নজরুলের ‘বিদ্রোহী’র প্যারোডি || সজনীকান্ত দাসের ‘আমি ব্যাঙ্’ || সাহিত্য সওগাত

 

আমি ব্যাঙ্
লম্বা আমার ঠ্যাং,
ভৈরব রভসে বরষা আসিলে ডাকি যে গ্যাঙোর গ্যাং।
আমি ব্যাঙ,
আমি পথ হতে পথে দিয়ে চলি লাফ;
শ্রাবণ নিশায় পরশে আমার সাহসিকা
অভিসারিকা
ডেকে ওঠে ‘বাপ বাপ’।
আমি ভােবায় খানায় কাদায় ধূলায়
খাটিয়ার তলে—কিম্বা ব্যবহারহীন চুলায়,
কদলীবৃক্ষের খােলেও কখনও রহি;
ব্যাঙাচি রূপেতে বাঁদরের মত লেজুড়ও আমি সহি।
আমি প্রাতে ও দুপুরে বিকালে ও সাঁজে
যখন ঝিল্লী ঝাঝার কাননে কাননে বাজে
গেয়ে যাই গান
‘আসমান’
ফেডে ফেড়ে
মিছে বলে লােক গলাটা আমার হেঁড়ে।
আমি ‘শির’ তুলে হেরি ‘কেয়ার’ করিনে কারেও
মােরে আঁট্‌কাতে নারে কাঁটার বেড়ার তারেও
আমি কচুর বনের আড়ালেতে রহি মাঝে মাঝে দিই লাফ
গিন্নী মিছাই দেখায় যে ভয় ‘সাপ ওগাে ওই সাপ’
আমি সাপেরে করিনে ‘কেয়ার’
দাঁড়াওয়ালা যত ক্যাঁক্‌ড়ারা মাের ‘এয়ার’।

 

আমি ব্যাঙ আমি বিদ্রোহী ব্যাঙ
আমি উল্লাসে কভু নেচে উঠি ড্যাং ড্যাং
আমি বাঙ
দুইটা মাত্র ঠ্যাং।

 

আমি সাপ আমি ব্যাঙেরে গিলিয়া খাই
আমি বুক দিয়া হাঁটি ইঁদুর ছুঁচোর গর্তে ঢুকিয়া যাই।
আমি ভীম ভুজঙ্গ ফণিনী দলিত ফণা
আমি ছােবল মারিলে নরের আয়ুর ‘মিনিট’ যে যায় গােণা
আমি নাগশিশু আমি ফণী মনসার জঙ্গলে বাসা বাঁধি।
আমি ‘বেঅফ বিস্কে’ ‘সাইক্লোন’ আমি মরু সাহারার ‘আঁধি’।
আমি বেদুয়ীন, আমি মহম্মদ ঘােরী,
আমি কিশােরী মেয়ের নাকের নােলক
ঢাকীদের আমি সখের ঢােলক
সৌখীন যত মডার্ণ ছেলের West End হাত ঘড়ি।
আমি বেন্দা কলুর ঘানি
আমি খােদার ষণ্ড, ‘নিখিলের নীল খিলানে যে ক্ষুর হানি’
গলা ‘ধাক্কার ধমক’ আমি যে ‘ঝরণার কুলকুচি’
‘দাড়িম ফাটার’ অসহ্য ‘ক্ষুধা’ পুঁটি মােদকের লুচি
আমি ‘ঝড়’ আমি ‘কড় কড় কড়’ K. M. Das এর চটি
মেমসাহেবের cero pearls আমি মেছুনীর আঁশবটি
আমি যুবতী মেয়ের গলার পুষ্পহার
আমি বাসর ঘরের মশক আমি বাসক তােষকে ছার
আমি নবীন আমি যে কাঁচা,
আমি বাহির হয়েছি ভাঙিয়া ফেলিয়া খাঁচা।
আমি ‘হে বিরাট নদী’ বৈশাখ আমি রুদ্র
তারকেশ্বরে সত্যাগ্রহী আমি ভাইকম শূদ্র।
আমি ‘এ্যারােপ্লেন’ আকাশের বুক চিরি
‘ওয়েস্ট পেপার বাস্‌কেট’ আমি গান্ধী মার্কা বিড়ি
আমি ‘কে সি এন’ কত প্রেমিকের মান রাখি
বাঙালী ছেলের ‘নােটবই’ আমি এক্‌জামিনের ফাঁকি।

 

আমি ভাদ্রের বান পৌষের শীত
‘ওরিয়েন্টাল আর্ট’ আমি ; আমি কালােয়াতি গীত
কচি শিশুদের কচি দাঁত আমি প্রৌঢ়া নারীর চুল
আমি নন্দী, গায়ত্রী আমি ঘরের কোণের ঝুল।
চতুরঙ্গের আমি জ্যাঠা মহাশয়
জগদীশ্বর মানিনেক আমি করিনে কাহারে ভয়,
মেসের পেটেন্ট ইলিসের ঝােল পুই চচ্চড়ি আমি
আমি বেহারী চাকর সাবিত্রী ঝি নই আমি রামী বামী
আমি প্রণয়ীর প্রণয়ের লিপি ‘shell’ আমি ‘ডিনামাইট’
ঘাের পুন্নাম নরক আমি যে আলােমাঝে ‘সার্চ লাইট্’
আমি ছুঁচ হয়ে হেথা সেথা ঢুকে ফাল হয়ে বাহিরাই
আমি হুঙ্কার করি প্রথমে কিন্তু শেষ কালে চুমু খাই
আমি গান গাই
গান গেয়ে গেয়ে ছুটিয়া ছুটিয়া চলি
আমি চলিতে চলিতে ঢলি
বিঘ্ন বিপদ শ্যাওলার মত পদতলে যাই দলি
মাঝে মাঝে কভু পিছ্‌লিয়া পড়ি আমি
প্রেমিকার প্রেম পাশে ধরা পড়ে চলিতে চলিতে থামি
আমি থামিতে থামিতে ঘামি
কবে ‘বেহেস্তে’ পহুছিব তাই ভাবি যে দিবস যামি
আমার কোমল নারীর প্রাণ
নিমিষে নিমিযে পথে ঘাটে মাঠে
অকাতরে করি দান।

 

ওগাে সুন্দরী
ওগাে কিশােরী
বেলা শেষে ওগো অবেলায়
কটাক্ষ তুমি হেনো মাের পানে
আমি মাতি রব ছায়ানট গানে
কেলে হাঁড়ি মাের টাঙ্গায়ে রাখিব শ্যাওড়া গাছের তলায়।
ওগাে প্রেয়সী করুণা কোরাে,
আমার জটা পড়া চুল ছেঁটে দেবো তাই ধােরাে,
তুমি থেকো গাে ‘আদুল’ গায়
আমি আপনারে টেনে টেনে
‘বহুত কোশিষ’ মেনে
তােমারে লক্ষ্য করিয়া ছুটেছি ঠাঁই দিও ফাটা পায়।
১ম বর্ষ / আশ্বিন ১৮ / ১৩৩১

 

শনিবারের চিঠি ব্যঙ্গ সংকলন : নাথ পাবলিশিং, তৃতীয় মুদ্রণ ১৯৯৯ [কামস্কাট্‌কীয় ছন্দ : ভাবকুমার প্রধান (সজনীকান্ত দাস)— লেখা থেকে নেওয়া।]
মতামত
লোডিং...