গোলাম মোস্তফার ‘নিয়ন্ত্রিত’ || নজরুলের ‘বিদ্রোহী’র প্যারোডি || সাহিত্য সওগাত

নিয়ন্ত্রিত
[ কাজী নজরুল ইসলাম সাহেবের বিদ্রোহী-কে লক্ষ্য করিয়া ]

 

ওগাে “বীর!”
সংযত করো সংহত করো “উন্নত” তব শির!
“বিদ্রোহী?”–শুনে হাসি পায়!
বাঁধন-কারার কাঁদন কাঁদিয়া বিদ্রোহী হতে সাধ যায়?
সেকি সাজেরে পাগল সাজে তাের?
আপনার পায়ে দাঁড়াবার মতাে কতােটুকু তাের কাছে জোর?
ছি ছি লজ্জা, ছি ছি লজ্জা!
তাের কোথা রণ-সাজ-সজ্জা?
তোর কোথা অনুচর অশ্ব পদাতি সৈন্য?
শুধু হাহাকার, শুধু আঁখি-ধার, শুধু দৈন্য!
তোর স্থান কোথা ওরে বিদ্রোহ-ধ্বজা উড়াবার–
নিজ অধিকারে দাঁড়াবার আর শত্রু-সেনারে তাড়াবার?
নাই নাই তাের কিছু নাই–
এই বাঁধন কাটিয়া বাহিরে কোথাও দাঁড়াবার তাের ঠাঁই নাই–
ওরে ঠাঁই নাই।
তবে কেমন করিয়া কোন্ পথ দিয়া বিদ্রোহী তুই হবি বল্?
ওরে “দুৰ্ম্মদ,” ওরে “চঞ্চল!”
তোর হৃদয়ে-বাহিরে আঁধারে-আলােকে, নিখিল ভুবন মাঝারে
মুক্ত বাঁধন পথ ঘিরে ঘিরে রাজিছে হাজারে হাজারে!
তুই যতােই প্ৰয়াস করিস্‌ আপন মনে ভাই,
সেই “খেয়ালী বিধির” বাঁধন এড়ায়ে পাবিনে মুক্তি কোনাে ঠাই;
সে যে অযাচিত দান করুণার,
সে যে স্নেহ-বিজড়িত চোখে চোখে রাখা
কল্যাণ-প্রীতি-ভালােবাসা-মাখা
স্নিগ্ধ-সরস পেলব পরশ
ঊষর জীবনে শতবার!
সে যে শুধু ক্ষমা আর ভুলে-যাওয়া,
সে যে মিলন-পিয়াসী মৌন নয়ন তুলে-চাওয়া!

 

 

সে যে পীযূষ-ফোয়ারা উচ্ছল-চল-কলকল,
চির নিরমল—চির ঢল-ঢল।
সে যে নলয়-অনিল রবির কিরণ স্নিগ্ধ-মধুর মনােরম,
সে যে শারদ-চাঁদিনী, কুসুম-কামিনী, আকাশ-নীলিমা অনুপম
সে যে নিত্য-হরষা ঊষা-বালিকার গীতি-মুখরিত জাগরণ,
সে যে সবুজ পাতার মাথার উপরে কম্পন-ঘন-শিহরণ,
সে যে স্নিগ্ধ সলিল-লাস্য,
সে যে মিটি মিটি মিটি চেয়ে-থাকা কোটি
তারকার চারু হাস্য।
সে যে সুপ্তি সে যে শান্তি!
সে যে নয়ন-ভুলানো বিশ্ব-রাণীর তনুর তনিমা-কান্তি,
সে যে আপনারি মাঝে আপন মনের অনুভূতি,
অতি দূর হতে যেন ভেসে-আসা কোন্
অজানা জনের তনু-দ্যুতি!
সে যে চাওয়ার বাসনা, পাওয়ার তৃপ্তি,
সকল আশার পুলক-দীপ্তি,
বিনিময়ে তার রিক্ত হিয়ার
দৈন্য-কাহিনী নিবেদন!––
মনে লুকানাে কি বেদন!
সেই বাঁধন-কারার মাঝারে দাঁড়ায়ে
খালি দুটি হাত ঊর্ধ্বে বাড়ায়ে
তুই যদি ভাই বলিস্ চেঁচিয়ে–“উন্নত মম শির–
আমি বিদ্রোহী বীর’’–
সে যে শুধুই প্রলাপ, শুধুই খেয়াল, নাই নাই তার কোনাে গুণ,
শুনি স্তম্ভিত হবে ‘নমরুদ’ আর ‘ফেরাউন’!
শুনি শিহরি উঠিবে ‘শয়তান’,–
হবে নাকো সে-ও সঙ্গের সাথী, গাবে নাকো তাের জয়গান!
তুই তার চেয়ে কিরে শক্ত,
তার চেয়ে কিরে ভক্ত?
ধ্বনি উঠে যে বণিয়া–না, না, ‘ওরে না, না,
তুই তা না!
তুই দুর্বল—চির দুর্বল,
তুই পথের ধূলায় পড়িয়া আছিস্ কোথায় সে কতাে দূর বল্।
তুই যার সাথে ভাই বিদ্রোহ-ধ্বজা উড়ালি,
তাহারই রসদে বাঁচিয়া আছিস্
তাহারি রাজ্যে দাঁড়ায়ে নাচিস্
তাহারি হুকুমে মরিস্ বাঁচিস্–
শুধু অভিশাপ কুড়ালি!
আপনার পায়ে আপনি হানিলি কুড়ালী!
ওগো বীর!
তবে সংযত করাে, সংহত করে উন্নত তব শির!
*

 

বিদ্রোহী ওগো বীর!
হৃদয় মেলিয়া চেয়ে দেখ্‌ ভাই মন করি সুস্থির–
সবারে-এড়ায়ে-দূরে-চলে-যাওয়া বিদ্রোহ—সে কি সত্য?
যাহা হয়ে গেলি, তাই যে রে খাঁটি–কোথা পেলি এই তথ্য?
মিখ্যা—সে কথা মিথ্যা
বিদ্রোহ—সে যে শুধু ঠুকাঠুকি–নিজেরেই শুধু হত্যা?
মিছে বিদ্রোহী কেন হবি ভাই?
তাতে সুখ নাই, তাতে সুখ নাই।
বিদ্রোহ মাঝে শুধু হাহাকার, শুধু মিলনের তৃষ্ণা,
আলােক সেখানে হাসে না কখনাে, শুধুই কালিমা-কৃষ্ণা!
যদি পেতে চাস্ কভু জীবনের সুধা উপভােগ,
তবে বিশ্বের সাথে আপনারে কর্ শুভযােগ,
তবে “বিদ্রোহী” হতে বিদ্রোহী হ’রে, হৃদয় দুয়ার খুলে দে,
সেথা মহা-মিলনের উৎসব বসা, বক্ষে সবারে তুলে নে!
সেথা আসুক বেদনা, আসুক অশ্রু,–আসুক তুচ্ছ-অতি দীন
তুই বিশ্বের সাথে যােগ দিয়ে চল্ গান গেয়ে গেয়ে প্রতিদিন,
এই নিখিল জগতে আকাশে, হৃদয়ে, বাহিরে!
বিরােধ-ঝঞ্ঝা–বিদ্রোহ কোথা নাহি রে!
শুধু আছে যােগ, শুধু আছে প্রেম আর ভালোবাসা,
আপনার পথে অবাধ গতিতে যাওয়া-আসা ;
চন্দ্র-সূর্যে তারায় তারায় আছে মিল,
সাগর-তটিনী, তরু-লতিকায় শুধু প্ৰেম চির অনাবিল,
গগনে গগনে জলদে চপলে গহনে,–
আকাশে পাতালে আনিলে অনলে দহনে,
আছে প্ৰেম, আছে মিলন-মাধুরী জড়ায়ে,–
মিলনের গান গিয়াছে বিশ্বে ছড়ায়ে!
নাহি বিদ্রোহ, নাহি অনিয়ম, নাহি কোনাে মানা,
জীবনের গতি, ভাগ্য-নিয়তি সকলের কাছে আছে জানা ;
তারা আপনার মনে অবাধ গতিতে যে যাহার পথে চলে যায়,
পথে চলিতে চলিতে কোলাকুলি করে, মুখপানে সদা হেসে চায়!
এই সুন্দর-চির-উজ্জ্বল-চারু-চিত্র-বহুল বিশ্ব,
এই শ্যাম শােভাময়ী নিতি নব নব দৃশ্য,
এ নহে শুধুই “শোক-তাপ-হানা খেয়ালী বিধির” দৃষ্টি
পিছনে ইহার জেগে আছে তাঁর দিব্য আঁখির দৃষ্টি ;
“শােক-তাপ?”
সে যে ভুল কথা ভাই, নাই নাই কিছু শােক-তাপ–
মানুষের শিরে নাহিকো খােদার অভিশাপ!
এই দৃষ্টির মূলে দুঃখেরও যে গাে আছে ঠাঁই,
অতি ঊর্ধ্ব হইতে দৃষ্টি হানিলে দেখিবারে পাই সদা তাই ;
তবে কেমন করিয়া বলিব–এ “শুধু নিঠুর বিধির খেয়াল”?
কেমন করিয়া সুখ-দুখ মাঝে টেনে দিব ভাই দেয়াল?
ভুল, ভুল, তোর, সবি ভুল,
তুই সুধা নাহি পিয়ে বিষ হতে চাস–
“উন্মাদ” তুই বিলকুল!

 

তুই হবি কেন ভাই “উন্মাদ মন উদাসীর?”
“বিধবার বুকে ক্রন্দন-রােল, হা-হুতাশরাশি হতাশীর”,
তুই হবি কেন ভাই গৈরিক-পরা পরম বিরাগী সৈনিক?–
ওরে নিত্য নূতন দৈনিক!
তুই অনুভূতি দিয়ে ব্যথিতের ব্যথা
আপনার বুকে এঁকে নে’
“গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি” আকুল নয়নে দেখে নে’।
নব বধুটির সরম-জড়িত অধরের কোণে চুমো খা,
তার কুসুম-কোমল বক্ষের পরে মূর্ছিত হয়ে ঘুমো যা!
তুই কিশােরীর সাথে কিশাের হইয়া প্রাণ খুলে দিয়ে খেলা কর্,
অভিমান-ভরে ঠোঁট ফুলাইলে সােহাগ ঢেলে দে শির ’পর!
তুই “যৌবন-ভীতু পল্লী-বালার” নয়নের পানে চেয়ে থাক্‌,
পালাইয়া যাক্ ত্রস্ত চরণে–মঞ্জরী-ধ্বনি বেজে যাক্!
তুই পথে যেতে যেতে ফাগুন-ঊষার রক্ত-আলােকে নদী-তীরে,
সদ্যস্নাতা সিক্ত-বসনা মুক্ত-চিকুর প্রেয়সীরে,
চলার গতিতে সহসা থমকি একবার দেখে চলে যা,
খাকে যদি কিছু বলিবার, তবে আঁখির ভাষায় বলে যা!
তুই ফুলবনে গিয়ে লুটে নে রে ফুল-সুরভি,
সাঁঝের বাতাসে তটিনীর কূলে গেয়ে যা উদাস পূরবী,
তুই বিশ্বের পানে অবাক হইয়া চেয়ে থাক্‌
তাের পরাণে কাহারো পুলক-পরশ লেগে যাক্,
তুই চারিদিক দিয়ে জীবনের কর্ সার্থক আর ধন্য,
এই নিখিল বিশ্ব সুষমায়-ভরা পাতা আছে তোর জন্য!

 

ওগাে বিদ্রোহী বীর-সৈন্য,
হবি কিসের জন্য বিদ্রোহী তবে, কিসের অভাব দৈন্য?
তুই ধন্য, ওরে ধন্য,
তুই সৃষ্টির সেরা মানুষের শিশু–নহিস তুচ্ছ অন্য—
তুই ধন্য—তুই ধন্য!
ওগো বিদ্রোহী মহাবীর
তবে সংযত করাে, সংহত করে।
উন্নত তব শির!
সওগাত
চৈত্র, ১৩২৮

 

[কবি গোলাম মোস্তফার রক্ত-রাগ কাব্যগ্রন্থ থেকে সংগৃহীত।]

মতামত
লোডিং...