কবিতা || কাজী নজরুল ইসলাম : আবদুল কাদির ||

 

তােমার আগ্নেয় মন্ত্র উচ্চকিয়া শনিন কৈশােরে :
নিমেষে টুটিয়া গেল আঁখি হ’তে ঘুমের জড়িমা।
দেখিলাম : বিপুলা পৃথিবী, নাই আকাশের সীমা,
আত্মার রক্তিম দ্যুতি ঠিকরিছে কুলিশে কঠোরে॥

 

বীণার ঝংকারে তব নির্জিতের চিত্ত স্পন্দমান-
বন্দীর অন্তরে জাগে অনির্বাণ মুক্তির পিপাসা ;
বিধির সকাশে করে আর্ত পিষ্ঠ অন্তিম জিজ্ঞাসা ;
দিকে দিকে দীন দুঃস্থ মানুষের দৃপ্ত অভিযান।

 

জ্যৈষ্ঠে ঝটিকার ঘটা, মেঘে জ্বলে বিদ্যুৎ-বল্লরী,
সেই লগ্নে এলে তুমি রদ্র কাপ্ত সম্পর ভীষণ ;
বিশের বাঁশরী হাতে, চিত্তে ঝুরে সুর-প্রস্রবণ।
কণ্ঠে শােভে রক্তজবা, মুঠিতলে নীবার-মঞ্জরী॥
সংগ্রামী অসিতে এ কি সৌন্দর্যের দেখেছ বিথার !
তােমার ভাঙার গানে উদ্বেলিছে প্রেমের পাথর॥

 

২.

 

এ বিশ্বে এসেছে বহু কবি ঋষি শিল্পী সুরকার,
আত্মার আনন্দ-বার্তা সর্বজনে শুনায়েছে তারা,
স্বপ্ন দিয়া সৃজিয়াছে সৌন্দর্যের শাশ্বত মিনার,
সত্য রসমূতি লভি, হইয়াছে ভাব সীমাহারা।

 

দেশরক্ষা ধর্মরক্ষা আত্মতৃপ্তি জাতিসেবা তরে
দেশে দেশে যুগে যুগে সর্ব গুণী গাহিয়াছে গান,
ধিক্কার হেনেছে নিত্য অন্যায়ের কুৎসিতের পরে ;
মানুষে চেয়েছে তারা করিবারে অমর-সমান॥

 

তুমিও সে-ধারা ধরি’ রচিয়াছ সুন্দরের গাথা,
তদ্ভিন্ন শোষক-শিরে ওঠায়েছ বিপ্লবের কশা।
চিত্ত-সুখ দুঃখ-দীর্ণ ; কোথা কাঁদে অনাথ অনাথা–
সে-কাঁদন নভোচারী পক্ষ তব করেছে বিবশা।
ধরার দুর্বল নিঃস্ব দৃপ্ত হোক মুক্তির সংগ্রামে–
তুমি কবি বাজাইলে বিষ-বাঁশী তাই বহু ঠামে॥

 

 

[নজরুলকে নিবেদিত কবিতাগুচ্ছ : বাংলা একাডেমি, ১৯৮৩- গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত।]

মতামত
লোডিং...