ঈদ-স্মৃতি || সেদিনের ঈদ || তাসনিম রিমি

 

৬ষ্ঠ-১০ম শ্রেণির সময়টা আমার কাছে সবথেকে মধুর সময় ছিল। সদ্য শৈশব পেরোনো কৈশোরের উচ্ছলতায় জীবনটা আনন্দে পূর্ণ ছিল। অতীত স্মৃতি মনে করতে গেলে আমার কেবল বারেবারে এ সময়টাতেই ফিরে যেতে মন চায়। তাই ঈদ-স্মৃতি হিসেবেও এ সময়টাই একটু ফিরে দেখা হোক।

একসময় ঈদ কার্ড ছাড়া ঈদ হবে এটা ভাবতেই পারতাম না। রমজানের আগ থেকেই অল্প অল্প করে টাকা জমানো শুরু হতো স্কুল বন্ধ হয়ে যেত প্রথম রোজার দিকেই। কিন্তু প্রাইভেট/কোচিং খোলা থাকত, আর সে সুবাদেই টিফিনের টাকাটা বাঁচিয়ে যে যার পছন্দমত সল্পমূল্যে ঈদকার্ড কিনে নিতাম। যদিও দোকানগুলোতে গেলে একটু বেশি দামের কার্ডের দিকে বারেবারে চোখ আটকে যেত। হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে আবার রেখে দিতাম। একটু বড় হবার পরে অবশ্য কেউ কেউ তার পছন্দের (বর্তমানে যাকে ক্রাশ বলা হয়) মানুষকে হয়ত দামী সেই ঈদকার্ড দিত। কিন্তু সেটা সংখ্যায় একেবারেই নগন্য। দলবেঁধে সবাই ২/৫ টাকার কার্ডই কিনতাম। তারপর সেই কার্ডের মধ্যে লেখা চলত নানান রকম ছন্দ আর ঈদের দাওয়াতের নানান বাহার…

 

স্বভাবে একটু দস্যি টাইপ থাকায় দেখা যেত নানান সময় বন্ধুদের সাথে কথা কাটাকাটি লেগেই থাকত কিন্তু ঈদ এলে তো কোনোরকম ঝগড়া রাখা চলবে না তাই ঈদ কার্ডের ছোট্ট চিরকুটেই একসাথে যেমন ক্ষমার বার্তা থাকত তেমনি থাকত ভালোবাসার বাণী। যতই ঝগড়াবিবাদ থাকুক না কেন! কেউ ঈদকার্ড নিলে তারপর সে অবশ্যই ঈদের দিনে বাসায় আসব বলে ধরে নেয়া হত।
৮ম /৯ম শ্রেণিতে ওঠার পর বাসার ফোনটা টুকটাক ব্যবহার করার সুযোগ হয়, তাই কার্ড বদলে যায় ফোন মেসেজে। ৫/৭ টাকায় ১০০ মেসেজ কিনে সবাইকে মেসেজ পাঠানোটাও যেন তখন ঈদের অংশ হয়ে গেছিল। নতুন নতুন কোটেশন, ইংরেজি বাক্যে কে কার থেকে আলাদা আর সুন্দর মেসেজে ইদ উইশ করবে তার জন্য আলাদা করে খাতা বানিয়ে লিখে রাখা হত মেসেজ গুলো। কখনো বা নানানরকম যতিচিহ্ন দিয়ে মসজিদ, ঈদ মুবারক এসব লিখেই চলত শুভেচ্ছা বার্তা। সেই একটা মেসেজে কত কত যে আবেগ ছিল…!

 

ঈদের আগে জামা জুতা দেখানো মানে পুরানো হয়ে যাওয়া তাই এ বিষয়ে চলত কঠোর সতর্কতা। শৈশব পেরোনোর সুবাদে হাতের মেহেদির ডিজাইনেও আসত বৈচিত্রতা। হাতের মাঝে বিশাল একবৃত্ত আর তার চারপাশে ফোঁটা দিয়ে এখন আর কাজ চলে না। কে কার থেকে সুন্দর ডিজাইন করতে পারে সে বিষয়েরও প্রতিযোগিতা চলত। চাঁদ দেখা নিয়েও এক দারুণ উৎসব মতো হয়ে যেত তখন। বিকেল থেকেই তারাবাতি, পটকা যে যার সাধ্য মত কিনে আতসবাজি ফুটানো চলত। আমরা অবশ্য দু’টাকা দামের লাদেন বোম নিয়েই বেশ আমেজে মেতে থাকতাম।

 

ঈদের সময়টাতে তখন হালকা শীতের আমেজ থাকত। সকালের কুয়াশা ভেঙে পুকুরে গিয়ে কিছুক্ষণ ডুব সাঁতারের খেলা চলত। অতঃপর পরিপাটি হয়ে ঈদের দিন সকালে নতুন জামা জুতার সাথে মেহেদির ডিজাইন আর রঙ নিয়ে গল্প করতে করতে একে অন্যের বাসায় গিয়ে চলত ফিরনি সেমাই খাবার পালা। কখনওবা সবাই দলবেধে নদীরপাড়ে ঘুরতে যাওয়া। ভাগ্য খারাপ হলে কড়া রোদের মধ্যেও একটু দূরে যাবার (তখন দূর বলতে ২/৩ কিলোমিটার ছিল সর্বোচ্চ দূরত্ব) প্লান করলেই, বৃষ্টি এসে হাজির হয়ে যেত। এ যেন এক অমোঘ নিয়ম ছিল। ঈদের দিনের কড়া রোদেও এক পসলা বৃষ্টি হয়ে কাঁচা রাস্তাটাকে পিচ্ছিল করে দিতে হবে! যেন দু’চারজন ধপাস করে পরে নতুন কাপড়ে হনুমান হতে পারে।
মতামত
লোডিং...