কবিতা || নজরুল : সিকান্দার আবু জাফর ||

 

সারাদেশে মৃত্যুঘুম, নিস্তব্ধ নিরব

জীবনের যত কলরব।

ঘরে ঘরে নিভে গেছে আয়ুম্লান দিবসের

ভীরু দীপশিখা,

দিগন্ত বিস্তৃত মাটি ঘিরে আছে অন্ধ মরীচিকা।

বিকলাঙ্গ রুদ্ধবাক শিশুটির মতাে

নিত্য অবিরত

সহস্র মানুষ শুধু অনিশ্চিত আশঙ্কায় কাঁপে

দ্বিধাহীন শাসনের নির্মম প্রতাপে।

তারি মাঝে মৌন দুরাশায়

কদাচিত মানুষের তিক্তপ্রাণ খুঁজে ফেরে-

জীবনের আনন্দ-প্রচ্ছায়।

 

এমনি কঠিন এক দুর্যোগের বিষন্ন প্রভাতে

বিদ্রোহের অগ্নিবীণা হাতে,

অজানা দিগন্ত হতে এসেছিল অকস্মাৎ

ঝড়ের মতন।

 

এনেছিলে জীবনের নূতন কম্পন

ব্যাধিজীর্ণ মানুষের প্রতি স্নায়ু ঘিরে ;

কারামুক্ত করেছিলে ভয়-ভীত মৃত্যুর বন্দীরে।

সমস্ত আকাশ ছাপি মেলেছিলে আশ্বাসের

প্রশস্ত উত্তরী

বলেছিলে “ভয় নাই—আজো বেঁচে আছে প্রাণ।

মানুষের জীর্ণ বক্ষ ভরি।”

 

সে আশ্বাসে উল্লসিত হয়ে

বহু ব্যর্থ বাসনার ক্ষুদ্র পুঁজি লয়ে,

আতঙ্কিত মানুষের দল,

সহসা উন্মাদ হয়ে হেলাভরে ছিঁড়েছিল

শতাব্দীর ভীতির শৃঙ্খল।

 

অগ্নিগর্ভ বাণীবাহী হে বীর বিপ্লবী

অসহায় নতমুখ দুর্বলের কবি,

সংগ্রামের পথে তব স্পর্ধিত নির্ভীক আমন্ত্রণে,

যত ভয়- ভয় পেয়ে কেঁপেছিল

প্রাণের নির্জনে।

 

অগ্নি শুধু নয়-

অগ্নিবাহী তব চোখে বহুবার দেখেছি যে

অশ্রুর বিস্ময়।

যে প্রাণ উঠেছে জেগে উদ্ধত বিদ্রোহ নিয়ে

অশনি ঝঙ্কারে,

সেই প্রাণ ভেসে গেছে ক্রন্দনের খরস্রোতে

বেদনার সামান্য প্রহারে।

 

বহুবার বহু কাছে এসে

বহু ভালোবেসে,

তোমার প্রাণের দুই দিক

দেখে গেছি স্তব্ধ নির্নিমিখ!

যতবার দেখেছি সম্মুখে

প্রলুব্ধ কৌতুকে,

চেয়েছি তােমার পানে ভীরু জিজ্ঞাসায়—

কত প্রেম, কত ঘৃণা পাশাপাশি রাখাে তুমি

হৃদয়ের গােপন প্রচ্ছায়।

বুঝিতে পারিনি তবু চোখে যার ক্লান্তিহীন

যুদ্ধের প্রস্তুতি,

বুকে তার কোথা হতে বাসা বাঁধে অগােচরে

এত প্রেম—এত অনভূতি।

চির যৌবনের কবি—মত্যুহীন প্রেমের কপােত

আজ থেমে গেছে তব অগ্নিবাহী

সঙ্গীতের স্রোত।

আজো তুমি ঘিরে আছো আমাদের

সমস্ত প্রভাত,

তবু কেন ছেয়ে আসে এমন নিস্তব্ধ পায়ে-

অন্ধকার রাত?

ওঠো কৰি- ওঠো কথা বলো,

সর্বাধিনায়ক হয়ে পুনর্বার আমাদের

পুরােভাগে চলো।

পুনর্বার আনাে নব জীবনের কুহু-কলস্বর

লভুক নূতন দীপ্তি আমাদের হৃদয়ের

তৃষিত অম্বর।

 

তবু কি দেবে না সাড়া?

উদ্দাম প্রাণের পাখী আর কভু

পাবে না কি ছাড়া?

তবে বুঝি ঝড় থেমে গেছে?

ঝড়ের পাখীর মত তােমার গানের পাখী

তবে বুঝি ফিরে চলে গেছে?

ঝড় ফিরে গেছে তবু ধরণীরে ভরে গেছে

সকৃপণ দানে,

মৃত্যুহীন স্মৃতির সম্মানে।

সেই দান ছেয়ে রবে প্ৰেমনত বিমুগ্ধ অন্তর,

হে কবি, গ্রহণ করো, শ্রদ্ধার অঞ্জনে আঁকা

আমার স্বাক্ষর

 

[নজরুলকে নিবেদিত কবিতাগুচ্ছ : বাংলা একাডেমি, ১৯৮৩- গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত।]

মতামত
লোডিং...