ঈদ-স্মৃতি || ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে || মুহাম্মদ আল জাবেদ হোসাইন তানভীর

“ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে, এলো খুশির ঈদ”
আমি আব্বুর বড় ছেলে। আব্বুর উপার্জনের সাথে আমাদের ঈদের আনন্দ মিলতো না। যাহোক, আজ ছোটবেলার ঈদের গল্প বলতে এসেছি।
ছোট বেলায় আব্বু শপিং করে আনতো। আমাকে একবার জুতা এনে দেয়নি। রাত্রে ঘুমাতে গেলাম মন খারাপ করে। বাবার সাথে অভিমান করে ঘুমানোর রাতটাতে বাবাই অভিমান ভাঙিয়ে দিলেন জুতা নিয়ে এসে। এক জোড়া জুতার জন্য আমি আব্বুর সাথে অভিমান করে ঘুমাতে গিয়েছিলাম। আর সেই জুতো জোড়া আমি ঠিকই পেলাম, তবে একটু দেরিতে। ভোরে উঠেই জুতা দেখে কত খুশি আমি!
চাঁদ দেখতে দৌঁড়াতে আমার ভাল লাগতো, আমি আর বন্ধুরা মিলে গোল্লাবাজি বানাতাম। এগুলো দিয়াশলাইকে রিকশার স্পোর্কের ছিদ্রে রেখে, পেরেক লাগিয়ে ইটের উপর মারলে তীব্র আওয়াজ তৈরি করতো। সেই আনন্দের সাথে আমাদের চাঁদ রাত কাটতো।
একবার ঈদ এলো, আমি খানিকটা বড় হয়েছি। চাঁদ দেখে মসজিদে গিয়ে শুরু করলাম, “ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে, এলো খুশির ঈদ”। আমার তখন বেশ ভাল লাগতো নজরুল সংগীত গাইতে। নজরুল প্রিয় এত দারুণ একটি সংগীত রেখে গিয়েছেন যা বারবার নতুনত্ব পায়। ঈদের দিন, তার পরের দিন সহ পুরো সপ্তাহ জুড়ে টিভিতে শুনতাম এই বিখ্যাত সংগীতটি। বারবার গাইতে মন চায়তো, বারবার গাইতাম আর টিভিতে দেখতাম। মন চাইতো, ঈদটা সারাজীবন থেকে গেলে হয় না!
ঈদের দিন রঙিন পোশাকে মসজিদে যাওয়া। নামাজ পড়া। কেমনে শেষ হবে নামাজ আর আমি বেড়াতে যাবো, সেই চিন্তায় বিভোর থাকতাম। নামাজ মসজিদের ভেতরেও পড়তাম না। বাইরে পড়তাম। উল্লেখ্য, আমাদের ঈদগাহ নেই। তাই ঈদের নামাজ মসজিদেই হয়। মুরব্বিরা দয়া করে আমাদেরকে বাহিরের রাস্তা দেখাতেন। কারণ, আমাদের মত দুষ্টুর শিরমনিদের দ্বারা মসজিদের পরিবেশ নষ্ট হতে পারে। তবে আমি অতটা দুষ্টু ছিলাম না!
নামাজ শেষে ঘরে এসে নতুন পোশাক পরে বেড়াতে যাবার জন্য আব্বুর সাথে বের হতাম। আমিও আর দশজনের মত আব্বুর সাথে ঈদের দিন বেড়াতে যেতাম। প্রথমে যেতাম বড় ফুফির বাড়ি, তারপর নানুর বাড়ি, সেখানে থেকে যেতে চাইতাম। ঈদে এক জনের বাড়িতে গেলে সেখানে থেকে যাওয়াটা যে বেখাপ্পা দেখায় সেই অনুভূতিটা আমার তখন হয়নি।
যাকগে, আব্বু ছিল আমার টাকার ম্যানেজার। আমি ঈদে যত সালামি পেতাম তার প্রায় সবগুলোই তার পকেটে ঢুকতো। প্রত্যক্ষ না হলেও, পরোক্ষভাবে তিনিই সে টাকাগুলো নিতেন। আমিও হিসেব নিকেশ জানতাম না বলে ঠকতাম! আব্বু আবার গাড়ি ভাড়া দেয়ার অজুহাতে নিতো। তখন কত টাকা গাড়ি ভাড়ার জন্য আমার থেকে কত টাকা তিনি নিচ্ছেন তাও হিসেব করতে জানতাম না! হায়রে, কত সহজ সরলভাবে আব্বু আমাকে ঠকাতো!
এই মধুর স্মৃতির কারণেই আজকে ঈদের আনন্দগুলোকে মিস করছি। তখন আব্বুর তর্জনী আঙ্গুল ধরে ধরে বেড়ানোর যে আনন্দটা ছিল সেই আনন্দটা যে আমি আর পাবো না – সেটা মনে উঠতেই কান্না আসে।
যাহোক, নজরুল প্রিয়’র সেই সুন্দর সংগীতটির দুয়েক বাক্য দিয়ে শেষ করি –
আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন, হাত মেলাও হাতে,
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ।
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।

 

মতামত
লোডিং...