে অহর্নিশ। ভয়ংকর মহামারী মোকাবিলা করার সাথে জীবনের আরো একটি কষ্ট, দুঃখ, যন্ত্রণা – বাবাদের মধ্যে একমাত্র জীবিত জেঠার অকাল প্রয়াণ! দুবাই থেকে তিনি, মেজআম্মু আর ছোটবোন এসেছিলেন অনেকদিন পর নিজ দেশ দেখবেন আর ঈদ করবেন বলে। সবাইকে ছেড়ে এভাবে প্রিয় মেজআব্বু চলে যাবেন, স্বপ্নে ও ভাবিনি! কয়েকমাস আগে থেকে কত ভাবনা – অনেক বছর পর দুবাই থেকে মেজআব্বুরা আসবে। আড্ডা দিব, ঘুরবো, খাব আরও কত প্লানিং। ছোটভাই বিয়ে করেছে। আমাদের ঘরের বাতি আজান ও আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে হামাগুড়ি আর দাঁড়ানোর নিরন্তর চেষ্টায়। আসার আগে নিয়মিত কথা হচ্ছিলো নতুন বউয়ের রান্না, নাতির দুরন্তপনা বেশ উপভোগ হবে। শহর থেকেও ফুফুরা তাদের বাবার বাড়ি সেই কবে এসেছে মনেও পড়ছে না। নতুন বছরটি এবার অনেককিছুর বার্তা নিয়ে এসেছিল। প্রিয় মিঠু ভাইয়া ও দীর্ঘদিন পর আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে এসেছিল। সবাই একসাথে হৈ-হুল্লোড় করে গ্রামে আসবে! সময় কাটাবে! মজা করবে।
সব আশায় গুঁড়োবালি। পুষে রাখা আনন্দ নিমিষেই যন্ত্রণাদায়ক সময় প্রতি সেকেন্ড থেকে মিনিট। বড় আব্বুর স্নেহ থেকে অনেক আগেই বঞ্চিত হয়েছিলাম!  আঁট বছর আগে জন্মদাতা হারানোর শোকে এখনো কোন কোন দিন পাথর হয়ে যাই! সবকিছুর মাঝে যাকে ঘিরে বেঁচে থাকা। দূরদেশ থেকেও সাহস করতাম তিনি তো আছেন আশ্রয়স্থল। মেজআব্বুকে চিরতরে হারানোর ব্যথা ভুলবো কেমন করে? কোনমতেই ভুলার নয়, মুছে যাওয়ার নয়! এয়ারপোর্টে যেদিন আনতে গিয়েছিলাম সেদিনের পর থেকে কত ঘণ্টা এরসাথে বসে গল্প করেছি স্মৃতির মণিকোঠায় সবকিছু ভাসমান। মেজআম্মু, ছোটবোন সাদিয়া, ভাগনি সামার চলে যাওয়ার কথা ছিল, লকডাউনের কারণে যেতে না পারলেও ওদের পাবনা ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে। শহরে আটকে আছে দীর্ঘদিন। দূর থেকে এবারও ওদের জন্য একরাশ “ঈদের শুভেচ্ছা”।
আহা! ছোটবেলার ঈদ কত মধুময় ছিল, ছিল বিচিত্রতা। একা মনে বসলে আজো ফিরে যাই সেই দিনগুলোতে। আমাদের পরিবারের আমেজ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। দাদা যেহেতু পীর সাহেব ও সম্মানীয় ছিলেন সেহেতু ওনার মুরিদানের মধ্যে ঈদ পালনের রীতি ছিল- প্রতি বছর চাঁদরাতে এক বিশাল ডেকসিতে শিরণী পাকানো হতো। ঈদের দিন সকালে নামাজের আগে খুব ভোর থেকে মুরিদরা এসে শিরণী খেত আর ঈদি-চাউল উপহার দিত। এই রেওয়াজ প্রায় ৫০-৬০ বছর আগে থেকে আজো চালু আছে আমাদের বাড়ীতে, যদিও নেই তখনকার কোলাহল আর প্রাণচাঞ্চল্য। শিশুকাল কত যে পরিপূর্ণ ও সুন্দর লিখে শেষ করা যাবে না। সবার আদর বিশেষ ধরনের পেয়েছিলাম বলে আজো সেকেলে হতে বড় ইচ্ছে জাগে।
আমি তো দাদাজানকে পাইনি, মায়ের বিয়ের আগেই ওনি ইন্তেকাল করেন। জন্মাবার পরের প্রায় দেড়যুগ পেয়েছি দাদু আর বাবার স্নেহ যদিও দুজনই আজ ওপারের যাত্রী।  স্বৃতির ক্যানভাস থেকে যতটুকু মনে পরে,  রমজানের মাঝখানে সবাই একসাথে শপিং করতে যাওয়া, আমরা সকলেই খুব মজা করতাম। শহর থেকে ঈদের কাপড় পাটাতেন দুই ফুফুও। চাঁদরাতের দিনের শুরুটা থেকে ছিল উত্তেজনা কখন রাত আসবে। সন্ধায় দাদার এক মুরিদানের ছেলে ইসমাইল বদ্দা আসতেন শিরণী পাকাতে। বাবা তো সার্বক্ষণিক থাকতেন, সাথে ঘুরঘুর করতাম আমি আর ছোট্ট ভাই রিফাত। তখনো আর এক ছোটভাই তপু, বোন ঐশি পৃথিবীতে আসেনি।  অন্যরকম এক রোমাঞ্চ কাজ করত আমাদের মনে। বাবাদের সঙ্গে থাকত পাড়ার মুসা দাদা, দুলাদাদা প্রমুখ। গভীর রাতে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে বাবা ফাতেহা দিতেন। তারপর দাদু-আম্মু সামনের বারান্দায় নতুন পাটি বিছানা দিতেন খুশির দিনের জন্য। ঈদের আনন্দে সেই রাত যেন কত দীর্ঘ শেষ হতোনা কিছুতেই। এপাশ ওপাশ করে কোন রকম রাত শেষে যখন মসজিদে আজানের ধ্বনি তখন বিছানা ছেড়ে উটে গোসল সেরে পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে বারান্দায় বসতাম বাবার পাশে। একে একে আসত দাদার শিষ্যরা। ওরা আসার সময় চাউল কেউ ঈদি (বখশিশ) নিয়ে আসতেন। সেই শিরণীর মধ্যে এমন স্বাদ ছিল যেটা খুশি চলে যাওয়ার পরেও সারা বছর মুখে লেগে থাকতো।
সকাল ৮টায় সবাই দলবদ্ধভাবে চলে যেতাম মাদ্রাসার ঈদগাহে। নামাজ শেষে পুরা এলাকার যারা বিভিন্ন কারণে দেশের নানা প্রান্তে সবার সাথে দেখা হতো সালাম বিনিময় ও কোলাকুলিতে ধনী-গরিব-সাদা-কালো-লম্বা-বেটে সবাই এক ও অভিন্ন। ঈদগাহ থেকে কবর জিয়ারত করে মা-বাবাকে সালাম করে বেড়িয়ে পরতাম প্রতিবেশী বড়দের সালাম করতে। ওরাও ভালবেসে দিতো ঈদী, কেউ ১০টাকা কেউ ২০ টাকা সেইসময় অনেক বেশী। সকাল থেকেই বাড়ীতে মেহমানদারি করতে হতো সমানতালে দম রাখার সময়টুকু পাওয়া যেতনা। শহর থেকে বড় আব্বুও আসতেন, সব আনন্দের মাঝে বড়দের কাছ থেকে ঈদ সম্মানী নেয়াটা আনন্দের নতুন মাত্রা যোগ করে।
একটি স্বৃতির কথা আজো মনে পড়ে: আমি ছোট ছিলাম তাই আশেপাশের পাড়াতো ফুফুদের সাথে প্রতিবছর বেড়াতে যেতাম। রহিমা আন্টি, মরিয়ম আন্টি, রোকেয়া আন্টি, পারভিন আন্টিরা আমাকে নিয়ে যেত কোথাও গেলে। একবার হল কী- সবাই আমাকে তৈরি হতে বলল, আসলে তাদের উদ্দ্যেশ্য ছিল আমাকে না নিয়ে যাওয়ার। তো আমি কাপড় পরে বসে আছি ওদের জন্য অনেক সময় অপেক্ষা করার পর শুনলাম আন্টিরা চলে গেছে। সেদিন কিযে খারাপ লেগেছিল, সারাদিন কেঁদেছিলাম! ফুফুরাও এখন এক জায়গায় নেই, পৃথিবীর চিরায়ত নিয়মে যার যার সংসার জীবন নিয়ে ব্যস্ত। দিনগুলোর কথা ভাবলে ফিরে যাই অন্য এক জগতে। বড়আব্বুর হাত ধরে চট্টগ্রাম শহরের জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদে দুই ভাইয়ের নামাজ পড়তে যাওয়ার স্মৃতি ও ঝাপসা। ঈদের দিন থেকে শুরু করে কয়েকদিন পর্যন্ত অনবরত অতিথি (মেহমান) তো লেগেই আছে। ফুফু, আঙ্কেল, ভাইয়া (ফুফাতো), ভাইয়া (জেঠাতো), ভাবিরাও আসতেন। বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো কোলাহলে কাটানো দিনগুলো কস্মিনকালেও হৃদয় থেকে মুছে যাওয়ার নয়।
যা হোক, নিজ বাড়ীর ঈদ আনন্দ শেষে দুই দিন পর চলে যেতাম নানাবাড়ি, কোন এক কবি তো বলেছেন “নানাবাড়ি রসের হাড়ী”- ওখানে নানা, নানু, মামা আন্টিদের আদর কখনও ভুলার নয়। মামাত ভাই-বোন, খালাতো ভাই-বোন আর ভাগ্নে ভাগ্নিদের সাথে একটা অন্যরকম ঈদ কাটতো আমাদের। আমার নানাভাই ছিলেন মহান একজন ব্যক্তিত্ব। বীর মুক্তিযোদ্ধা, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, লেখক-কলামিষ্ট বহু গুণে গুণান্বিত নানা সবকিছু ছাপিয়ে ছিলেন অসাধারণ একজন মজার মানুষ। প্রতি ঈদে আমাদের কোলাহলের প্রধান আকর্ষন ছিলেন তিনি। সবাই একত্রিত  (আমি, রিফাত, শেফা, এশা, আদিবা,পলি আপু, শাকিল, সৌরভ, তপু, আনিকা, ঐশী,  আশফাক, নিসা, সাকিব ভাই সাথে ছোট্ট কয়েকজন ভাগ্নে-ভাগ্নি) হলেই আড্ডা জমাতাম ওনার রুমে। একের পর এক গল্প, কৌতুক, ধাধা সবকিছু যেন মুহূর্তের মধ্যে নিত্যনতুন বানাতে পারতেন তিনি। আমাদের সাথে যোগ আড্ডায় যোগ দিন নানু আন্টিরা। নানুর মত রত্নগর্ভা একজন মহীয়সী রমণীও আমাদের আদরে আগলে রাখতেন পরম মমতায়।
বিকেলে সবাই মিলে বেড়িয়ে পড়তাম ঘুরতে। সাথে তো প্রিয় বড়মামা বিশ্বখ্যাত একজন আলোকচিত্রী আছেন। ওনার ছবি তোলার মধ্যে এমন একটা গুণ আছে সেটা অন্য কোন আলোকচিত্র শিল্পীর মধ্যে নেই। আমরা সবাই ওনাকে “ফটো মামা” ডাকতাম। নানাবাড়ি গেলেই তিনি আমাদের নিয়ে বেড়িয়ে পরতেন ছবি তোলার অদম্য নেশায়। পটিয়া ফারুকী পাড়ার বিখ্যাত দিঘীর পাড় ছিল বেড়ানোর পছন্দের জায়গা। চারদিকের নজরকারা পরিবেশ আর গ্রামীণ পথে যেন চোখ জুড়ান নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন কাড়বেই।  ঘুরতে ঘুরতে সবাই চলে যেতাম এলাকার আরেক জনপ্রিয় দোকান গুয়াতলীর মিষ্টি খেতে। এই দোকানের ভিন্ন স্বাদের মিষ্টির খ্যাতি সারা পটিয়া জুড়ে লোকের মুখে মুখে ফেরে। সবাই দলবদ্ধভাবে মিষ্টি অনেক মজা করে খেতাম। এরপর সারাদিন নানান জায়গায় ঘুরেফিরে অবশেষে সন্ধায় ক্লান্ত শরীরে নিড়ে ফেরা সবই আজ স্মৃতি। ভাই-বোন, ভাগনে-ভাগনিরা অনেক বড় হয়েছে। একসাথে পাওয়া মানে দুস্প্রাপ্য কিছু। নিয়মতান্ত্রিক দুনিয়া সবাইকে এক এক করে আলাদা করে দেয়!
বিগত কয়েকবছর ধরে আমার ঈদ কেটেছে আরেকটু অন্যরকম। নতুন করে কাজিন (আদিবা)’র শাশুরবাড়ী হওয়াতে চলে যাই বিখ্যাত দোহাজারীর জামিজুরীর কাজীবাড়িতে। যদিও ওনারা আমাদের পুরোনো আত্মীয়। এই বাড়ির সবাই ভ্রমণপিয়াসী হিসেবে আলাদাভাবে পরিচিত। প্রতি বছর ঈদের কয়েকদিন পরেই ওনারা কোথাও না কোথাও বেড়াতে যান, সাথে আমিও যুক্ত হই। এই অন্যরকম উৎপাদনে পাহাড় ভ্রমণ সবকিছু ছাপিয়ে যায়। রূপ সৌন্দর্য্যের রাণীখ্যাত পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবনের নৈসর্গিক দৃশ্য অবলোকনে হারাই অন্য এক পৃথিবীতে।
ওভাবে ঈদকে উৎযাপন আর করা হয় না।সৃষ্টিকর্তার ডাকে না ফেরার দেশে চলে গেছেন প্রিয় মানুষগুলোও! তবুও তাদের সাথে কাটানো প্রিয় মুহূর্তগুলো কখনও হৃদয় থেকে মুছে যাওয়ার নয়। আজো ঈদ আসে। দু’চোখের কোণে অতীত স্মৃতি ভাসে। মহান আল্লাহ জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের জান্নাতবাসী করুন।
মতামত
লোডিং...